সংসারের চাপে মায়ের গয়না বিক্রি, বাবার না খেয়ে থাকা- সেই অন্ধকার পেরিয়েই আজ সাফল্যের আলো। আইপিএল নিলামে ১৪ কোটিতে উঠল কার্তিক শর্মার নাম, বদলে গেল জীবনের গল্প।

কার্তিক শর্মা
শেষ আপডেট: 18 December 2025 10:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইপিএল ২০২৬ (IPL 2026 Auction) নিলামে ১৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকার দর উঠতেই আলোয় উজ্জ্বল এক নাম—কার্তিক শর্মা (Kartik Sharma)। বয়স মাত্র ১৯। কিন্তু এই চোখধাঁধানো অঙ্কের আড়ালে লুকিয়ে অনাহার, নিঃশব্দ ত্যাগ আর দীর্ঘ অপেক্ষার কঠিন পথচলা। চেন্নাই সুপার কিংসের (Chennai Super Kings) নতুন তারকার কাহিনি শুধুই ক্রিকেটীয় উত্থান নয়, বরং এক আস্ত পরিবারের অকথ্য সংগ্রামের দলিল।
কার্তিকের বাড়ি রাজস্থানের ভরতপুরে (Bharatpur)। নিলামের পর বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানেই ফিরেছিলেন তিনি। খিরনি ঘাটের আগরওয়াল ধর্মশালায় স্থানীয় মানুষজন, ভরতপুর জেলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (BDCA) সদস্যরা সংবর্ধনা দেন তাঁকে। গর্বের মুহূর্ত, কিন্তু চোখে জল ছিল বাবা মনোজ শর্মার (Manoj Sharma)। কারণ, এই সাফল্যের প্রতিটি ধাপে লেগে আছে ত্যাগের ছাপ।
মনোজের আয় ছিল সামান্য। তবু ছেলের স্বপ্নে ভরসা হারাননি। সংবাদসংস্থা আইএএনএস-কে তিনি বলেন, ‘রোজগার সীমিত। কিন্তু আমি আর আমার স্ত্রী রাধা ঠিক করেছিলাম—কার্তিককে ক্রিকেটার বানাবই।’ সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে গিয়ে বাহনেরার (Bahnera) গ্রামে বেচতে হয়েছে জমি, চাষের জমি। রাধা দেবী নিঃশব্দে বিক্রি করেছেন নিজের সাধের গয়নাও। সংসারের সঞ্চয় উজাড় করে ছেলের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ—এই তাঁদের লড়াই।
সবচেয়ে কঠিন সময় এসেছিল গ্বালিয়রের (Gwalior) এক টুর্নামেন্টে। বাবা-ছেলে ভেবেছিলেন, চার-পাঁচ ম্যাচেই দল ছিটকে যাবে। সেই সময়টুকুর থাকার টাকাই ছিল তাঁদের সম্বল। কিন্তু কার্তিকের ব্যাট থামল না। দল পৌঁছে গেল ফাইনালে। টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় বাবা-ছেলেকে রাত কাটাতে হয় নাইট শেল্টারে। ‘একদিন না খেয়ে ঘুমোতে হয়েছিল!’ স্মৃতিচারণ মনোজের, ‘ফাইনাল জিতে প্রাইজমানি পাওয়ার পরই বাড়ি ফেরার রাস্তা খুলেছিল।’
কার্তিকের প্রতিভা অবশ্য খুব ছোটবেলাতেই ধরা পড়েছিল। আড়াই বছর বয়সে ব্যাট হাতে এমন জোরে বল মারেন, যে বাড়ির দু’টো ফটোফ্রেম ভেঙে যায়। তখনই বাবা বুঝেছিলেন—এই ছেলেটা আলাদা। নিজেও একসময় ক্রিকেটার ছিলেন মনোজ। চোটের জন্য থেমে যায় তাঁর স্বপ্ন। ‘আমি পারিনি, তাই ছেলেকে দিয়ে পূরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম!’ বলেন তিনি।
তবে প্রতিভা থাকলেও পথ এতটুকু মসৃণ ছিল না। অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬ খেলার পর টানা চার বছর কোনও দলে সুযোগ পাননি কার্তিক। অনেকেই তখন হাল ছেড়ে দিত। তিনি দেননি। বলেন, ‘খেলে গিয়েছি। বাবা নিজে ট্রেনিং করাতেন!’ ধীরে ধীরে এল অনূর্ধ্ব-১৯, তারপর রঞ্জি ট্রফি (Ranji Trophy)। সেখান থেকেই খুলে যায় আইপিএলের দরজা।
হঠাৎ বিপুল অর্থ, পরিচিতি—তবু পা মাটিতেই রাখতে চান কার্তিক। এ বছরই দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করেছেন। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেও স্পষ্ট। ছোট ভাই ক্রিকেট খেলে, মেজো ভাই পড়াশোনায় মন দিয়েছে—পরিবারে ভারসাম্যের চর্চাই মূল শিক্ষা।
মা গয়না বিক্রি করেছিলেন, বাবা না খেয়ে রাত কাটিয়েছেন—আজ সেই ত্যাগেরই দাম মিলেছে ১৪ কোটি ২০ লক্ষে। কার্তিক শর্মার গল্প তাই শুধু আইপিএলের নয়, হাজারো ছোট শহরের স্বপ্ন দেখার সাহসের প্রতিচ্ছবি।