দশমিক ‘দশ’ ছাপিয়ে যখন ঘড়ির কাঁটা ১০.১৮-এ গিয়ে থামে, তখন শুধু এক জন অনিমেষ কুজুর (Animesh Kujur) নন, বদলে যায় দেশের দৌড়ের মানচিত্র!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 July 2025 15:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দশমিক ‘দশ’ ছাপিয়ে যখন ঘড়ির কাঁটা ১০.১৮-এ গিয়ে থামে, তখন শুধু এক জন অনিমেষ কুজুর (Animesh Kujur) নন, বদলে যায় দেশের দৌড়ের মানচিত্র!
একই দিনে—পোল্যান্ডে ৮০০ মিটারের রেসে রেকর্ড গড়ে মহম্মদ আফসাল (Mohammed Afsal) ভেঙে দেন চার দশকের পুরনো দেয়াল। আর ক্যালিফোর্নিয়ায় ১০,০০০ মিটার ২৭ মিনিটে ক্ষিপ্র হরিণের মত ছুটে গুলবীর সিং (Gulveer Singh) অনন্ত সম্ভাবনার জন্ম দেন।
তিন অ্যাথলিট, তিন দূরত্ব, স্বপ্ন এক—ভারতীয় ট্র্যাকে ‘বিশ্বমান’ তকমাকে অবাস্তব না-মানার, না-ভাবার দুর্মর সাহস।
যদিও স্রেফ খোয়াব নয়। আরও একটি সূত্রে তিন দৌড়বিদের আঁকশি গাঁথা। সেটা হচ্ছে: তিনজনের গড়ে ওঠার ঠিকানা সেই সেনা ছাউনি! আর্মিজীবনের বাস্তবতা (Military Grit) তাঁদের শিখিয়েছে, শুধু বন্দুক চালাতে নয়, স্টার্টিং ব্লকে বুকের ধুকপুক সামলাতেও অতন্দ্র শৃঙ্খলা কতটা জরুরি।
অনিমেষের জার্নি শুরু মাও-পীড়িত বস্তারে (Bastar)। সেনাবাহিনীতে (Indian Army) যোগ দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর একঝাঁক তরুণদের সঙ্গে ভোরের ড্রিলে পায়ে পা মেলাতেন কুজুর। আফসাল বেছে নেন এয়ার ফোর্স (Indian Air Force)—যেখানে একই সঙ্গে উড়ান আর দৌড়ের কৃৎকৌশল কাজে লাগাতে হয়। গুলবীর দৌড়তেন আলিগড়ের মাটিতে, চাষের ফাঁকে। সেখান থেকে সৈনিক হলেন। আজ নায়েব সুবেদার। সেনা-শৃঙ্খলা তাঁদের শিখিয়েছে, দ্রুততম হতে চাইলে আগে রোজকার জীবনে অনুশাসন আনা প্রয়োজন। তারপর ধারাবাহিকতা। যা সাফল্যের দরজা হাট করে খুলে দেয়।
খেলার ময়দানে রত্নপ্রসবিনী ভারতে প্রতিভার অভাব কোনওদিনই ছিল না। প্রশ্ন ছিল: ‘ট্র্যাক কোথায়?’ এখন সে জবাবও মিলছে। ভুবনেশ্বরের রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন হাই পারফরম্যান্স সেন্টার (Reliance Foundation High Performance Center), ওডিশা সরকারের বিশ্বমানের স্টেডিয়াম, অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের পদ্ধতিগত স্কাউটিং উদ্যমী ও তরুণ দৌড়বিদদের স্বপ্নের গন্তব্য। কোচ মার্টিন ওয়েনস হোক বা স্কট সিমন্স—সাদা বাংলায় ‘বিদেশি ডাক্তার’! রোগ চিহ্নিত করে দৈনিক ডোজ ঠিক করে দিচ্ছেন। কেরল, হরিয়ানা বা উত্তরপ্রদেশের জেলাস্তরের মিটে যে প্রতিভা আগে থেকেই ছিল, আজ তাঁদেরই ঘষে-পিটে অলিম্পিক মানের প্রতিযোগী বানিয়ে তোলা হচ্ছে।
ছত্তীসগড়ের অম্বিকাপুরের ছেলে অনিমেষ কুজুর এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। জন্ম ২০০৩ সালের ২ জুন। থাকতেন বস্তারের পুলিশ কোয়ার্টারে। বাবা ডিএসপি, একদা ফুটবলার। মা হকি খেলোয়াড়। ছোটবেলা থেকেই সৈনিক স্কুলের কঠোর ট্রেনিংয়ে বেড়ে ওঠা।
কিন্তু প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় শারীরিক সীমাবদ্ধতা। এই রোগ ব্রিটিশ কোচ মার্টিন ওউয়েন্সের চোখে পড়ে। তাঁর কথায়, ‘ও বসতেই পারত না! শরীর কিছুতেই সাড়া দিচ্ছিল না। কিন্তু গতির সম্ভাবনা ছিল!’ বিদেশি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ট্রেনিং। সাহায্যের হাত বাড়ায় সুইস অলিম্পিক সেন্টার। শরীরী গঠন বদলে যায় ধাপে ধাপে।
অবশেষে ৫ জুলাই, গ্রিসে ১০.১৮ সেকেন্ডে দৌড়ে ভাঙলেন গুরিন্দরবীর সিংহের ১০.২০ রেকর্ড। স্টেডিয়ামে ঘোষণা হচ্ছিল গ্রিক ভাষায়। অনিমেষ কিছুই বুঝতে পারেননি। ওউয়েন্সের স্মৃতিচারণ, ‘ও হাঁটছিল চুপচাপ। আমি চিৎকার করে বললাম—‘তুই রেকর্ড ভেঙেছিস!’’
