২০২৫ খেলাধুলার নিরিখে শুধু সাফল্যের বছর নয়—এক মানসিকতা বদলের মরশুম। এখন আর ‘চেষ্টা করলেই যথেষ্ট’ নয়… ভারত ‘লড়াই জিততেই হবে’ উদ্যম নিয়ে মাঠে নামছে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 December 2025 11:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জ্যোতিষ্কের বিদায়। তারকাদের উত্থান। দলগত খেতাব। ব্যক্তিগত পদক উদযাপন৷ আগল ভেঙে, স্টেরিওটাইপ খানখান করে নারীশক্তির জাগরণ হোক। কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দুনিয়াসেরা হওয়ার চোখের জল... ২০২৫-এ খেলাধুলোর আঙিনায় ভারত অজস্র স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী!
নীচে এমনই বেশ কিছু সোনালি অর্জন থেকে বেছে নেওয়া হল বাছাই দশ সাফল্য-গাথা!
১) হরমন-বাহিনীর বিশ্বকাপ জয়:
দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। সামনে হট ফেভারিট অস্ট্রেলিয়া। চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী, প্রবল ধারাবাহিক। হোম অ্যাডভান্টেজ-কে ছাপিয়ে অজি আগ্রাসন তীব্রতর হয়ে উঠছে! তবু সমস্ত বাধাকে ফুৎকারে উড়িয়ে, সংশয়ীদের সওয়াল নস্যাৎ করে জেগে উঠলেন ভারতলক্ষ্মী! ট্রফি জিতে নিল, ইতিহাসে প্রথমবার! জেমাইমা রদ্রিগেজ, হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মান্ধানা, রিচা ঘোষেদের নাম শুধু এ বছরের খতিয়ান নয়… দেশের আবহমান খেলাধুলোর মহাফেজখানায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।
২) চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়:
দুবাইয়ের রাতে লেখা হল ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন মহাকাব্য। গোটা টুর্নামেন্টে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পারফর্ম করল টিম ইন্ডিয়া। নিউজিল্যান্ডকে (New Zealand) চার উইকেটে ফাইনালে হারিয়ে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন। কী ছিল সাফল্যের মন্ত্র? বিশেষজ্ঞদের মতে: টিম কম্বিনেশনে নিখুঁত সামঞ্জস্য, বোলারদের শৃঙ্খলা, ব্যাটিংয়ে নতুন নায়কদের উঠে আসা।
২০২৫-এ ভারতীয় ক্রিকেট বুঝিয়ে দিল—বিশ্বমঞ্চে তারা এখন শক্তি নয়, বরাবরের ঐতিহ্য। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মার টেস্টকে বিদায় জানানো ধাক্কা হতে পারে। কিন্তু চিরস্থায়ী অবনমন নয়!
৩) নীরজের লক্ষ্যভেদ
স্টেডিয়ামে বাতাস থমকে ছিল। নীরজ দৌড় শুরু করলেন। আর এক মুহূর্তে লাইন ছাড়াল সেই ঐতিহাসিক বর্শা—৯০.২৩ মিটার! ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সে যে ‘৯০ মিটার’ বহুদিন ধাঁধার মতো ছিল, নীরজের হাতে তার ‘মীমাংসা’ হল! দর্শক, কোচ, প্রতিপক্ষ—সবার চোখে বিস্ময়। স্রেফ রেকর্ড নয়… এই কীর্তি ভারতকে দুনিয়ার এলিট জ্যাভলিন পরিসরে টেনে তুলল।
৪) অপ্রতিরোধ্য গুকেশ
একটা দেশ যে কোনও মঞ্চেই যখন কোনও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পায়, তখন গল্পটা নিছক খেলার থাকে না—জাতীয় আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। গুকেশের সাফল্য এই অভিজ্ঞানকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। পেলেন ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন (Khel Ratna) সম্মান। বদলে এলিট টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক দাপট দেখালেন, নরওয়ে চেসে (Norway Chess) হারালেন দুনিয়ার এক নম্বর দাবাড়ু ম্যাগনাস কার্লসেনকে (Magnus Carlsen)—যা হয়ে উঠল সাম্প্রতিক সময়ে দাবা-বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি! ১৮ বছর বয়সে এমন ঠান্ডা মাথার খেলা… চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে ভারত এক উদীয়মান তারকার গড়ে ওঠার সাক্ষী রইল।
