আজকের দিনে যখন দেশের খেলাধুলো ক্রমশ বিজ্ঞান ও পদ্ধতিগত প্রস্তুতির দিকে এগোচ্ছে, তখন মনে রাখা জরুরি, এই পথের সেতুবন্ধন করেছিলেন ভেস পেজ। মাঠে অভিজ্ঞতা আর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর দক্ষতার মেলবন্ধন নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য আদর্শ কাঠামো গড়ে তোলে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 August 2025 13:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লম্বা দেহ। দীর্ঘ কাঁধ। সুঠাম শরীরে গোয়ানিজ ছাঁদ স্পষ্ট। মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে। হাতে স্টিক। চাহনিতে ঝরে পড়ছে তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, অখণ্ড মনযোগ। যেন সবুজ ঘাসের প্রতিটি শিরা-উপশিরা চিনে ফেলেছেন।
আবার মনের অন্য একটা কোণে খোঁচা মারছে প্রশ্ন: জীবন কি কেবল সাদা কোট আর স্টেথোস্কোপে বাঁধা থাকবে? হাতে ডাক্তারি ডিগ্রি। কিন্তু দু’চোখে স্বপ্নের মাঠ সবুজে সবুজ।
চাইলেই পারতেন চিকিৎসক হিসেবে সুনাম কুড়োতে। নিশ্চিত জীবন, বিত্ত-বৈভবে রাঙানো জীবন—খানিক পরিশ্রমে হাসিল করাটা অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু তরুণ ভেস পেজ (Vece Paes) বেছে নেন ময়দানের অনিশ্চয়তা। জীবন এখানে সাফল্য-ব্যর্থতার তরঙ্গভঙ্গে উথালপাথাল। এই তুঙ্গে, এই অতলে। স্পটলাইট আর বিতর্ক, সাফল্যের আলো আর আঁধারি ব্যর্থতা হাতে হাত মিলিয়ে চলে। অথচ এহেন অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়ান পেজ।
গল্পের উপসংহার? অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ মেডেল, একাধিক ময়দানে একইভাবে সফল ক্রীড়াবিদদের শ্লাঘনীয় তালিকায় নাম লেখানো এবং দেশের ক্রীড়াসংস্কৃতির নকশা বদলের অন্যতম পুরোধা-র তকমা অর্জন! ভেস পেজের নামের আগে ‘ড.’ উপাধি জুড়েছে বটে। কিন্তু সেটা সংকীর্ণ চৌখুপিমাত্র। এর বাইরে রয়েছে বিস্তীর্ণ জীবন। যা তাঁর প্রয়াণের আবহে, এত দশক পেরিয়ে, আজ, একই রকম প্রাসঙ্গিক।
১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে গোয়ার এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে জন্ম ভেস পেজের। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদম্য টান। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি—সবেতেই স্বচ্ছন্দ। তবে কৈশোরে হকির স্টিক হাতে আক্রমণে হিলহিলে নক্রগতি, রক্ষণে চোরাগোপ্তা ট্যাকল তাঁর মন জয় করে নেয়।
পড়াশোনার সূত্রে চলে আসেন কলকাতায়। প্রথমে লা মার্টিনিয়ার, তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রি-মেডিক্যাল। একদিকে বই, অন্যদিকে মাঠ—দুটোই সামলাতে থাকেন সমানতালে। বাস্কেটবল, রাগবিতে স্বচ্ছন্দ হলেও বেছে নেন হকিকেই। পেশাদার জীবনে, টার্ফের যুদ্ধে হাতে তুলে নেন স্টিক। সুযোগ পান জাতীয় দলে।
তখন সাতের দশক। ভারতীয় হকির স্বর্ণযুগ। বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াইয়ে মাঠে নামত জাতীয় দল। ১৯৭১ সালের বার্সেলোনা বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ খেতাব। তীক্ষ্ণ গতি, চমকপ্রদ স্ট্যামিনা আর স্বাভাবিক নেতৃত্বগুণে দ্রুত জাতীয় স্তরে উঠে আসেন ভেস পেজ। ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিকে ভারতের ব্রোঞ্জজয়ী হকি টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। এর পরের বছর মিউনিখ অলিম্পিক। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় ভারত আবারও ব্রোঞ্জ দখল করে। মাঝমাঠে তাঁর নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার ক্ষমতা হয়ে ওঠে দলের মেরুদণ্ড।
