২০১৬ সালের নভেম্বরে মোহালিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ২৪ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ঘটেছিল করুণের।

করুণ নায়ার
শেষ আপডেট: 24 May 2025 18:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পয়লা বৈশাখের ঠিক দুদিন আগের ঘটনা। সেদিন সন্ধেয় আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ানসের খেলা ছিল দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে। চলতি মরশুমে সে ছিল করুণ নায়ারের প্রথম ম্যাচ। প্রথমে ব্যাট করে বড় রানের টার্গেট বেঁধে দিয়েছিল মুম্বই ইন্ডিয়ানস। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম সেই ম্যাচেই দেখেছিল, কীভাবে জসপ্রীত বুমরা, হার্দিক পান্ডিয়ার বল ছাতু করে দিচ্ছেন করুণ। ২২ বলে ৫০, ৪০ বলে ৮৯। সেই ইনিংস চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
কাট টু ২৪ মে। শেষমেশ করুণের কপালে শিঁকে ছিড়ল। ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলে সুযোগ পেলেন বিদর্ভের তুখোর ব্যাটার করুণ নায়ার।
২০১৬ সালের নভেম্বরে মোহালিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ২৪ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ঘটেছিল করুণের। প্রথম বলেই চার মেরে তিনি নজর কাড়েন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অধিনায়ক বিরাট কোহলির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়ে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। তবে মাত্র তিন সপ্তাহ পর, সেই একই সিরিজের শেষ ম্যাচে চেন্নাইয়ে তিনি যেন ঝড় তুলেছিলেন—অপরাজিত ৩০৩ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে টেস্ট ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ানদের অভিজাত তালিকায় ঢুকে পড়েন নায়ার। এখনও পর্যন্ত টেস্টে ৩০০ করার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁর ও বীরেন্দ্র সেওয়াগের (দুইবার)।
ওই ইনিংসটিই তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের সোনালি সূচনা হতে পারত। কিন্তু বাস্তব ছিল ভিন্ন। এরপর আরও মাত্র তিনটি টেস্ট খেলার সুযোগ পান করুণ। যার মধ্যে ২৬, ০, ২৩ এবং ৫ রানের ইনিংস ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। যার পরিণতিতে অবশেষে বাদ পড়ে যান টেস্ট একাদশ থেকে।
২০১৮ সালে আবার ইংল্যান্ড সফরের জন্য দলে নেওয়া হলেও ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। দলে থাকলেও ফাইনাল টেস্টে করুণ নয়, অভিষেকের সুযোগ দেওয়া হয় হনুমা বিহারীকে। তাঁর ঝলমলে ৫৬ রানের ইনিংসই নিশ্চিত করে দেয় তাঁর স্থায়ী জায়গা। আর করুণ? স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর যেন তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। কর্ণাটক দলের অধিনায়ক থেকে ধীরে ধীরে বেঞ্চ গরম করার বাস্তবতায় যেন পৌঁছে যান। তবে ফের তাঁকে নতুন জীবন দেয় সেই ইংল্যান্ডই। ২০২৩ সালে কাউন্টি ক্লাব নর্থহ্যাম্পটনশায়ারে খেলার ডাক পান এবং সেখানে তিন ম্যাচে ৮৩ গড় নিয়ে ২৪৯ রান করেন। ২০২৪-তেও তিনি আবার সেই ক্লাবের হয়ে ১১ ম্যাচে করেন ৪৮৭ রান।
এই দুই কাউন্টি মৌসুমের মাঝে তিনি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে বিদর্ভের হয়ে খেলতে শুরু করেন, এবং সেখানেই ঘটে মোড় ঘোড়ানো পালা। ২০২৪ সালের রঞ্জি ট্রফিতে করুণ ৯ ম্যাচে ৮৬৩ রান করেন, যার মধ্যে ছিল ৪টি সেঞ্চুরি, গড় ছিল ৫৩.৯৩। ফাইনালে কেরালার বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ৮৬ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩৫ রান করে বিদর্ভকে জেতান।
এই দুরন্ত ফর্ম চলাকালীন ৫০ ওভারের বিজয় হাজারে ট্রফিতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। সেখানে ৮ ইনিংসে ৭৭৯ রান করেন, যদিও ফাইনালে তাঁর পুরনো দল কর্ণাটকের কাছে বিদর্ভ হেরে যায়।
সবশেষে নির্বাচকদের দরজায় শুধু কড়া করেননি করুণ, প্রায় সেই দরজা ভেঙেই ফেলেন, যেমনটা একসময় করেছিলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। ২০২২ সালে এক আবেগময় টুইটে লেখেন—“প্রিয় ক্রিকেট, একটা শেষ সুযোগ দাও।”
সেই সুযোগই এল করুণের সামনে। ৩৩ বছর বয়সে একজন ব্যাটারের পিক টাইমে দাঁড়িয়ে, ১১৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের অভিজ্ঞতা, ইংল্যান্ডের কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সময় এবং মানসিক ভারসাম্য অর্জন করে ফের জাতীয় টেস্ট দলে ফিরেছেন করুণ নাইয়ার।
চলতি সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে—রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির পরবর্তী যুগ। তরুণ অধিনায়ক শুভমান গিল এবং সহ-অধিনায়ক ঋষভ পন্তর নেতৃত্বে যেখানে অভিজ্ঞ ব্যাটারের প্রয়োজন, সেখানে করুণ ও কেএল রাহুল হয়ে উঠতে পারেন দলের দুই নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ।
স্বভাবগতভাবে লাজুক ও কিছুটা চুপচাপ স্বভাবের করুণ নায়ার এখন এক শক্তপোক্ত, পরিণত ক্রিকেটার। এবার তাঁর সামনে সুযোগ—নিজের “কার্মিক সংযোগ”-কে বাস্তব রূপ দেওয়ার। পিচ সেই ইংল্যান্ড।