দিব্যা দেশমুখ আচমকা উড়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি আচমকাই মিলিয়ে যাবেন না। তাঁর উপস্থিতি আমাদের নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে? তাঁকে নিত্যনবায়মান দাবা-বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করা গেল না কেন? প্রশ্নের জবাব পেতে আয়নার সামনে দাঁড়ানো জরুরি। ১৪০ কোটির দেশের ‘খেলাপাগল’ জনতার একজনও কি তার সৎ সাহস দেখাবেন?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 1 August 2025 15:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৪০ কোটির দেশে দাবা-বিস্ফোরণ ঘটে গিয়েছে!
কথায় কথায় দুনিয়ার পয়লা নম্বর দাবাড়ুকে আজ মাত দিচ্ছেন ডি. গুকেশ, কাল আর. প্রজ্ঞানন্দ। র্যাপিড, ব্লিৎজ, ক্লাসিক্যাল—তিন ফর্ম্যাটেই মাত্র আঠারো-উনিশ বছর বয়সী তরুণ প্রতিভা বিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরে সাফল্য পাচ্ছেন। দিব্যা দেশমুখ, নাগপুরের অষ্টাদশী কি এই জোয়ারের ফসল?
প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দু’ভাবেই দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এসবের আড়ালে যে সওয়াল কুশের আগার মতো অস্বস্তির খোঁচা মেরেই চলেছে, সেটা হচ্ছে: কেন আজ পর্যন্ত ভারত থেকে মাত্র চারজন মহিলা দাবাড়ু গ্র্যান্ডমাস্টার শিরোপা অর্জন করেছেন? ছেলেদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা যেখানে ৮০, সেখানে মেয়ে-মহলে ৪—এই বৈপরীত্য আরও একটি সওয়াল তর্জনী উচিয়েছে: দাবার এত চাকচিক্য, রোশনাই… সবই কি পুরুষ-আধিপত্যের গ্ল্যামারে স্ফীত?
বিতর্ক, সওয়ালের চক্রে যদিও এই সত্যকে ঘোলাটে করার উপায় নেই যে, ভারতবর্ষ এই মুহূর্তে দাবা দুনিয়ায় সবচাইতে সম্ভাবনাময় বাস্তুতন্ত্র গড়ে ফেলেছে। যার অর্থ: একজন, দুজন প্রতিভার ক্বচিৎ-কদাচিত ঝলকেই সবকিছু ফুরিয়ে যাবে না। পরশু বিশ্বনাথন আনন্দ ছিলেন। কাল দিব্যেন্দু বড়ুয়া। আজ প্রজ্ঞানন্দ। আগামিতে আরও তরুণ দাবাড়ু উঠে আসবেন।
লক্ষ্যণীয়: উপরের সমস্ত নাম ছেলেদের। দিব্যাকে নিয়ে আজ যতই গুণকীর্তন হোক না কেন, গতকাল পর্যন্ত তাঁর নাম কেউ জানত পর্যন্ত না। অথচ ইতিমধ্যে ‘ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার’ শিরোপা হাসিল করে ফেলেছেন তিনি। বিভিন্ন বিভাগে একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর আগে কোনেরু হাম্পি এশিয়াডে সোনা জিতেছেন। তবু দাবার নবায়মান ইকোসিস্টেমে মেয়েদের জায়গা জোটেনি। এই তেতো সত্যিটা দানা বাঁধল কীভাবে এবং ঠিক কবে থেকে?
জবাবটা নিজের মতো দেওয়ার চেষ্টা করেছেন হরিকা দ্রোনাভল্লি। ভারতের চার মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টারের একজন। তাঁর হাত ধরেই স্বপ্ন দেখার শুরুয়াত। যা এখনও সেভাবে বিস্তার পায়নি, ছড়িয়ে যায়নি জনমানসে। চলতি বিতর্কে দ্রোনাভল্লির জবাব খুব তীক্ষ্ম এবং স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘আমার সময় দাবা সমাজে খুব একটা নজর কাড়ত না, স্পনসরশিপের আনুকুল্যও পেত না। ফলে মোটিভেশন বা উদ্যম বজায় রাখটা বেশ কষ্টকর ছিল। আজকাল তরুণ প্রতিভারা যেমন সমাদর পান, আমরা তার ছিটেফোঁটাও পাইনি!’
মেয়ে হওয়ার অপরাধেই কি এই অস্বীকৃতি? মানতে নারাজ দ্রোনাভল্লি। ধোঁয়াশা কাটিয়ে বলেছেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে আমায় লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। কিন্তু মেয়েদের ছেলেদের মতো একই পথে এগনোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয় না। এটা বাস্তব। প্রতিভা অগুনতি, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে। কিন্তু সামাজিক চাহিদা উড়ানের অনেক আগে মেয়েদের ডানা ছেঁটে ফেলে। যদি আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই, উপযুক্ত পরিকাঠামো, কোচিং ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে ব্যবধান অনেকটা কমবে, এটা নিশ্চিত!’