খেলার মাঠ থেকে সরে গিয়ে ভেস পেজ বেছে নিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথ। তিনিই ফিজিওলজিস্ট হিসেবে ক্রীড়াবিজ্ঞানের আধুনিক ধারণা ভারতীয় ক্রীড়াঙ্গনে আনার অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৮০-র দশকে ভারতীয় হকি ও টেনিস দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তারপর ধাপে ধাপে খেলোয়াড়দের ফিটনেস, ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট ও পুষ্টি সংক্রান্ত পেশাদার সহায়তা দেওয়া শুরু করেন—যখন এসবের তেমন প্রচলন শুরুই হয়নি। লিয়েন্ডার পেজের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারেরও নেপথ্য কারিগরও ভেস—শুধু বাবা নন, ক্রীড়া চিকিৎসক ও ফিটনেস গাইড হিসেবেও ছেলেকে পথ দেখিয়েছেন।
প্রাসঙ্গিকতা এখানেই শেষ নয়। আজকের দিনে যখন দেশের খেলাধুলো ক্রমশ বিজ্ঞান ও পদ্ধতিগত প্রস্তুতির দিকে এগোচ্ছে, তখন মনে রাখা জরুরি, এই পথের সেতুবন্ধন করেছিলেন ভেস পেজ। মাঠে অভিজ্ঞতা আর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর দক্ষতার মেলবন্ধন নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য আদর্শ কাঠামো গড়ে তোলে। আজ ময়দানে ‘স্পোর্টস সায়েন্স’ কোনও বিলাসী ধারণা নয়। বরং, পেশাদারি প্রশিক্ষণের অপরিহার্য অংশ। প্রতিটি আন্তর্জাতিক মানের অ্যাকাডেমি, ফেডারেশন বা টিম ম্যানেজমেন্টে ইদানীং ফিজিও, স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ, নিউট্রিশনিস্ট আবশ্যক। এই সচেতনতার বীজ বপন করেছিলেন ভেস পেজ। শুধু হকি নয়—ক্রিকেট, টেনিস, রাগবি—সবক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের চিকিৎসা ও ফিটনেস পরামর্শ দিয়েছেন। ডেভিস কাপ দলের সঙ্গেও ছিলেন বহু বছর। ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অ্যান্টি-ডোপিং প্যানেলে।
পেশাদার জীবনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও অনুপ্রেরণার গল্প। স্ত্রী জেনিফার পেজ জাতীয় স্তরের অ্যাথলিট, বাস্কেটবল ও অ্যাথলেটিক্সে সফল। এই ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারেই বড় হয়েছেন লিয়েন্ডার পেজ। ভারতের অন্যতম সফল টেনিস তারকা। পরিবারে, প্রশাসনে ও ময়দানে দাঁড়িয়ে ভেস পেজ প্রমাণ করেছিলেন—খেলাধুলো শুধুমাত্র ব্যক্তিগত গৌরব অর্জন নয়, বরং একটা আস্ত প্রজন্মকে গড়ে তোলারও মাধ্যমও বটে!
এর পাশপাশি কলকাতার শতবর্ষপ্রাচীন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাবে’র (Calcutta Cricket and Football Club, CCFC) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক বছর। ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য সুযোগ তৈরি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্রীড়ার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোয় অগ্রণী ভূমিকা নেন।
খেলোয়াড়ি জীবন, চিকিৎসা, প্রশাসন—সবক্ষেত্রে অবদানের জন্য ভেস পেজ পেয়েছেন অজস্র সম্মান। ২০২৩ সালে ‘স্পোর্টস্টার ইস্ট স্পোর্টস কনক্লেভে’ (‘Sportstar East Sports Conclave’) তাঁকে দেওয়া হয় ‘আনসাং হিরো’র সম্মান। ময়দানে আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও খেলার ভিত গড়ে দেন যাঁরা, এটা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি। ভেস পেজের ক্ষেত্রে ‘আনসাং হিরো’… এক ‘নীরব নায়কে’র চাইতে অব্যর্থ তকমা আর কিছু হতে পারে কি?