বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্যের ফলে ‘ফল্ট টলারেন্ট’ কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ আরও সহজ হবে, যা নির্দিষ্ট কোনো ত্রুটি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারবে।

ছবি- দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 16 August 2025 12:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জগতে এক যুগান্তকারী সাফল্য। বিজ্ঞানীরা এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটারে প্রায় শূন্য শতাংশ ভুলের হার নিশ্চিত করছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাটিই ছিল কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ কোয়ান্টাম কণা বা কিউবিট অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য গোলযোগেই গণনায় ত্রুটি দেখা দিত। এই বিপ্লবী সাফল্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ নতুন পথে নিয়ে যাবে। দ্রুত জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে এবং প্রচলিত কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
যুগান্তকারী অগ্রগতি
সম্প্রতি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারের কার্যকারিতায় ত্রুটির হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনেছেন—যা একটি বিশ্ব রেকর্ড। এর ফলে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার হবে আরও ছোট, দ্রুত এবং শক্তিশালী।
যুক্তরাষ্ট্রের APS Physical Review Letters জার্নালে ১২ জুন প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ত্রুটির হার মাত্র ০.০০০১৫ শতাংশে নামানো গেছে। সহজ ভাষায়, ৬৭ লাখ কোয়ান্টাম অপারেশনে মাত্র একটি ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ২০১৪ সালে একই গবেষক দল প্রতি ১০ লাখ অপারেশনে একবার ত্রুটি নামিয়ে এনেছিলেন। প্রায় এক দশকে তারা নির্ভুলতার মান ১০ গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
ত্রুটির চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিউবিট (qubit) ব্যবহার করে, যেখানে প্রচলিত কম্পিউটার কাজ করে বিট দিয়ে। বিট কেবল ০ বা ১ দিয়ে তথ্য সংরক্ষণ করে, কিন্তু কিউবিট একইসঙ্গে ০ এবং ১ অবস্থায় থাকতে পারে—যাকে বলে সুপারপজিশন। এর ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অবিশ্বাস্য গতিতে জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে।
কিন্তু কিউবিট অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য পরিবেশগত গোলযোগ বা noise থাকলেই ত্রুটি ঘটে। এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রচুর বাড়তি কিউবিট ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হতো, যা কম্পিউটারকে বড় এবং ব্যয়বহুল করত।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন Quantum Error Correction (QEC) পদ্ধতির নতুন সংস্করণ। এতে কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও স্থাপত্য থেকে সৃষ্ট ত্রুটি প্রায় শূন্যে নামানো গেছে।
নতুন প্রযুক্তির কৌশল
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এবার প্রচলিত ফোটনের বদলে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘ট্র্যাপড আয়ন’, বিশেষত ক্যালসিয়াম-৪৩ আয়ন। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কক্ষতাপমাত্রায়—যেখানে বেশিরভাগ কোয়ান্টাম সিস্টেমকে রাখতে হয় অতিনিম্ন তাপমাত্রায়। এর ফলে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার স্থাপন ও পরিচালনা আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
গবেষণায় মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আয়নগুলোকে একটি অ্যাটমিক ক্লক স্টেট-এ রাখা হয়। এরপর স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মাইক্রোওয়েভের কারণে তৈরি ত্রুটি সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত ও সংশোধন করা হয়। এর ফলে অবকাঠামোগত ত্রুটি প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড লুকাস বলেন,
“আমাদের জানা মতে, এটি বিশ্বের যেকোনো স্থানে কিউবিট অপারেশনের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল ফলাফল।”
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই সাফল্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎকে আমূল বদলে দিতে পারে। পরীক্ষামূলক স্তর পেরিয়ে এর ব্যবহারিক প্রয়োগের পথে এগোনো এখন অনেকটাই সহজ।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ওষুধ আবিষ্কার, জিনবিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা, নতুন পদার্থের নকশা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মডেল তৈরিতে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্যের ফলে ‘ফল্ট টলারেন্ট’ কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ আরও সহজ হবে, যা নির্দিষ্ট কোনো ত্রুটি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারবে।
গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম, দক্ষিণ কোরিয়ার কিস্টের মতো প্রতিষ্ঠানও এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে। ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রমাণ করছে, আগামী ১০–২০ বছরের মধ্যে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।