৫) প্যারা অ্যাথলেটিক্সে আবেগের স্রোত
একটা টুর্নামেন্ট কখন হয়ে ওঠে সম্মান আর অর্জনের বাইরে একাধারে অশ্রু ও অনুপ্রেরণার মঞ্চ? দিল্লির দর্শকাসন সেই প্রশ্নই ঘনিয়ে তুলেছিল! হাততালি থামছিল না… প্রতি পদকে শুধু ভারত নয়… জিতছিল মানুষের চিরন্তন ইচ্ছাশক্তি, হার-না-মানা জেদ! দেশের প্যারা অ্যাথলিটরা ছিনিয়ে নিলেন ২২টি পদক (৬ সোনা, ৯ রুপো, ৭ ব্রোঞ্জ)। প্রমাণ করলেন—প্যারা স্পোর্টস আর ‘হীন’ কোনও ‘ক্যাটাগরি’নয়… দেশের খেলাধুলার মানচিত্রের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। উপযুক্ত পরিকাঠামো পেলে, বিশেষভাবে সক্ষম অ্যাথলিটরা যে ভারতের নতুন পরিচয় লিখতে পারেন, তার প্রমাণ এবারের টুর্নামেন্ট।
৬) সম্রাট রানা: শুটিংয়ে নতুন সম্রাট
আইএসএসএফ বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের ১০ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে সম্রাট রানা তৈরি করলেন ইতিহাস—দেশের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন! নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, দ্বিধাহীন শুট! ছিনিয়ে নিলেন দলগত সোনা, মিক্সড-টিম রুপো—নিজের আঙুলের ডগায় দেশকে নতুন উচ্চতায় তুলেছেন সম্রাট!
৭) পিকলবলে বিশ্বজয়
‘পিকলবল’। খেলাটা আধেক-চেনা। নামটাও আনকোরা। কিন্তু ফ্লোরিডার কোর্টে এই নতুন খেলার মঞ্চে যে সাড়া উঠল, তার স্পটলাইটে এক ভারতীয়—নিতিন কিরটানে। ৫০+ সিঙ্গলস, ৫০+ ডাবলস—দুই ইভেন্টেই সোনা এনে তিনি পিকলবলকে ভারতের মূলধারার খেলাধুলোর চর্চায় এনে ফেললেন। দেশ যে এখন আর শুধু প্রচলিত নয়, একটু ভিন্নধর্মী খেলাতেও বিশ্বমঞ্চে দাবি জানাতে শুরু করেছে, নিতিনের সাফল্য এর জোরালো প্রমাণ।
৮) তাইকোন্ডোয় নবজাগরণ
নাইরোবিতে নীল জার্সির পাশে ভারতীয় পতাকা যখন উড়ছিল, তার আড়ালে ছিল নীতেশ সিংয়ের অবিশ্বাস্য লড়াই। কোরিয়া, ইরান, তুরস্কের দাপুটে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কুপোকাত করে ব্রোঞ্জ জিতে তিনি বুঝিয়ে দিলেন—মার্শাল আর্টে ভারতের খেলুড়েরা শুধু অংশ নিতে নয়, চোখে চোখ রেখে লড়তে এসেছে!
৯) তাইওয়ান অ্যাথলেটিক্স দুরন্ত ভারত
বছরের শেষদিকে তাইওয়ানে ভারত শেষ করল—১২ সোনা-সহ মোট ১৬টি পদকে। রিলে, স্প্রিন্ট—সব জায়গায় উন্নতির স্পষ্ট ছাপ। ২৫টি দেশকে পিছনে ফেলে ভারত টেবিল–টপার। বিশেষজ্ঞদের চোখে—দেশের হাই-পারফরম্যান্স প্রোগ্রাম এখন ঠিক পথ মেনেই এগচ্ছে।
১০) খো-খো-তে নতুন বিপ্লব
২০২৫ সালে খো-খো বিশ্বকাপ যেন ভারতের আভিজাত্যের মঞ্চ। পুরুষ–মহিলা—দু’দলই চ্যাম্পিয়ন। আধুনিক ট্যাকটিকস, ফিটনেস, দেশজ প্রতিভা—সব মিলিয়ে আস্ত একটা খেলাকেই যেন নতুন করে আন্তর্জাতিক স্পটলাইটে তুলল ভারত। বহুদিন বাদে কোনও স্বদেশি খেলাকে বিশ্বমঞ্চে এমন গর্বের সঙ্গে চর্চায় আসতে দেখা গেল।
শেষকথা
সব মিলিয়ে ২০২৫ খেলাধুলার নিরিখে শুধু সাফল্যের বছর নয়—এক মানসিকতা বদলের মরশুম। এখন আর ‘চেষ্টা করলেই যথেষ্ট’ নয়… ভারত ‘লড়াই জিততেই হবে’ উদ্যম নিয়ে মাঠে নামছে। গুকেশ, নীতেশ, সম্রাট, হরমনপ্রীতরা তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।