টোকিওর মাঠে নজর থাকবে অবশ্যই রেকর্ড ও দূরত্বে। কিন্তু আড়ালে আরও একটা প্রশ্ন ঘুরবেই ঘুরবে—ম্যাচ শেষে নীরজ–আরশাদ একে অপরের দিকে এগিয়ে যাবেন? নাকি ক্রিকেটের মতোই সৌজন্যের ধারটুকুও ধারবেন না?

নীরজ ও আরশাদ
শেষ আপডেট: 16 September 2025 12:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্রিকেট মাঠ থেকে (Cricket) এবার অ্যাথলেটিক্সে (Athletics) সরে এল নজর। সদ্য দুবাইয়ে এশিয়া কাপে (Asia Cup 2025) ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার যাদবদের (Suryakumar Yadav) পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে ‘হাত না মেলানো’ কাণ্ডে হইচই পড়ে গিয়েছে। অভিযোগ, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক স্লোগান, এমনকি ম্যাচ রেফারিকে (Andy Pycroft) সরানোর দাবিও তুলেছে পাকিস্তান (Pakistan)।
এহেন উত্তাল আবহেই টোকিও বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে (Tokyo World Athletics Championships 2025) নামতে চলেছেন ভারতের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নীরজ চোপড়া (Neeraj Chopra) আর পাকিস্তানের অলিম্পিক সোনাজয়ী আরশাদ নাদিম (Arshad Nadeem)। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঘনিয়েছে প্রশ্ন: দুবাইয়ের অস্বস্তিকর মনান্তরের ঝড় কি টোকিওয়ও আছড়ে পড়বে?
ক্রিকেটে ভারত–পাক দ্বৈরথ ঐতিহাসিক। কিন্তু অ্যাথলেটিক্সের অঙ্গনে নীরজ–আরশাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারেই হাল আমলের। এখানে রেষারেষি কম, সম্মান বেশি। ২০১৮ এশিয়ান গেমসের (Asian Games 2018) পোডিয়ামে তাঁদের মাথা ঠেকানো হাত মেলানো ছবি কিংবা টোকিও অলিম্পিক্সে (Tokyo Olympics 2021) আরশাদের নীরজের বর্শা ধার নেওয়া—এসব দৃশ্য ক্রীড়াজগতের সৌজন্যের অনন্য উদাহরণ। বিরলও বটে! সীমান্ত-সংঘর্ষের পাল্টা প্রস্তাব পেশ করেন দুই ক্রীড়াবিদ। সেটাও খেলার ময়দানে। এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না।
তবে মৈত্রীর এই অনাবিল ছবিটা বদলে গিয়েছে প্যারিসে (Paris Olympics 2024)। সেখানে ৯২.৯৭ মিটার দূরত্বে জ্যাভলিন ছুড়ে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম অ্যাথলেটিক্স সোনা জেতেন আরশাদ। নীরজকে থামতে হয় ৮৯.৪৫ মিটারে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই তারকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হঠাৎ পেয়ে যায় নয়া মাত্রা। এতদিনের ‘চ্যালেঞ্জার’ রাতারাতি বনে যান পোস্টার বয়! ম্লান হয় নীরজের একচ্ছত্র মহিমা।
চলতি বছরের এপ্রিলে পহেলগাম জঙ্গিহানা (Pahalgam Terror Attack) আর ঠিক তার পরের মাসেই ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor) ভারত–পাক সম্পর্ককে তলানিতে ঠেলেছে। যার আঁচ খেলাধুলোকেও এড়ায়নি। এশিয়া কাপে সূর্যর ‘নো হ্যান্ডশেক’ কাণ্ডই জ্যান্ত প্রমাণ। ফলে সঙ্গত কারণেই দানা বেঁধেছে আশঙ্কা: দুবাইয়ের বাইশ গজের সম্পর্কের টেনশন কি ছড়িয়ে পড়বে নীরজ–আরশাদের জ্যাভলিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়?
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ভারতের তারকা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আরশাদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘বন্ধুত্ব নয়, সম্মান ছিল। তবে আগের মতো কিছু আর থাকবে না!’ অর্থাৎ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যক্তিগত সমীকরণেও টান ফেলেছে—এই নিয়ে সন্দেহ নেই। টোকিওতে তা আরও জটিল হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। যেখানে নীরজ নামছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। আরশাদ অলিম্পিক সোনাজয়ী।
লক্ষ্য আলাদা—একজন প্রমাণ করতে চান তাঁর শিরোপা নিছক কাকতালীয় নয়। অন্যজন প্যারিসে হারানো আধিপত্য ফেরত পেতে মরিয়া। লড়াইয়ে আরও মশলা জুগিয়েছেন জার্মান তারকা জুলিয়ান ভেবার (Julian Weber)। যিনি এই মরশুমে ধারাবাহিকভাবে ৯০ মিটারের বেশি দূরত্বে বর্শা ছুড়েছেন। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিছক ভারত–পাক সমীকরণে সীমিত নয়, বৈশ্বিক আসরেই নতুন লড়াইয়ের জমি তৈরি হচ্ছে।
টোকিওর মাঠে নজর থাকবে অবশ্যই রেকর্ড ও দূরত্বে। কিন্তু আড়ালে আরও একটা প্রশ্ন ঘুরবেই ঘুরবে—ম্যাচ শেষে নীরজ–আরশাদ একে অপরের দিকে এগিয়ে যাবেন? নাকি ক্রিকেটের মতোই সৌজন্যের ধারটুকুও ধারবেন না?
দুই মুলুকের দুটি পরিবারই কিন্তু বারবার তাঁদের পারস্পরিক সম্মানের কথা স্পষ্ট করেছেন। নীরজের মা সরোজ দেবী (Saroj Devi) একসময় জানান, আরশাদ তাঁরও ছেলে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে আরশাদের মার বক্তব্য ছিল, নীরজের সাফল্যে তিনি গর্বিত! এই আন্তরিকতা কি টোকিওয় বিলীন হয়ে যাবে? বর্শার ফালের মতো মাথা উঁচিয়ে জেগে উঠবে অসৌজন্য আর নির্মম পেশাদারিত্ব? প্রশ্নটা জটিল। উত্তর জটিলতর!