হাইকোর্টের নির্দেশে প্রকাশ্যে এসেছে রিপোর্টটি। যদিও রাজ্য সরকার চেয়েছিল তা যেন গোপন রাখা হয়, কিন্তু আদালত জানিয়ে দেয়, আইনত সেই চাহিদার কোনও ভিত্তি নেই।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 17 July 2025 11:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইপিএলে জয়ের উচ্ছ্বাস ছিল সীমাহীন, কিন্তু হুড়োহুড়িতে আর পছন্দের তারকাদের এক ঝলক দেখার তাগিদে সেই আনন্দ মুহূর্তেই মিলে যায় বিষাদে। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে আরসিবি-র বিজয় উৎসবে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ১১ জনের, আহত হন ৫০ জনেরও বেশি। সেই ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট পেশ করল কর্নাটক সরকার। রিপোর্টে উঠে এল একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ, রাজ্য পুলিশের অনুমতি না নিয়ে ‘একতরফা ভাবে’ বিজয় মিছিলের আয়োজন করেছিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB)!
হাইকোর্টের নির্দেশে প্রকাশ্যে এসেছে রিপোর্টটি। যদিও রাজ্য সরকার চেয়েছিল তা যেন গোপন রাখা হয়, কিন্তু আদালত জানিয়ে দেয়, আইনত সেই চাহিদার কোনও ভিত্তি নেই।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইপিএল ফাইনালে জয়ের দিন অর্থাৎ ৩ জুন, আরসিবি কর্তৃপক্ষ কেবল পুলিশকে 'জানিয়ে' দেয় একটি বিজয় মিছিল আয়োজন করা হতে পারে। কিন্তু সেটি অনুমতি বা আবেদন নেওয়ার মতো ছিল না, বরং ছিল ‘ইন্টিমেশন’। আইনগতভাবে অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হলে সাত দিন আগে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে প্রসেস করতে হয়, যা আরসিবি বা আয়োজক সংস্থা করেনি বলে অভিযোগ।
৩ জুন সন্ধে সাড়ে ৬টায় কেএসসিএ (KSCA)-র তরফে কাব্বন পার্ক থানায় আবেদন করা হলেও, তাতে উপস্থিত জনসংখ্যা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে কোনও বিশদ তথ্য ছিল না। ফলে পুলিশ কোনও অনুমতি দেয়নি। পরের দিন, ৪ জুন সকাল ৭টা ১ মিনিটে আরসিবি তাদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করে জানিয়ে দেয়, বিধান সৌধ থেকে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিজয় মিছিল হবে সেখানে সকলের ‘ফ্রি এন্ট্রি’।
৮টায় ফের পোস্ট করে তারা একই তথ্য জানায়। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে পোস্ট করা হয় বিরাট কোহলির একটি ভিডিও, যেখানে তিনি শহরের বাসিন্দা ও আরসিবি ভক্তদের সঙ্গে সাফল্য উদ্যাপন করার বার্তা দেন। বিকেল ৩টা ১৪ মিনিটে আসে আরেকটি পোস্ট, যেখানে প্রথমবার বলা হয় যে ‘লিমিটেড ফ্রি পাস’-এর মাধ্যমে ঢোকা যাবে, যেগুলি পাওয়া যাবে shop.royalchallengers.com ওয়েবসাইটে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানো হয়েছিল, তাতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সকলেই স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকতে পারবেন।
আরসিবি-র পোস্টগুলি মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় ৪৪ লক্ষ ভিউ হয়। যার জেরে শহরের রাস্তায় এবং স্টেডিয়ামে উপচে পড়ে ভিড়। সরকারি রিপোর্ট বলছে, স্টেডিয়ামের আশপাশে এবং শহরের বিভিন্ন রাস্তায় প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন ওই দিন। এর প্রমাণ হিসেবে বিএমআরসিএল-এর (মেট্রো) পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, মেট্রোতে দুর্ঘটনার দিন যাত্রী ছিল ৯.৬৬ লক্ষ, যেখানে সাধারণ দিনে তা থাকে ৬ লক্ষের কাছাকাছি।
শুধু স্টেডিয়াম নয়, হাল বিমানবন্দর থেকে তাজ ওয়েস্টএন্ড হোটেল পর্যন্ত ১৪ কিমি রাস্তায় আরসিবি টিমের ঝলক পাওয়ার আশায় জড়ো হন আরও হাজার হাজার মানুষ। যার ফলে বিশাল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করতে হয়।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৪ জুন দুপুর ৩টা নাগাদ স্টেডিয়ামের সামনে আচমকা প্রবল ভিড় তৈরি হয়। যেখানে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ উপস্থিত হন, অথচ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা মাত্র ৩৫ হাজার। আরসিবি কর্তৃপক্ষ ৩টে ১৪ মিনিটে প্রথমবার জানায়, পাস ছাড়া ঢোকা যাবে না। কিন্তু ততক্ষণে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমিয়ে ফেলেছেন, বহুজন ধারণা করেছিলেন যে সকলের জন্য প্রবেশ উন্মুক্ত। এই ‘দুর্বোধ্যতা ও বিভ্রান্তি’ থেকেই তৈরি হয় অশান্তি ও হুড়োহুড়ি।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, আয়োজকদের গেট খোলায় দেরি ও সমন্বয়হীনতার জেরে উত্তেজিত জনতা গেট নম্বর ১, ২, ও ২১ জোর করে ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করে। এর ফলে গেট নম্বর ২, ২এ, ৬, ৭, ১৫, ১৭, ১৮, ২০, ২১, সবকটিতেই ছোট-বড় পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, তাদের সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
এত কিছু দেখার পরও কেন বাতিল করা হল না অনুষ্ঠান? সরকারের ব্যাখ্যা, মিছিল বা উৎসব হঠাৎ বন্ধ করে দিলে তাতে শহরজুড়ে হিংসার আশঙ্কা ছিল। সে কারণে একটি ‘মেপে নেওয়া কৌশল’ নেওয়া হয়, উৎসব চালানো হয় স্বল্প সময়ে, অতিরিক্ত নজরদারি ও সতর্কতায়।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, 'এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যে বিষয়গুলি বিবেচনা করা, তা হল জমায়েতের মনোভাব, জনমনের চাপ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি এবং বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রেক্ষাপট। একসঙ্গে এত মানুষকে হতাশ করলে হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হত, তাই ধাপে ধাপে পরিস্থিতি সামলানো হয়।'
ক্রীড়া জগতের অনেকেই বলছেন, এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল, অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছ্বাস ও পরিকল্পনাহীনতা কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আইপিএল জয়ের আনন্দ যে ভাবে ১১টা প্রাণ নিঃশব্দে কেড়ে নিল, তা শুধু বেঙ্গালুরু নয়, গোটা দেশের কাছেই এক বড় শিক্ষা।