হু (WHO)-র সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতি ছ’টির মধ্যে একটিতে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ দিচ্ছে না।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 January 2026 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্ব জুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বড় স্তম্ভ প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বে প্রচলিত সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের (bacterial infection) ক্ষেত্রে প্রতি ছ’টির মধ্যে একটিতে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ দিচ্ছে না (worldwide antibiotic resistance)।
এই একটিমাত্র পরিসংখ্যানই যথেষ্ট উদ্বেগজনক (global health crisis)। ১০০-রও বেশি দেশের পরীক্ষাগার থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে WHO জানাচ্ছে, যেসব সংক্রমণ এতদিন খুব সহজে চিকিৎসাযোগ্য ছিল, সেগুলিই এখন প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে (WHO warning)।
‘প্রতি ছ’টি সংক্রমণে একটি’ - এই তথ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হু (WHO) পরিচালিত গ্লোবাল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইউজ সার্ভিলিয়েন্স সিস্টেম (Global Antimicrobial Resistance and Use Surveillance System - GLASS) বিশ্ব জুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের উপর নজর রাখে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের পরীক্ষাগারের তথ্য সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা জাতীয় ও বৈশ্বিক স্তরে রেজিস্ট্যান্সের চিত্র তুলে ধরেন।
GLASS-এর সাম্প্রতিক গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি প্যাথোজেন-অ্যান্টিবায়োটিক জুটির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্স বেড়েছে (drug resistant infections)।
এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আর শুধু হাসপাতালের জটিল সংক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ্ব জুড়ে ক্লিনিক ও সাধারণ চিকিৎসায় নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোথায় সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে রেজিস্ট্যান্স?
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রতি তিনটি সংক্রমণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে প্রতি পাঁচটি সংক্রমণের মধ্যে একটি রেজিস্ট্যান্ট। এই অঞ্চলগুলিতে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ
যেসব দেশে পরীক্ষাগার দুর্বল, ক্লিনিকগুলো অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ এবং ওষুধের সরবরাহ সীমিত, সেখানে রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণ বেশি এবং চিকিৎসার বিকল্প কম।
এই পরিস্থিতিতে মানুষ দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন, পরীক্ষা ছাড়াই ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, আর সংক্রমণ হয়ে ওঠে আরও জটিল ও কঠিন।
সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়ার উত্থান
বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া। এদের শরীরে থাকা অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক স্তর বহু অ্যান্টিবায়োটিককে কার্যত অকার্যকর করে দেয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুটি - Escherichia coli (E. coli) এবং Klebsiella pneumoniae। এই দুই ব্যাকটেরিয়াই বর্তমানে রেজিস্ট্যান্ট ব্লাডস্ট্রিম ইনফেকশনের প্রধান কারণ, যা থেকে সেপসিস ও অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
WHO জানাচ্ছে, ৪০ শতাংশের বেশি E. coli সংক্রমণ এবং ৫০ শতাংশেরও বেশি Klebsiella সংক্রমণ। এখন আর থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ করছে না।
কিছু আফ্রিকান দেশে হাসপাতালের তথ্য বলছে, রক্তের সংক্রমণে রেজিস্ট্যান্সের হার ইতিমধ্যেই ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে চিকিৎসকদের হাতে কার্যত কোনও নির্ভরযোগ্য ওষুধ নেই।
শেষ ভরসার ওষুধও কাজ করা বন্ধ করছে
দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকরা কার্বাপেনেম নামের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিককে শেষ ভরসা হিসেবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন সেখানেও ভাঙন ধরেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে E. coli, Klebsiella, Acinetobacter, Salmonella - এই সব সংক্রমণে কার্বাপেনেম রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে। একই সঙ্গে ফ্লুরোকুইনোলোন গ্রুপের ওষুধ - যেগুলি মূত্রনালী, অন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে বহুল ব্যবহৃত, তাও বহু অঞ্চলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর ফলেই চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে পুরনো, বেশি বিষাক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে, যার জন্য দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ও কড়া নজরদারি প্রয়োজন হয়।
রেজিস্ট্যান্সের আসল চিত্র আরও ভয়াবহ
GLASS-এর এই বিশ্লেষণ তৈরি হয়েছে ১০৪টি দেশের ২ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষাগার-নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য থেকে।
কিন্তু সমস্যা হল, অনেক দেশেই পরীক্ষাগার ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক এলাকার সবচেয়ে গুরুতর রোগীরা পরীক্ষার বাইরেই থেকে যান, সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়েন না। এর অর্থ, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রকৃত বৈশ্বিক বোঝা বর্তমান হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি।
ইতিমধ্যেই কত প্রাণ যাচ্ছে?
২০১৯ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী - ১২.৭ লক্ষ মানুষ সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণে মারা গিয়েছেন। ৪৯.৫ লক্ষ মৃত্যুর সঙ্গে রেজিস্ট্যান্স যুক্ত ছিল।
এই সংখ্যাগুলি বলছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণ এখন এইচআইভি (HIV) বা ম্যালেরিয়ার থেকেও বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট শিশু ও বয়স্করা।
রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণে হাসপাতালে থাকার সময় বেড়ে যায়, বেশি পরীক্ষা ও চিকিৎসা লাগে, এবং আইসিইউ ও নার্সিং রিসোর্সের উপর চাপ তৈরি হয়।
ভবিষ্যৎ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে
একটি নতুন বৈশ্বিক মূল্যায়ন বলছে, যদি পরিস্থিতি না বদলায় -
- ২০২২ সালের তুলনায় এটি প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি।
এই বাড়তি মৃত্যুর বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়বে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়সিদের উপর, কারণ এই বয়সগোষ্ঠীতেই মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
তথ্যের ঘাটতি কেন বিপজ্জনক?
বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশেরই নির্ভরযোগ্য জাতীয় রেজিস্ট্যান্স নজরদারি ব্যবস্থা নেই। ফলে চিকিৎসকরা অনেক সময় নিশ্চিত তথ্য ছাড়াই ‘সেফটি নেট’ হিসেবে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক দেন, যা তাৎক্ষণিক জীবন বাঁচালেও দীর্ঘমেয়াদে রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়। এই অনিশ্চিত তথ্য সরকারের কাছেও সমস্যা তৈরি করে, চিকিৎসা নির্দেশিকা বদলানো বা প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় পরীক্ষাগার পরিষেবা না থাকায় মানুষ দু’দিক থেকেই বঞ্চিত, রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণ বেশি, অথচ চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপকরণ কম।
দেশগুলির প্রতিশ্রুতি
রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলি ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যু কমানো ও অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা বাড়াতে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা গ্রহণ করেছে।
এই ঘোষণায় বলা হয়েছে,
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সালের ভয়াবহ পূর্বাভাস কিছুটা হলেও বদলানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখনও সময় আছে, কিন্তু দ্রুত পদক্ষেপ দরকার
WHO প্রধান সতর্ক করে জানিয়েছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের থেকেও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে, যা সারা বিশ্বের পরিবারগুলিকে ক্রমশ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই গতি থামাতে দরকার -
একই সঙ্গে চিকিৎসকদের আরও সতর্ক হতে হবে - প্রয়োজন না হলে অ্যান্টিবায়োটিক নয়, সম্ভব হলে ন্যারো-স্পেকট্রাম ওষুধ, এবং পরীক্ষা কাজে না লাগলে দ্রুত চিকিৎসা বন্ধ করা।