হাইকোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে আদৌ কি রাজি নয় কেন্দ্র? রাজনৈতিক মহলের মতে, কেন্দ্রের এই অনীহা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক।

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 24 July 2025 08:54
কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) নির্দেশ দিয়েছিল — ১ অগস্ট থেকে শুরু করতে হবে ১০০ দিনের কাজ (100 Days Work)। কেন্দ্রকে সাফ জানানো হয়েছিল, দুর্নীতি রুখতে দিল্লি নজরদারি চালাতে পারে, শর্ত দিতে পারে, কিন্তু প্রকল্প অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে পারে না। সেই নির্দেশ দেওয়ার পর এক মাস হতে চলল। অথচ এখনও পর্যন্ত রাজ্যে টাকা পাঠানোর বিষয়ে কেন্দ্র কোনও সিদ্ধান্তই নেয়নি বলে খবর।
জানিয়ে রাখা ভাল, একশো দিনের কাজে বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে দেখা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বকেয়া টাকা ছাড়ার ব্যাপারে একটি মেকানিজম তৈরির কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার পরেও কেটে গেছে প্রায় ২ বছর।
রাজ্যের পঞ্চায়েত সচিব পি উল্গানাথন দিল্লিতে গিয়ে বৈঠক করে এসেছেন কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন দফতরের সচিব ও যুগ্ম সচিবের সঙ্গে। কিন্তু সেই বৈঠক থেকেও তিনি ফিরেছেন খালি হাতে। দফতর সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় কর্তারা উল্গানাথনকে সাফ জানিয়েছেন, “এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে।”
এই বিষয়ে রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার দ্য ওয়াল-কে বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র টাকা দিতে গড়িমসি করছে। প্রধানমন্ত্রীর হয়তো এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, তাই টাকা ছাড়ছে না। এটা বাংলার মানুষকে বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।” মঙ্গলবার সংসদে এই বিষয়টি ওঠে। সেখানেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী একই রকম উত্তর দেন — এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
তাহলে হাইকোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে আদৌ কি রাজি নয় কেন্দ্র? রাজনৈতিক মহলের মতে, কেন্দ্রের এই অনীহা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক। কারণ, ১০০ দিনের প্রকল্পে বাংলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ পান। কেন্দ্রের শাসক দল চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চায়, রাজ্যে প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণেই প্রকল্পের কাজ ও বরাদ্দ বন্ধ হয়েছে।
গত তিন বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গকে ১০০ দিনের কাজের জন্য এক টাকাও দেয়নি কেন্দ্র। অভিযোগ, ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে রাজ্যে। তবে একই প্রকল্পে গুজরাত সহ হিন্দি বলয়ের একাধিক রাজ্যে দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও সেখানে প্রকল্প বন্ধ হয়নি। শুধুমাত্র বাংলাতেই বরাদ্দ বন্ধ রাখা হয়, এবং পরপর দুটি বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য এক টাকাও রাখা হয়নি।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন — “১০টা আপেলের মধ্যে কয়েকটা পচা হলে বাকিগুলোকে তো ফেলে দেওয়া যায় না।” তিনি আরও বলেছিলেন, “এতদিন প্রকল্প বন্ধ ছিল, এখন নতুন করে চালু করতেই হবে।”
কিন্তু হাইকোর্টের সেই পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশকে কার্যত অগ্রাহ্য করেই চলছে কেন্দ্র। দিল্লি সফরের পরে রাজ্য প্রশাসনের এক কর্তার মন্তব্য, “সরাসরি না বলছে না ঠিকই, কিন্তু ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে — টাকা ছাড়ার ইচ্ছা আপাতত নেই।”
প্রশ্ন উঠছে — আদালতের নির্দেশ যখন স্পষ্ট, তখন কেন্দ্রের এই ‘সিদ্ধান্তহীনতা’ আদতে আদালতের নির্দেশ অমান্য করার সামিল নয় কি? এবং তার দায় কে নেবে? কেন্দ্র না রাজ্য? আপাতত উত্তর নেই। শুধু অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভই বাড়ছে গ্রাম বাংলায়।