সামনে টোকিও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। তার আগে ইউরোপে কয়েকটি রেসে নামবেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে আরও শাণিত করা। আর সেই পথেই বারবার ফিরে আসছে মেজর ঘুগের স্মৃতি।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 4 September 2025 18:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নামকরা নয়। সাদামাটা স্কুল। ঔরঙ্গাবাদের। মাঠে সারি দিয়ে রাখা কাঠের হার্ডলস। সেটাও রংচটা। অথচ একদিন ওই ভাঙাচোরা কাঠের ফলকগুলোতেই আটকে গেল এক কিশোরের চোখ। আর ঠিক সেদিনই শুরু তেজস শিরসের (Tejas Shirse) হার্ডলস–যাত্রা।
আজ তিনি দেশের শিরোপাজয়ী অ্যাথলিট। ১৩.৪১ সেকেন্ডে ছুটে ভেঙেছেন জাতীয় রেকর্ড। যদিও গল্পটা শুধু গতি বা ফিটনেসের নয়—আড়ালে রয়েছে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা আর প্রেরণার কাহিনি।
শিরসের পড়াশোনা মহারাষ্ট্র পাবলিক স্কুলে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রয়াত মেজর জি কে ঘুগে (Major GK Ghuge)। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ। তার আগে ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী। কঠোর শাসক, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন আর খেলাধুলোর অনুরাগী। শিরসের কথায়, ‘হার্ডলস খুব টেকনিক্যাল খেলা। স্কুলেই শুরু করেছিলাম ২০১৫-১৬ সালে। আমাদের খেলাধুলায় প্রচুর উৎসাহ দিতেন। মেজর ঘুগে খুব কড়া ধাতের মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর থেকে আমি শৃঙ্খলা শিখেছি। খেলাধুলোর জন্য প্রচুর চাপ দিতেন। যা আজও কাজে লাগে!’
তেজসের বাঁ-পায়ের লিড টেকনিক তাঁকে আলাদা করে দেয়। ৬০ মিটার আর ১১০ মিটারে জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছেন-গড়েছেন। তবু নিজের কৃতিত্বে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। শিরসের কথায়, ‘ন্যাশনাল রেকর্ড অনেক কিছু হলেও যথেষ্ট নয়। আমি খুশি। কিন্তু জানি, আরও কিছু করার আছে। আমার লক্ষ্য ১৩.২ সেকেন্ডে ধারাবাহিকভাবে দৌড়নো। তখনই বড় প্রতিযোগিতায় সাফল্য আসবে!’
আলোর পাশাপাশি রয়েছে অন্ধকারও। এশিয়ান গেমস, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, প্যারিস অলিম্পিক্স—সব জায়গায়ই ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছেন শিরসে। কিন্তু দমে যাননি। বরং শিখেছেন। তাঁর উপলব্ধি, ‘ব্যর্থতা খুব দরকারি। আমি কখনও দোষ চাপাইনি অন্য কারও উপর। দায় নিয়েছি নিজের কাঁধে। নিজের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি দাবি করি। এটাই আমার শক্তি। আবার দুর্বলতাও বটে। এখন চাপ সামলাতে গিয়ে নিজেকে একটু হালকা করতে শিখছি!’
শিরসে জানেন, বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পদক পেতে গেলে শুধু প্রতিভা যথেষ্ট নয়। দরকার পেশাদার দল। উদাহরণ হিসেবে টানলেন নীরজ চোপড়ার উদাহরণ। বললেন, ‘নীরজ দল বানিয়েছে। বাইরের কেউ নয়। ও-ই নিজের মতো জোনে গেছে। আমাকে-ও সেটা করতে হবে। বিদেশে ট্রেনিং, বড়দের সঙ্গে অনুশীলন—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। আমি বেশিরভাগ সময় একাই ট্রেনিং করি। কিন্তু জুনিয়রের থেকে নয়, সিনিয়রের থেকে শেখার বেশি সুযোগ থাকে!’
শুধু মাঠ নয়, বাইরে থেকেও অনুপ্রেরণা পান শিরসে। টোকিও অলিম্পিকের ধারাভাষ্য চলাকালীন তেজস শঙ্করের ব্যাখ্যা শুনে মুগ্ধ হন। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ভিডিও তৈরির অভ্যাস গড়ে ওঠে তাঁর।
১৩.৪১ সেকেন্ডের রেসটা ভোলেননি শিরসে। বলেছেন, ‘আমি ফিনিশিং লাইন ছুঁতেই জানতাম, পেরেছি! সময়টা দেখার আগেই শরীর বলে দিয়েছিল। ওই প্রস্তুতি, ওই উচ্ছ্বাস, ওই মুহূর্তই বলে দেয় জিতে গিয়েছি!’
এখন সামনে টোকিও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। তার আগে ইউরোপে কয়েকটি রেসে নামবেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে আরও শাণিত করা। আর সেই পথেই বারবার ফিরে আসছে মেজর ঘুগের স্মৃতি। যে শৃঙ্খলার বীজ বোনা হয়েছিল ঔরঙ্গাবাদের এক স্কুল মাঠে, তা আজ ডালপালা মেলে ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সে ছায়া জোগাচ্ছে।