দক্ষিণ ২৪ পরগনার ( South 24 Parganas ) বারুইপুর ( Baruipur )-এর পুরন্দরপুর মহাশ্মশানে ( Purandarpur Crematorium ) গত ১১ বছর ধরে ডোমের কাজ করছেন টুম্পা দাস। বাংলার অন্যতম মহিলা ডোম ( Female Dom)।

ছবিঃ দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 23 February 2026 19:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অন্ধকার নামলেই ছোট্ট টুম্পা ( Tumpa ) মায়ের আঁচল শক্ত করে ধরত। ভূতের ভয়ে একা ঘর থেকে বেরোতে পারত না। সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে হলে কাউকে না কাউকে সঙ্গে চাই-ই চাই। সেই ভীতু মেয়েটাই আজ আগুন, ধোঁয়া আর মৃত্যুর মাঝখানে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ( South 24 Parganas ) বারুইপুর ( Baruipur )-এর পুরন্দরপুর মহাশ্মশানে ( Purandarpur Crematorium ) গত ১১ বছর ধরে ডোমের কাজ করছেন টুম্পা দাস। বাংলার অন্যতম মহিলা ডোম ( Female Dom)।
প্রথম দিকে শ্মশানের পরিবেশ তাঁকে খুব ভয় পাইয়ে দিত। রাতের নিস্তব্ধতা, জ্বলন্ত চিতা, শোকাহত পরিবারের কান্না, সবই মনে গভীর ছাপ ফেলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শক্ত করেছেন। এখন পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সমান তালে দাহের কাজ সামলে নিচ্ছেন তিনি। তবে এই পথচলার আগে তাঁর জীবনে ছিল অন্য স্বপ্ন।
একসময় নার্সের কাজ করেছিলেন টুম্পা। সাদা পোশাকে মানুষের সেবা করার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার, অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সহায়-সম্বল না থাকায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। আর্থিক অনটন, পারিবারিক দায়িত্ব সব মিলিয়ে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। স্বপ্নটা থেকে গেছে অধরাই।
বাবার মৃত্যুর পর আচমকাই বদলে যায় সবকিছু। সংসারে রোজগারের আর কেউ ছিল না। বাড়িতে মা, এক বোন ও এক ভাই। তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়েই বাবার পেশা নিজের কাঁধে তুলে নেন টুম্পা। যে মেয়ে একসময় অন্ধকারে ভয় পেত, সেই মেয়েই আজ মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে শেষ দায়িত্ব পালন করেন নির্ভয়ে।
ডোমের পেশায় থাকার কারণে ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে না-পাওয়ার দীর্ঘ ছায়া। এক সময় ভালবেসেছিলেন একজনকে। কিন্তু এই পেশার কারণেই সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিয়ে আর করেননি তিনি। আজও পুরনো স্মৃতি মাঝে মাঝে মনকে ভারী করে তোলে। তবু চোখের জল আড়াল করেই কাজে মন দেন টুম্পা।
দিনের শেষে বাড়ি ফিরলে দরজায় লেজ নেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর কুকুর চিকু। সেই সঙ্গ যেন সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা ভুলিয়ে দেয়। মাসের শেষে যা কিছু জমানো টাকা হয়, সবটাই মায়ের হাতে তুলে দেন। সংসারের খরচ, ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ সবকিছুর দায় তাঁর কাঁধে। নিজের একটি ছোট্ট বাড়ি করার স্বপ্নও আছে তাঁর।
মৃত্যুর পরিবেশে কাজ করেও টুম্পা দাস বেঁচে আছেন জীবনের জেদ নিয়ে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, মানুষের শেষযাত্রায় সম্মান রক্ষা করেই তিনি নিজের মতো করে মানবিকতার কাজ করে চলেছেন। তাঁর লড়াই একটাই, পরিবারকে ভাল রাখা।