চৈতালী চক্রবর্তী
শিউলির গন্ধ, ভোরের শিশির ছাড়াই দেবীর আবাহন হবে। তাতেই মিলেমিশে যাবে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষ। গোটা তাইওয়ানে প্রথমবার ঘরের মেয়ে উমাকে আবাহন করবেন প্রবাসীরা। অগাধ আনন্দই হবে মায়ের বোধন মন্ত্র, দেশের স্মৃতিতেই তার পুষ্পাঞ্জলি।
দুর্গা পুজো ঘিরে তাইওয়ানের রাজধানী শহর তাইপেই-র বাঙালিদের উৎসাহে কোনও কমতি নেই। প্রতিমার সাজসজ্জা থেকে পুজোর উপচার জোগাড়— হই হই করে পুজোর আয়োজন শুরু করে দিয়েছে তাইপেই-র ‘ড্রিম কমিউনিটি’। শহরে বাঙালিদের একজোট করে রেখেছে এই কমিউনিটি। তবে শুধু বাঙালি নয়, অনেক অবাঙালিরাও রয়েছে পুজোর উদ্যোগ-আয়োজনে। চন্দনবাটা থেকে মালা গাঁথা, বহু মানুষের মিলিত প্রয়াসে পুজো হয়ে উঠেছে রঙিন।
‘পুজো’ শব্দটা বাঙালির মনে অন্য অভিঘাত তৈরি করে। কখনও সেটা নস্টালজিয়া, কখনও মন খারাপ করা, কখনও আবার কোনও মজার ঘটনার কথা ভেবে একা-মনে হেসে ওঠা। পুজো মানেই চারিদিকে নতুনের গন্ধ। জামাকাপড় থেকে শুরু করে, বিছানার চাদর, মায় দেওয়ালের রং পর্যন্ত। পুজো যে শুধুমাত্র প্যান্ডেল, প্রতিমা, আলো, নতুন জামা নয়, সেটা সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারেন যাঁরা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সংসার পেতেছেন। এমনটাই জানালেন কমিউনিটির এক সদস্য এবং পুজো উদ্যোক্তা কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। পুজো মানেই আবেগ, পুজো মানেই বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ, পুজো মানেই মায়ের আগমনীর সঙ্গে একঝাঁক নতুন স্বপ্ন, শরতের মেঘে অনেক না বলা কথার হাতছানি। পুজোকে ঘিরে কত সম্পর্কের ওঠাপড়া, স্কুল-কলেজের কত হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি। এই অনুভবের প্রতিটি বিন্দু শিরায় শিরায় অনুভব করেন প্রবাসীরা। সে বাঙালি হোক, বা অবাঙালি।
https://www.youtube.com/watch?v=-n35OllHR2I&feature=youtu.be
কৃষ্ণেন্দু বললেন, বিশুদ্ধ পঞ্জিকার নির্ঘন্ট মানা এখানে সম্ভব নয়। কারণ পুজোর জন্য তো আলাদা কোনও ছুটি থাকে না। অগত্যা বিদেশের আর পাঁচটা পুজোর মতোই সেই ধরা বাঁধা গতে সপ্তাহান্তেই যাবতীয় উদ্যোগ-আয়োজন। আগামিকাল পঞ্চমীর দিনই মায়ের বোধন। পুষ্পাঞ্জলির পর প্রসাদ বিতরণ। সন্ধেয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে নৈশভোজের এলাহি আয়োজন। পুজোর জন্য সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ড্রিম কমিউনিটি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। প্রতিমার জন্য বেদী তৈরি থেকে আলোকসজ্জা— সবেতেই কলকাতার বনেদিয়ানার ছাপ।
রবিবারের পর ফের পুজোর দিন আগামী সপ্তাহের রবিবার, অর্থাৎ ২০ অক্টোবর। সকালে মায়ের আরতি দিয়ে পুজো শুরু, শেষ সিঁদুর খেলায়। সময় সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা। তার মধ্যেই পালিত হবে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান। সময় সংক্ষিপ্ত। দিনও বাঁধা। কিন্তু নিষ্ঠা ষোলোআনা। কুমোরটুলি থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে ঠাকুর। পুরোহিতও এসেছেন দেশ থেকেই। কৌশিক ঘোষের হাতের জাদুতে প্রতিমার সাবেকি সাজও নিখুঁত ও মোহময়ী। ঢাকের বোলে আগমনীর সুর।
বিদেশের যে কোনও পুজোতেই ভোগের একটা বিশেষত্ব থাকে। কারণ বাঙালির রান্নার স্বাদ যাঁরা ভুলতে বসেছেন তাঁদের কথা ভেবেই মায়ের ভোগেও রাখা হয় রকমারি বাঙালি পদ। প্রসাদের থালায় যদিও শোভা পাবে ফল থেকে নারকেল নাড়ু, কিন্তু ভোগের থালা সাজিয়ে দেওয়া হবে খিচুড়ি, লাবড়া, আলু পোস্ত দিয়ে। ভোজের আয়োজনেও খাঁটি বাঙালিয়ানার স্বাদ। দুপুরে পাত আলো করবে খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজার সঙ্গে মিষ্টি চাটনী। রাতের খাবারে ভোজনরসিকদের চাহিদা মাফিক মুচমুচে লুচি, আলুর দম, ডাল ফ্রাইের সঙ্গে সঙ্গত করবে মিষ্টি পোলাও ও ফুলকপির কারি। তবে বিজয়ার দিনের মূল আকর্ষণ হল গরম ভাতে মুগ ডালের সঙ্গে আলু পোস্ত।
প্রবাসীদের পুজো, তাতে কী! হাত ঘুরিয়ে ঢাকের তালে তালে ধুনুচি নাচে মেতে উঠবে গোটা পুজো প্রাঙ্গন। পা মেলাবে আট থেকে আশি। মা’কে বরণ করে সিঁদুর খেলায় মাতবেন ভারতীয় মহিলারা। পুজোর সাজগোজের ক্ষেত্রেও তাইপেই-র ভারতীয়রা কলকাতার থেকে কোনও অংশেই কম যায় না। কলকাতার বাজারের হাল ফ্যাশনের শাড়িটিও যেন কী ভাবে তাদের হাতে চলে আসে। সঙ্গে মানানসই সাজগোজ। কৃষ্ণেন্দুর কথায়, দিন তো মাত্র দু’টো। তার মধ্যেই বোধন থেকে বিসর্জন। শেষে শূন্যতা। বিসর্জনের পরেও ঢাক বাজবে। তাতে বোল উঠবে, ‘আসছে বছর আবার হবে!’