‘ইন্ডোর গেমে’র তকমা ভুলে দক্ষিণ ভারতে দাবা এখন আপাদমস্তক ‘সাংস্কৃতিক অনুশীলন’। এরই ফলশ্রুতি: তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দাবা শেখানোর প্রচলন।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 June 2025 17:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দাবার যা কিছু সমৃদ্ধি, বিকাশ—সব দক্ষিণে। উত্তর ভারত প্রচ্ছায়ায় ঢাকা।ভারতের দাবা সংস্কৃতি নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুলেছেন বন্তিকা আগরওয়াল। গত বছর চেজ অলিম্পিয়াডে জোড়া সোনার মেডেলজয়ী তরুণী দাবাড়ু। পেয়েছেন অর্জুন পদকের শিরোপাও। বছর তেইশের বন্তিকা সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে দাবা নিয়ে সাধারণ মানুষদের উন্মাদনা ও নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে বলতে গিয়ে দেশের দুই বৃত্তের আড়াআড়ি বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করেন।
সেখানে দাক্ষিণাত্য, বন্তিকার চোখে দাবার আঁতুড়ঘর, পৃষ্ঠভূমি। উত্তরভাগ অনেকটাই পিছিয়ে। তাঁর কথায়, ‘উত্তর ভারতে তো দাবার কোনও সংস্কৃতিই নেই! যখন আমায় কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী করো?’ জবাবে ‘আমি দাবা খেলি’ বলামাত্র তাঁরা পালটা সওয়াল ছুড়ে দেন, ‘সে বুঝলাম, কিন্তু আসলে কী করা হয়? কোথায় লেখাপড়া করছ?’
প্রভূত সাফল্য সত্ত্বেও কি ছবিটা বদলেছে? বন্তিকা মানতে নারাজ। বলেছেন, ‘এখনও গল্পটা একই। প্রচুর মেডেল জেতার পরেও প্রশ্নের ধরন পাল্টায়নি। লোকের সেই একই সওয়াল, ‘দাবা খেলছ ভাল, কিন্তু আসলে কী করো?’
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ বন্তিকার হতাশা মেনে নিয়েছেন। দাবার প্রেক্ষিতে দক্ষিণ ভারত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা উত্তর ভারতের চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে। কিন্তু কেন? এর উত্তরে তাঁদের অনেকেই বিশ্বনাথন আনন্দের প্রভাবকে তুলে ধরেছেন। চেন্নাইয়ের বাসিন্দা, ১৯৮৮ সালে ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টারের অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক সাফল্য দাবাকে দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয় করে তোলে। দাক্ষিণাত্যের ‘আইকন’ তিনি। যাঁকে ‘আইডল’ মেনে অনেকে পরিবার শুধু সন্তানদের শখপূরণে নয়, রীতিমতো কঠোর অনুশীলন ও একাগ্রতা নিয়ে দাবাশিক্ষায় উৎসাহ জোগায়।
‘ইন্ডোর গেমে’র তকমা ভুলে দক্ষিণ ভারতে দাবা এখন আপাদমস্তক ‘সাংস্কৃতিক অনুশীলন’। এরই ফলশ্রুতি: তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দাবা শেখানোর প্রচলন। একাধিক সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে দাবা এখন একটি আবশ্যিক বিষয়। দাক্ষিণাত্যের প্রতিটি জেলায় রয়েছে দাবা ক্লাব ও বিশেষ কোচিং সেন্টার।
যদিও বাকিদের পিছনে ঠেলে সামনে উঠে এসেছে চেন্নাই। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ গ্র্যান্ডমাস্টার এই একটি শহর ও তার আশপাশের অঞ্চলের। রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল, চেজ গুরুকুল, ব্লুম চেজ অ্যাকাডেমির মতো আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান শিশু-কিশোরদের হাতেকলমে দাবা শেখায়। এরই ফসল ডি গুকেশ, আর প্রজ্ঞানন্দ, বি. আদিবান, ভি হরিকৃষ্ণ।
এরই ঠিক উল্টো ছবি উত্তর ভারতে। যেখানে দাবা এখনও তেমন প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য পায়নি। অধিকাংশ রাজ্যে (উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা) ক্রিকেট, কুস্তি, কাবাডি ও হকি জনপ্রিয়। দাবার কোচিং সেন্টার ও ফেডারেশনের গা-ছাড়া ভাব প্রতিভাবান কিশোরদের সেভাবে চৌখশ করতে পারে না। দক্ষিণের একাধিক রাজ্য সরকার যেখানে দাবা প্রশিক্ষণ, স্কলারশিপ ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তা ও সম্মাননার ঝাঁপি নিয়ে হাজির হয়, সেখানে উত্তর ভারতে এহেন প্রশাসনিক উৎসাহ নেই বললেই চলে।
ইদানীং দিল্লি, হরিয়ানা ও রাজস্থানে যদিও উদীয়মান প্রতিভারা (অভিনন্দন ভাটনগর, স্বপ্নীল সিং) উঠে আসছেন, তবু সবটাই বিচ্ছিন্নভাবে, সাংগঠনিক স্তরে নয়। তাই গুকেশরা যে ‘মান’ ও ‘পরিমাণ’ ধরে রেখেছেন, উত্তরভারত সেখানে টক্কর দিতে ব্যর্থ। ডি গুকেশকেও কেউ আলটপকা ‘আর কী করছ?’ বলার সাহসই পান না!