পরাজয়ের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, কাটাছেঁড়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সে কার্লসেন যতই প্রতিপক্ষের দাপট অস্বীকার করুন না কেন, সওয়াল কিন্তু উঠছে: তবে কি কার্লসেনের আধিপত্য অস্তাচলে?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 July 2025 18:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একবার হারলে বলা যেত ‘দুর্ঘটনা’।
দু’বারে ‘ছোট্ট ঘটনা’।
কিন্তু সংখ্যাটা তিন… তিন থেকে চার… চার থেকে ক্রমশ উপরে চড়তে থাকলে তাকে ‘বিপর্যয়’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না!
কথাটা ম্যাগনাস কার্লসেনের (Magnus Carlsen) সাম্প্রতিক স্খলন নিয়ে। আরও স্পষ্ট করে বললে, ভারতীয় প্রতিপক্ষের সামনে পড়লেই কুপোকাত হওয়া নিয়ে। আধুনিক দাবা-দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে যিনি একদা বন্দিত, তাঁকে কথায় কথায় হারিয়ে দিচ্ছেন ভারতের তরুণ দাবাড়ুরা। কখনও ডি গুকেশ (D Gukesh), কখনও আর প্রজ্ঞানন্দ (R Praggnanandhaa)--কেউ সতেরো পেরিয়ে আঠারোয় পা রেখেছেন, কেউ আঠারোর চৌকাঠ ডিঙিয়ে উনিশে। কিন্তু কার্লসেন, যাঁকে দেখে বেড়ে উঠেছেন গুকেশরা, চৌষট্টি খোপের যুদ্ধে বিন্দুমাত্র সমীহ না করে কড়া টক্করের সামনে ফেলছেন। ‘আইডল’ যখন ‘কম্পিটিটর’, তখন সম্ভ্রমের একচিলতে জায়গা নেই!
কিন্তু শুধু কি তাই? স্রেফ অটুট জেদ আর প্রবল মনঃসংযোগেই কেল্লাফতে? কার্লসেনই বা কোন রহস্যে বারবার ভারতীয় প্রতিপক্ষের সামনে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন?
পরাজয়ের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, কাটাছেঁড়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সে কার্লসেন যতই প্রতিপক্ষের দাপট অস্বীকার করুন না কেন, সওয়াল কিন্তু উঠছে: তবে কি কার্লসেনের আধিপত্য অস্তাচলে? নয়া যুগ, নয়া প্রজন্ম শাসন করতে চলেছে দাবার পরবর্তী দশক? ভারতের দাবা বিপ্লবও কি সত্যিই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মুখে?
একটা সময় ছিল, যখন ভারত মানেই বিশ্বদাবায় একমাত্র মুখ বিশ্বনাথন আনন্দ। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ ভারতের হাতে একঝাঁক তুরুপের তাস। প্রজ্ঞানন্দ থেকে গুকেশ, অর্জুন এরিগাইসি থেকে নীহাল সরিন, বিদিত গুজরাতি… তালিকা ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। বয়স কম। অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারও ভরপুর নয়। কিন্তু সাহসে, কৌশলে এবং মনঃসংযোগে তাঁরা শুধু কার্লসেন নন, বিশ্বের সেরাদের প্রাণে ভয় ধরিয়েছেন।
এই প্রতিভাবান দাবাড়ুদের বিরুদ্ধে কার্লসেনের পরিসংখ্যান ইঙ্গিতপূর্ণ। শুধু হারের সংখ্যা নয়, যেভাবে হারছেন, সেটাও বিপজ্জনক। অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে, মাঝের গেমে সুবিধাজনক অবস্থান থেকেও ম্যাচ ফসকে যাচ্ছে। ভুল সিদ্ধান্ত, সময় ম্যানেজ সংক্রান্ত অসাবধানতা কিংবা একেবারে অপ্রত্যাশিত ‘ব্লান্ডার’—যা কার্লসেনের মতো খেলোয়াড়ের কাছে অপ্রত্যাশিত, অভূতপূর্ব!
