কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে ১৫ গোল হোক আত্মবিশ্বাসের ইন্ধন। কিন্তু আত্মতুষ্টির ফাঁদে পা দিলে সে গোলবন্যার কোনও দাম থাকবে না।

ভারতীয় হকি দল
শেষ আপডেট: 2 September 2025 10:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজগীরে সোমবার ছিল উৎসব… গোলের উৎসব। এশিয়া কাপে (Asia Cup 2025) পুল পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতীয় হকি দল ঝড় তুলল। কাজাখস্তানকে উড়িয়ে দিল ১৫-০ গোলে (India vs Kazakhstan)। ঝলসে উঠলেন অভিষেক (৪ গোল), সুকজিৎ সিং (৩ গোল), যুগরাজ সিং (হ্যাটট্রিক)। পরিসংখ্যানের খাতায় নিখুঁত জয়, আত্মবিশ্বাসের তেজও ঠিকরে বেরল। তবু চোখা প্রশ্ন অস্বস্তি জাগাল—এই গোলবন্যা কি যথেষ্ট? আসল লড়াই এখনও বাকি? নাকি এখন থেকেই শুরু?
সুপার ফোরই অগ্নিপরীক্ষা
অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ, এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়, তারপর হকি ইন্ডিয়া লিগ—২০২৪ ছিল স্বপ্নময়। অথচ ২০২৫ শুরুতেই প্রো লিগে আট ম্যাচে সাত হারের ধাক্কা! চলতি বছর ভারতীয় টিমের কাছে মোটেও পয়মন্ত ছিল না। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে, বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের শেষ সুযোগ আপাতত এশিয়া কাপ!
তিনটে ‘ম্যচে মেন ইন ব্লু’ আপাতত নিখুঁত না হলেও অপরাজেয়! চিনকে হারিয়েছে সামান্য ব্যবধানে, জাপানের বিরুদ্ধে কিছুটা দাপট দেখিয়েছে আর কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে টার্ফে ভরপুর দাপট, বেলাগাম গোলবৃষ্টি।
কিন্তু থেমে থাকার উপায় নেই। সুপার ফোরে প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া, কোরিয়া ও চিন—তিন দলই প্রবল শক্তিশালী। যে কারণে মনপ্রীত সিং বলেছেন, ‘তিনটে ম্যাচই কার্যত নকআউট। প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, রক্ষণে একটাও ভুল চলবে না!’
ধারাবাহিকতার প্রশ্ন
কোচ ক্রেগ ফাল্টনের প্রথম শর্ত ছিল—ধারাবাহিকতা। সেটা এখনও বড় প্রশ্ন। কাজাখস্তানের বিপক্ষে মাঠভরতি গোল এলো বটে, কিন্তু প্রতিপক্ষ তো মাঠে নামার আগেই টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গিয়েছিল। এর আগে চিন ও জাপানের বিরুদ্ধে কিন্তু ফিল্ড গোলের ঘাটতি চোখে লেগেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়া তিন ম্যাচে ২৩ গোল করেছে, তার মধ্যে ২০-ই ফিল্ড গোল! চিনও পেনাল্টি কর্নার (Penalty Corner) আর ফিল্ড গোলের নিখুঁত ভারসাম্যে এগোচ্ছে। ভারতীয় ফরোয়ার্ডরা—অভিষেক, সুকজিৎ—আক্রমণাত্মক, কিন্তু প্রথম দু’ম্যাচে ছন্দ খুঁজে পাননি। কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে গোল এলেও এবার সুপার ফোরে সেই ফর্ম ধরে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
হরমনপ্রীত-নির্ভরতা
অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং (Harmanpreet Singh) বিশ্বের সেরা ড্র্যাগফ্লিকারদের একজন। টুর্নামেন্টের শুরুতেই হ্যাটট্রিক, জাপানের বিরুদ্ধে দুই গোল। কিন্তু তাঁর উপর বাকিদের এই অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকির। কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে মাত্র একবার স্কোর করলেন। ভাগ্য ভালো, জুগরাজ, অমিত রোহিদাস ও সঞ্জয় এগিয়ে এলেন। না হলে সমস্যা তৈরি হত। হরমনপ্রীতের একটা ‘অফ ডে’ যেতেই পারে। সেক্ষেত্রে বাকিরা কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামাল দিতে প্রস্তুত তো? প্রশ্ন উঠছে!
সতীর্থ মনপ্রীত অবশ্য জোর গলায় বলেছেন, ‘সব দায় হরমনের নয়। তবে ও অধিনায়ক, অভিজ্ঞ, দুর্দান্ত ফ্লিকার। তাই যতবার ওকে ব্যবহার করা যায়, ততই আমাদের পক্ষে ভালো!’ সুরে সুর মিলিয়ে সুকজিৎ যোগ করেছেন, ‘আমাদের দায়িত্ব পেনাল্টি কর্নার তৈরি করা। ওখান থেকে হরমন বা যুগরাজরাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেবেন!’
এখন প্রশ্ন—হরমনকে কিছুটা চাপমুক্ত রেখে যুগরাজকে কতটা কাজে লাগানো যায়। তরুণ এই ড্র্যাগফ্লিকার ইতিমধ্যেই চার গোল করেছেন। সামনে আরও সুযোগ দিলে ফল মিলতে পারে।
শৃঙ্খলাও বড় ফ্যাক্টর
ভারতীয় হকি টিমে কি শৃঙ্খলার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে? তিন ম্যাচে হজম করতে হয়েছে ৫টি সবুজ কার্ড, ২টি হলুদ কার্ড। যা এই প্রতিযোগিতায় বাকি সুপার ফোর দলগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গ্রুপ লিগে ক্ষতি না করলেও এখন এক মুহূর্তের অসাবধানতায় ম্যাচ হাতের নাগাল থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। বিশ্বকাপের টিকিট ঝুলছে যেখানে, সেখানে শৃঙ্খলাই মূল মন্ত্র হওয়া উচিত।
বিপদের নাম ‘আত্মতুষ্টি’
পুল পর্বে ভারতের পারফরম্যান্স আশার আলো জাগিয়েছে। গোলের খরা কেটেছে, রক্ষণ আরও গোছানো। কিন্তু এই সাফল্যে ভেসে গেলে চলবে না। কারণ সামনে আসল পরীক্ষা। প্রতিটি ম্যাচই ‘ডু অর ডাই’। ফর্ম ধরে রাখা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা আর হরমনপ্রীতের উপর নির্ভরতা কমানো—এই তিনটে জায়গায় নজর রাখা একান্ত জরুরি।
কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে ১৫ গোল হোক আত্মবিশ্বাসের ইন্ধন। কিন্তু আত্মতুষ্টির ফাঁদে পা দিলে সে গোলবন্যার কোনও দাম থাকবে না।