দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাঁচ বছরের মেয়েটা যখন ভারী জলের ড্রাম মাথায় করে এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসত, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন মা-বাবা। হাত কাঁপত না, পা টলমল করত না। ছোট্ট শিশু ভারী ভারী জলের ড্রাম মাথায় তুলে নিত অবলীলায়। বয়স যখন ১২ বছর, বন থেকে ভারী কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে পাহাড়ি এবড়ো খেবড়ো রাস্তা বেয়ে বাড়ি নিয়ে আসত সেই কিশোরী। দাদারাও যে কাঠের ভার বইতে পারতেন না, ছোট বোন তা করে ফেলত খুব সহজেই। বাবা-মায়ের দূরদৃষ্টি বুঝেছিল বুঝেছিল এই মেয়ের মধ্যে এমন এক সহজাত ক্ষমতা আছে যা তাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে। আর হলও তাই। কাঠকুড়ানি সেই মেয়েই এখন ভারত্তোলক সাইখোম মীরাবাই চানু, টোকিও অলিম্পিকে রুপোর পদক এনে দিয়েছে ভারতকে।
জেদি মেয়ে। সাহসীও। জীবনের লক্ষ্য স্থির করে তা পূরণ করার উদ্দেশ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে চানুর সাহস ও জেদ নজর এড়ায়নি বাবা-মায়ের। ওইটুকু মেয়ের শারীরিক শক্তি অবাক করেছিল গ্রামবাসীদেরও। বাবা-মায়ের উৎসাহতেই ভারত্তোলনের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন চানু।

মণিপুরের ইম্ফল শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে মীরাবাই চানুর গ্রাম নংপক কাকচিং। পাহাড়ি গ্রাম। কোথাও যেতে হলে পায়ে হাঁটাই ভরসা। ছোট্ট চানুর জেদ ছিল জীবনে কিছু করে দেখানোর। তার ওপর বাবা-মায়ের উৎসাহে ভারত্তোলনে আগ্রহও তৈরি হয়। এই উৎসাহকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কুঞ্জরানি দেবী। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সাত বারের রুপো জয়ী কুঞ্জরানিই ভারত্তোলনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন চানুকে। তাঁকে দেখেই ১৪ বছরের মেয়েটার জীবনের লক্ষ্যও বদলে যায়।

চানুর সবচেয়ে কাছের প্রশিক্ষক ছিলেন অনিতা চানু। তাঁর কাছেই ভারত্তোলনে হাতেখড়ি। ৩০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে প্রতিদিন অনুশীলনে যেতেন। পরিশ্রমের বিন্দুমাত্র খামতি থাকত না। বাঁশের তৈরি ভারী ভারী ট্রাঙ্ক বারবেলের মতো তুলতেন চানু। তাঁর প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ ছিল সেটাই। ছ’মাস এইভাবেই চানুকে ট্রেনিং করান অনিতা। দু’বছর কঠোর পরিশ্রমের পরে ন্যাশনাল ক্যাম্পে যোগ দেন। সেটা ছিল ২০১১ সাল। জাতীয় স্তরে সাব-জুনিয়র লেভেলে সোনা জেতেন চানু। প্রথম পদক মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়।

এরপরে শুরু হয় আরও কঠিন থেকে কঠিনতম প্রশিক্ষণ। চানুকে ট্রেনিং দিতে এগিয়ে আসেন তাঁরই আদর্শ কুঞ্জরানি দেবী। এই কুঞ্জরানিকে দেখেই একদিন ভারত্তোলনের স্বপ্ন দেখেছিল পাহাড়ি মেয়েটা।
প্রথমে মণিপুরের স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (সাই)-তে ট্রেনিং শুরু হয়, পরে সেখান থেকে পাতিয়ালায়। সাইখম মীরাবাই চানুর জয়যাত্রার সূচনা হয়। ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথে জীবনের প্রথম বড় সাফল্য পান চানু। ৪৮ কেজি বিভাগে রুপো জিতে জেদি মেয়েটা প্রমাণ করে দেয়, আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থতাও এসেছিল বহুবার। ভেঙে পড়েননি চানু। জানতেন জীবনের সবচেয়ে বড় হারের মধ্যেই জেতার অনুপ্রেরণা লুকিয়ে থাকে। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়ান গেমসে খালি হাতেই ফিরতে হয় তাঁকে। পাখির চোখ করেন ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে। সেখানেও ব্যর্থতা। ক্লিন এবং জার্ক বিভাগে তিন বারই ওজন তুলতে ব্যর্থ হন চানু। স্ন্যাচে মাত্র এক বার ওজন তুলতে পেরেছিলেন। ফলে তাঁর নামের পাশে লেখা হয়ে যায় ‘ডিড নট ফিনিশ’, অর্থাৎ ইভেন্ট শেষই করতে পারেননি তিনি। চানু ভেঙে পড়েন, কিন্তু প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান সমান তালে।
সুযোগও আসে পরের বছরই। ২০১৭ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করা হয়েছিল আমেরিকায়। চানু ঠিক করেছিলেন সেখানেই বাজিমাত করবেন। ভারতীয়দের থেকে তেমন কোনও প্রত্যাশা রাখেননি কেউ। কিন্তু চানু নাড়িয়ে দিলেন দেশকে।
স্ন্যাচ (৮৫ কেজি) ও ক্লিন (১০৯ কেজি) এবং জার্ক মিলিয়ে মোট ১৯৪ কেজি তুলেছিলেন তিনি। মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে চানুই ছিলেন দ্বিতীয় ভারতীয় যাঁর স্কোর রেকর্ড করেছিল। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনাজয়ী কর্ণম মালেশ্বরীও মীরাবাই চানুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন। দেশে ফেরার পরে রাজীব গান্ধী খেলরত্ন সম্মানে তাঁকে সম্মানিত করে সরকার। ২০১৮ সালে পান পদ্মশ্রী সম্মান। পাতিয়ালার ক্যাম্পে কর্ণম মালেশ্বরীর থেকে এখনও নাকি পরামর্শ নেন চানু। মালেশ্বরীর রেকর্ড যে ছুঁতেই হবে তাঁকে।