নেপথ্যে অনেকেই তুলে ধরছেন ভারতের নীরব দাবা বিপ্লব। ২০১০ সালের পর ভারতে দাবার পরিকাঠামোয় আমূল বদল এসেছে। সৌজন্যে বিশ্বনাথন আনন্দের জনপ্রিয়তা, মোবাইল-কম্পিউটার ইন্টারফেসের প্রসার এবং চেসডটকম, লিচেসের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। দেশের উঠতি দাবাড়ুরা বাচ্চা বয়স থেকেই স্টকফিশ বা লিলা জিরো-র সাহায্যে নিজেদের ম্যাচ বিশ্লেষণ করছে। অনেকে তো স্কুলে যেতে না যেতেই শুরু করেছে গ্র্যান্ডমাস্টারদের মতো ওপেনিং প্রস্তুতি! এদের কাছে কার্লসেন নামটা সম্ভ্রমসূচক। কিন্তু আর ততটা ভয়ঙ্কর নয়।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বেশ কিছু বছর ধরে একরকম একচেটিয়া আধিপত্য দেখানোর পর ২০২৩ সালে হঠাৎ বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ থেকে নাম তুলে নেন ম্যাগনাস। তাঁর যুক্তি ছিল একটাই: আর মোটিভেশন নেই। একটা মানসিক ক্লান্তি গ্রাস করেছে নরওয়ের দাবাড়ুকে। আজ নয়, অনেক দিন ধরে। অতিসম্প্রতি তাঁর সপাট স্বীকারোক্তি: ‘গুকেশের বিরুদ্ধে খেলতে বসে আমার স্নায়ুতন্ত্র ভেঙে পড়ে’—আসলে সেই ক্লেদেরই বহিঃপ্রকাশ! ক্লাসিক্যালে হেরেছেন। প্রজ্ঞানন্দের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছেন ফ্রিস্টাইলে। র্যাপিডেও টেক্কা দিয়েছেন গুকেশ।
কিন্তু কোন কৌশলে ভারতীয় তরুণরা কার্লসেনকে নাস্তানাবুদ করছেন? উঠে আসছে মূলত তিনটে কারণ।
প্রথমত, অ্যাগ্রেসিভ ওপেনিং। খেলায় আগাগোড়া আক্রমণাত্মক মনোভাব। ড্রয়ের চিন্তা ছেড়ে জয়ের জন্য এগিয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, নতুন নতুন থিওরি ও চমকপ্রদ প্রস্তুতি। অনেক ভারতীয় খেলোয়াড় এমন চাল দিচ্ছেন, যা কম্পিউটার সাহায্য ছাড়া বোঝা যায় না!
তৃতীয়ত, মানসিক চাপ তৈরির কৌশল। টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কার্লসেন অস্বস্তিতে পড়ছেন। প্রতি মুহূর্তে চমক। দুনিয়ার পয়লা নম্বর দাবাড়ু নিজের খেলা ভুলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন!
আওয়াজ উঠছে বয়স নিয়েও। কার্লসেন তেত্রিশ পেরিয়ে চৌত্রিশে দাঁড়িয়ে। সেরা সময় পেরোননি ঠিকই। তা ছাড়া দাবায় বয়স নয়, আগ্রহ আর মানসিক তীক্ষ্ণতাই আসল ফ্যাক্টর। তাই প্রশ্ন হচ্ছে: কার্লসেন কি নিজের সেরাটা দিয়ে খেলছেন? নাকি একঘেয়েমি, খ্যাতির চাপ বা ব্যক্তিগত ক্লান্তি তাঁকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তুলছে? ছন্দপতন, যতটুকু হোক না কেন, তা কি অস্থায়ী? নাকি এক নতুন যুগের সূচনা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা?
উত্তর যাই আসুক না কেন, প্রশ্নটা যে উঠেছে, গুকেশ-প্রজ্ঞানন্দদের কাছে এর চেয়ে বড় সাফল্য এই মুহূর্তে কিছু হতে পারে না।