গ্র্যান্ডমাস্টার শ্রীনাথ নারায়ণন দীর্ঘদিন ধরে উঠতি প্রতিভাদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর যুক্তি কিছুটা আলাদা। শ্রীনাথের কথায়, ‘আমাদের দেশে মেয়েদের ঘরের কাজ এবং উচ্চশিক্ষা—এই দুটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা জোগানো হয়। খেলাটা সেই তুলনায় দুয়োরানি। দ্বিতীয়ত, দাবায় নাম করতে প্রয়োজন ভরপুর সময়, প্রচুর ঘুরে বেড়ানো, উপযুক্ত কোচিং। অধিকাংশ পরিবার মেয়েদের পেছনে এতকিছু ব্যয় করতে দ্বিধায় ভোগেন!’
চোখে দেখা অনেক স্বপ্নভঙ্গের সাক্ষী শ্রীনাথ। জানালেন, কীভাবে ১৩-১৪ বছর বয়সের পর অমিত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও স্রেফ পরিবারের সদিচ্ছার অভাব ও আর্থিক টানাটানির জেরে একাধিক মহিলা দাবাড়ু খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। দিব্যা সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে। বাবা-মা দুজনেই চিকিৎসক। ফলে এই ঝক্কি তাঁকে ভোগ করতে হয়নি।
শ্রীনাথ এই বিভেদের আড়ালে একটি ‘টেকনিক্যাল’ কারণও তুলে ধরেছেন। অল্প বয়সে ছেলেদের খেলতে হয় শক্তিশালী ওপেন পুলে। কিন্তু মেয়েদের সেই সুযোগ নেই। তাঁদের তুলনায় দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নামতে হয়। ফলে কেরিয়ার ও স্কিল—কোনও দিক দিয়েই সেভাবে উন্নতি হয় না। যাঁরা সাফল্য পেয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই হয় কৃপাদাক্ষিণ্যে, নয়তো ভাগ্যচক্রে ওপেন পুলে হাতেখড়ির সুযোগ জুটেছে।
ছেলেরা কি মেয়েদের চাইতে দাবার বোর্ডেব বেশি তীক্ষ্ম? ক্ষুরধার? এর সত্যতা যদিও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন শ্রীনাথ। তাঁর দাবি, এটা জল্পনা। ভ্রান্ত অনুমান। কোনও সত্যতা নেই। বারবার এই ধরনেও কথা আউড়ে আমাদের মগজে সেঁধিয়ে দেওয়াটা একটা সুচতুর রাজনীতি। পুরোপুরি অবাস্তব। যেহেতু দাবায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে চটজলদি সাফল্য মেলে না, অপেক্ষা প্রয়োজন, তাই টাকা ঢালা কিংবা পাশে থাকাটাকে অভিভাবকেরা মনে করেন পণ্ডশ্রম। বদলে পিঠ চাপড়ে অন্য ময়দানে, সেটা পড়াশোনা হতে পারে, চাকরি হতে পারে, সেদিকে ছুটে চলার আহ্বান জানান!
শ্রীনাথের সঙ্গে একমত বন্তিকা আগরওয়াল। বছর তেইশেই চেস অলিম্পিয়াডে সোনা জিতেছেন। পেয়েছেন অর্জুন পদকও। তাঁর কথায়, ‘বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়াটা অবশ্যই খরচাসাপেক্ষ। মেয়েদের সঙ্গে কাউকে না কাউকে অবশ্যই ভ্রমণ করতে হয়। অন্যদিকে ছেলেরা একটু বড় হতেই একা একা ট্রাভেল করে!’ এরপর জুড়ে দেন, ‘তা ছাড়া, আমরা সেভাবে সুযোগ পাই না। ওপেন পুলে না খেলে শুধু মেয়েদের বিভাগে খেলাটা আমাদের বিকাশ ও দক্ষতা ব্যহত করে। খেলার আধুনিক শৈলী আয়ত্ত হয় না। তা ছাড়া আমাদের সমাজও পুরুষ-প্রধান। ফলে সমান সুযোগ জোটে না!’
তাহলে সমাধান? খাতায়-কলমে একগুচ্ছ ফরমান লিখে ফেলা যেতে পারে। যেমন, লিঙ্গবৈষ্যম যতটুকু আছে, সেটুকু মুছে ফেলা কিংবা আর্থিক সমস্যা এড়াতে স্পনসরদের আরও উদার হস্তে এগিয়ে আসা, সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ইত্যাদি। দিব্যা দেশমুখ আচমকা উড়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি আচমকাই মিলিয়ে যাবেন না। তাঁর উপস্থিতি আমাদের নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে? তাঁকে নিত্যনবায়মান দাবা-বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করা গেল না কেন?
প্রশ্নের জবাব পেতে আয়নার সামনে দাঁড়ানো জরুরি।
১৪০ কোটির দেশের ‘খেলাপাগল’ জনতার একজনও কি তার সৎ সাহস দেখাবেন?