২০০ মিটারে জাতীয় রেকর্ডও অনিমেষের দখলে (২০.৩২ সেকেন্ড)। এবার ডায়মন্ড লিগে নাম লিখিয়ে প্রথম ভারতীয় স্প্রিন্টার হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। সেমিতে ২০.৫৫ সেকেন্ডে দৌড়েও মাত্র ০.১৩ সেকেন্ডে মিস করেছেন ফাইনাল। কিন্তু এতশত ভাবতে নারাজ ওউয়েন্স। দাবি খুব স্পষ্ট: ‘আমরা শুধু ওকে শানিত করেই চলেছি। রেকর্ড নয়, অনিমেষ নিজের সেরা ফর্ম দেখাতে চাইছে!’
প্রায় একই গল্প কেরালার কোঝিকোড়ের আফসালের। এখন পেশায় ভারতীয় বায়ুসেনায় জুনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। কোচ অজিত মার্কোজ জানাচ্ছেন, স্কুলজীবন থেকেই দৌড়ে বিশেষ আসক্তি। ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ায় এশিয়ান স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে দেশকে সোনা এনে দেন। ২০২১ সাল থেকে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের ‘প্রজেক্ট ১৪৪’-এর প্রশিক্ষণাধীন। লক্ষ্য ছিল একটাই। একজন ভারতীয় হিসেবে স্টপওয়াচের কাঁটা ১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের নীচে নামাতে হবে। পোল্যান্ডের ঠান্ডা আবহাওয়ায় সেটা সম্ভব হল (১:৪৪.৯৩)! ভাঙল জিনসন জনসনের ২০১৮ সালের ১:৪৫.৬৫-র রেকর্ড।
অথচ সেখানেই থেমে থাকছেন না আফসাল। মার্কোজ বলছেন, ‘এখন লক্ষ্য অলিম্পিক বা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। আফসাল খুব কাছাকাছি, কিন্তু পথ লম্বা!’
উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ের কৃষক পরিবারে জন্ম গুলবীর সিংয়ের। গ্রামের মাঠে দৌড়তেন। এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর নায়েব সুবেদার। আমেরিকার কোলোরাডো স্প্রিংসে ট্রেনিং, মার্কিন কোচ স্কট সিমন্সের অধীনে। তাঁর কথায়, ‘ভারতের লং ডিস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ে এত দিন চূড়ান্ত অব্যবস্থা ছিল। আমরা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড এনেছি। লম্বা রান, স্পেসিফিক ইন্টারভাল, রিদম। সঙ্গে অলিম্পিক পদকজয়ী পল চেলিমোদের সঙ্গে অনুশীলন!’
সুফল মিলেছে হাতেনাতে। বোস্টনে ইনডোরে ৫০০০ মিটারে ১২:৫৯.৭৭ সময় তুলে গুলবীর ভেঙেছেন এশিয়ান ইনডোর রেকর্ড। ৩০০০ মিটারেও ৭:৩৮.২৬ সময় তুলে রেকর্ড গড়েছেন। ১০,০০০ মিটারে ইতিমধ্যে দু’বার জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছেন—সাম্প্রতিকতম ২৭:০০.২২। এশিয়ান অ্যাথলেটিক্সে ৫০০০ ও ১০,০০০—দুটোতেই সোনা! দেশের ইতিহাসে হাতেগোনা কয়েকজনের দখলে এই বিরল সম্মান রয়েছে। সিমন্সের দাবি, ‘আমার বহু মার্কিন আর্মি অ্যাথলিট অলিম্পিকে গিয়েছে। গুলবীরের ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ওকে এই উচ্চতায় এনেছে!’
এই তিন ক্রীড়াবিদের লক্ষ্য শুধু রেকর্ড ভাঙা নয়। নজর বিশ্বমঞ্চে। অনিমেষের কোচ বলছেন, ‘আমাদের মূল টার্গেট বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ কোয়ালিফাই করা। ১০ সেকেন্ডের নিচে গেলে, ইতিহাস রচনা হবে!’ আফসালের কোচ চাইছেন, ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ুক তাঁর ছাত্র। গুলবীরের কোচ আরও এক কদম এগিয়ে। বলেন, ‘আমরা এখন বিশ্বমঞ্চে পদকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। ও এশিয়ার সেরা। এবার দুনিয়ার জন্য তৈরি হতে হবে।’
বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত যখন ‘গ্লোবাল সাউথে’র মুখ, ক্রীড়ানীতিতেও তেমনই মডেল তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে আসছে। ভাল উদাহরণ ওড়িশা। একদিকে রাজ্য সরকার বাজেটের ব্যাটন ধরেছে, অন্যদিকে রিলায়েন্স বাড়িয়েছে স্পনসরশিপের ঝুলি। দুইয়ের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ সেনাবাহিনী। এনেছে শৃঙ্খলার স্কিপিং রোপ। এই ত্রিমুখী সমীকরণ বলছে—সামাজিক জনকল্যাণের সুফল কেবল ভোটে নয়, মেডেল টেবিলেও বর্ষিত হতে পারে।