বোর্ডে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পর মুখে কাউন্টার পাঞ্চ মারার এই মরিয়া চেষ্টা কি কার্লসেনের ভেঙে পড়া নার্ভাস সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া?

কার্লসেন ও গুকেশ
শেষ আপডেট: 21 July 2025 13:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে তিনি দুনিয়ার পয়লা নম্বর দাবাড়ু। এটা তর্কাতীত সত্য।
এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা দাবাড়ুও তিনি… ম্যাগনাস কার্লসেন (Magnus Carlsen)। এটা তর্কযোগ্য সত্য।
অথচ কিছুদিন আগেও এ নিয়ে প্রশ্ন বা জল্পনা কিছুই উঠত না। সবার চোখে নরওয়ের দাবাড়ুই ছিলেন চৌষট্টি খোপের সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু সেই ‘অবিসংবাদী’ তকমায় ফাটল ধরেছে। ধরিয়েছেন ভারতের দুই তরুণ দাবাড়ু। একদা যিনি রোলমডেল ছিলেন, তাঁকেই পালা করে হারিয়ে রীতিমতো চর্চায় ডি গুকেশ (D. Gukesh) এবং আর প্রজ্ঞানন্দ (R. Praggnanandhaa)। দুই দক্ষিণী তরুণের পাতা ফাঁদে বারবার বন্দি হচ্ছেন ম্যাগনাস। অহং ধাক্কা খাচ্ছে। কখনও বলছেন, ক্লাসিক্যাল চেসে (যেখানে এতদিন নিরবচ্ছিন্ন দাপট দেখিয়ে এসেছেন) তাঁর মতি নেই। কখনও জানাচ্ছেন, দাবা বস্তুটা থেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন!
কিন্তু এসমস্ত মুখরোচক জবানির আড়ালে ঢাকা থাকছে একগুচ্ছ প্রশ্ন: কেন বারবার বেছে বেছে ভারতীয় দাবাড়ুদের হাতেই কুপোকাত হতে হচ্ছে কার্লসেনকে? তবে কি তাঁর রাজপাট অস্ত যাওয়ার মুখে?
অতিসাম্প্রতিক উদাহরণ লাস ভেগাসের ‘ফ্রিস্টাইল চেস’ টুর্নামেন্ট। যেখানে প্রজ্ঞানন্দের কাছে হেরে প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে যান কার্লসেন। ওই হারের পর আর ভাল লাগা-না লাগা নয়… খুব সম্ভবত, প্রথমবারের জন্য মুখ ফুটে স্বীকার করেন, ‘পুরোপুরি ধস নেমেছিল। খেলার মতো অবস্থায় ছিলাম না!’
পরাজয়ের পর এভাবে নিপাট আত্মসমর্পণ ঠিক ম্যাগনাস-সুলভ নয়! তার কারণ, নরওয়ে চেসে গুকেশের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর রাগে, দুঃখে টেবিলে ঘুষি মারার দৃশ্য দাবা-অনুরাগীদের স্মৃতিতে এখনও টাটকা! সেই ভিডিও তুরন্ত ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ম্যাচে না হারলেও, মানসিকভাবে যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেদিনই।
এরপর জাগরেবের সুপারইউনাইটেড র্যাপিড অ্যান্ড ব্লিট্জ প্রতিযোগিতা। সেখানে আবারও মুখোমুখি গুকেশ আর কার্লসেন। প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে কার্লসেন সাংবাদিক সম্মেলনে বলে বসেন, ‘গুকেশ তুলনায় দুর্বল খেলোয়াড়!’
প্রত্যুত্তরে মুখে কিছুই বলেননি। কিন্তু দাবার বোর্ডে ঝাল ঝারতে সময় নেননি গুকেশ। র্যাপিড রাউন্ডে পরাস্ত হন কার্লসেন। তারপর লাস ভেগাসের ফ্রিস্টাইল প্রতিযোগিতায় নাকানিচোবানি খাওয়ান আরেক দাবাড়ু প্রজ্ঞানন্দ। তিন দিনে দু’বার হারিয়ে দেন ম্যাগনাসকে। যে ব্যর্থতার পর ফ্রিস্টাইল চেসের ইউটিউব চ্যানেলে মুখ খোলেন কার্লসেন। অকপটে বলে দেন, ‘চলতি বছর অনেক টুর্নামেন্টেই খারাপ দিন এসেছে। এবং সেটা ঠিক সেই সময়, যখন জেতা সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। আগেও এমন দুর্দিন দেখেছি, কিন্তু তখন টিকে যাওয়ার সুযোগ পেতাম। এবার সেই মার্জিনও নেই!’
অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ যে আগের চাইতে আলাদা, কেউ দুর্বল নয়, সবাই টেক্কা দিতেই ঘুঁটি সাজাচ্ছে, মেনে নেন কার্লসেন। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে তাঁকে ক্রমশ ব্যাকফুটে ঠেলছে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘খারাপ কিছু ঘটতে শুরু করলেই আমি নিজের মধ্যে ঢুকে যাই। তখন কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু চেনা কেউ পাশে থাকেন না। অনেক সময় এমন অবস্থা হয়, যখন স্নায়ুতন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দেয়!’
কার্লসেন স্বীকার করেছেন, চলতি মরশুমের অনেকগুলো টুর্নামেন্টেই তিনি নিজের সেরা ছায়াটুকুও দেখাতে পারেননি। শুধু প্রজ্ঞা কিংবা গুকেশ নন, জার্মানির ওয়েইসেনহাউস গ্র্যান্ড স্ল্যামে সেমিফাইনালে ভিনসেন্ট কেমারের কাছে হেরে যান। বিশ্বের অপ্রতিরোধ্য দাবাড়ুর এই ক্রমিক ব্যর্থতা দাবার ভুবনে একটা মস্ত বড় পালাবদলের ইঙ্গিত, মত বিশ্লেষকদের।
সেই সঙ্গে উঠেছে প্রশ্ন: ম্যাচ হেরে পরাজয় মেনে নিতে না পারার মানসিকতা কি কার্লসেনের হতাশা ও রাজস্ত হারানোর সংকেত? গুকেশ এ বছরই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বজয়ী দাবাড়ু। বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে চিনের ডিং লিরেনকে হারিয়ে খেতাব জেতেন গুকেশ। কিন্তু সেই জয়কে খুব একটা গুরুত্ব দেননি কার্লসেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ওটা ঠিক বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের মানের ছিল না।’
বোর্ডে ল্যাজেগোবরে হওয়ার পর মুখে কাউন্টার পাঞ্চ মারার এই মরিয়া চেষ্টা কি কার্লসেনের ভেঙে পড়া নার্ভাস সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া? জবাবটা স্পষ্ট হবে পরের মুখোমুখি দ্বৈরথে।