চার হাজার, আট হাজার, কেউ বা দশ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিলেন। মাসের পর মাস ধরে একটাই স্বপ্ন—চোখের সামনে ফুটবল ‘বিশ্বের বিস্ময়’ লায়োনেল মেসিকে দেখা।

মদন-মেসি
শেষ আপডেট: 13 December 2025 17:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চার হাজার, আট হাজার, কেউ বা দশ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিলেন। মাসের পর মাস ধরে একটাই স্বপ্ন—চোখের সামনে ফুটবল ‘বিশ্বের বিস্ময়’ লিয়োনেল মেসিকে (Messi, lionel Messi, Messi in kolkata) দেখা। কিন্তু যুবভারতীর এই দিনে সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ল ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলার ধাক্কায়। গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার দর্শক মেসিকে এক ঝলকও দেখতে পেলেন না। হতাশা, ক্ষোভ আর আর্তনাদে মুহূর্তে উত্তাল হয়ে উঠল গোটা স্টেডিয়াম, আর সেই ছবি দেখে স্তম্ভিত হল বাংলা তথা দেশ, বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল বিশ্বও।
এই ব্যর্থতার দায় কার—তা নিয়ে শুরু হয় তীব্র চাপানউতোর। দর্শকদের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে উদ্যোক্তাদের দিকে। বিরোধীদের কটাক্ষে উঠে আসে একটাই কথা—এই ঘটনায় মাথা হেঁট হল বাংলার। পরিস্থিতি এতটাই বেনজির হয়ে ওঠে যে, যুবভারতী থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে বাধ্য হন রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় G.O.A.T ট্যুরের আয়োজক শতদ্রু দত্তকে।
তবে যাঁরা মেসিকে দেখতেই পেলেন না, তাঁদের অভিযোগ শুধু ‘না দেখা’ ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। গ্যালারির দর্শকদের প্রশ্ন—মাঠে মেসির চারপাশে যাঁরা ঘিরে ছিলেন, তাঁরা কি সবাই শুধুই তাঁর দেহরক্ষী বা আপ্তসহায়ক? অভিযোগ উঠেছে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী থেকে শুরু করে তাঁদের আত্মীয়স্বজন। এমনকি শোনা যাচ্ছে, টলিউডের এক অভিনেত্রীর মেক আপ আর্টিস্ট, হেয়ার স্টাইলিস্টও নাকি মাঠে ছিলেন। নাম না জানা বহু মানুষের ভিড়ে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় দু’শো থেকে আড়াইশো। স্বাভাবিকভাবেই সেই মানববলয় ভেদ করে সাধারণ দর্শকের পক্ষে মেসিকে এক ঝলক দেখা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই প্রসঙ্গেই বারবার অভিযোগের তির গিয়েছে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের দিকে। ছবিতেও দেখা গিয়েছে তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের উপস্থিতি। প্রশ্ন উঠছে—ক্রীড়ামন্ত্রীর মাঠে থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু পরিবারের এতজনের উপস্থিতির যৌক্তিকতা কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে— ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১১ সালে মেসির ম্যাচ আয়োজনের সময় তো এমন কোনও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। তাহলে এবছর কেন পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠল? এই প্রশ্নের মুখে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র সংক্ষিপ্ত জবাবেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “এই বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।” যুবভারতীতে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও উত্তর বদলায়নি। বারবার তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়— তিনি নিজে একসময় ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, আজকের এই ঘটনা কি তাঁকে আঘাত করেনি? সেই প্রশ্নেও একই অনড় অবস্থান। মদন মিত্রের সাফ কথা, “আমি আবারও বলছি, এই বিষয়ে আমি একটি কথাও বলব না।”
এর মধ্যেই কলকাতার ফুটবলপ্রেমী মহলের একাংশ মনে করছেন, এই সফর বিশ্বদরবারে শহরের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভাঙচুরের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সল্টলেক ও সংলগ্ন এলাকা। বিশৃঙ্খলার জেরে মাঝপথ থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মেসির সঙ্গে মাঠে নামার কথা থাকলেও শাহরুখ খানও শেষ পর্যন্ত হোটেল থেকেই ফিরে যান।
সব মিলিয়ে, ফুটবলের উৎসব হওয়ার কথা যে সন্ধ্যার, তা রূপ নেয় অব্যবস্থার এক দুঃস্বপ্নে। হাজার হাজার দর্শকের স্বপ্নভঙ্গ, আন্তর্জাতিক স্তরে শহরের বিব্রত ভাবমূর্তি আর অসংখ্য অনুত্তরিত প্রশ্ন—এই ঘটনাই কি ভবিষ্যতে বড় তারকাদের কলকাতায় আনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে?