সিরিজ এখন ক্রিকেটের সবথেকে ঐতিহ্য মন্ডিত ঠিকানায় পৌঁছল। সেন্ট জনস উড রোড, এন ডব্লিউ ৮ - লর্ডস গ্রাউন্ডের পোস্টাল ঠিকানা, ক্রিকেটের পীঠস্থান।

লর্ডসে ইতিহাসের হাতছানি
শেষ আপডেট: 9 July 2025 17:50
সিরিজ এখন ক্রিকেটের সবথেকে ঐতিহ্য মন্ডিত ঠিকানায় পৌঁছল। সেন্ট জনস উড রোড, এন ডব্লিউ ৮ - লর্ডস গ্রাউন্ডের পোস্টাল ঠিকানা, ক্রিকেটের পীঠস্থান। লর্ডস কিন্তু কোনও সাধারণ কোনও মাঠ নয়। একটি ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। ক্রিকেটের ধর্মীয় এক আবেগ। কিন্তু জেন এক্স ভারতীয় দলের কাছে এর কোনও আলাদা অনুভূতি নেই, এটা একটা টেস্ট ম্যাচ নিছক মাত্র।
লর্ডসের নিজস্ব একটা হৃদস্পন্দন আছে। লং রুম - তার দেওয়ালে ছবির সারি এক অন্য নিস্তব্ধতা বয়ে আনে। যেন এক ক্যাথেড্রাল এ প্রবেশ করলাম আমরা। ড্রেসিং রুম থেকে মাঠ অবধি ছোট পদচারণা আপনাকে ভ্রূভঙ্গি থেকে বাঁচাবে না। বেকন অ্যান্ড এগ টাই পরিহিত মেম্বারস রা জিন এন্ড টনিক হাতে নিয়ে অথবা কিউবান সিগার ধূমপান করতে করতে আপনাকে হয় মৃদু করতালি দিয়ে অভিবাদন করবে না হয় ফিস ফিস করে আপনার সম্পর্কে দু কথা গালমন্দ করবে। কিন্তু এই তরুণ ভারতীয় দল “চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উচ্চ যেথা শির“ মনোভাব নিয়ে লর্ডসে খেলতে নামছে। অতীতের গ্ল্যামার-এর পিছুটান তাদের নেই , রয়েছে এক চরম উচ্ছাকাংখা- প্রতিস্পর্ধা, জেতার এক প্রবল অদম্য ইচ্ছে, পেছনের জয় বা পরাজয় তাদের স্পর্শ করে না।
এজবাস্টন-এর জয় সমস্ত কিছু পাল্টে দিয়েছে। হঠাৎ করে ভারত কে মনে হচ্ছে অনেক বেশি স্থিতিশীল দল - তা যতই কোহলি, রোহিত এবং অশ্বিন অবসর নিক বা বুমরাহ রোটেশন পলিসির জন্য অনুপস্থিত থাকুক। ব্যাটিং কে অত্যন্ত দায়িত্বশীল লেগেছে। বোলিং বুমরাহর অনুপস্থিতিতে তুখোড় , তীক্ষ্ণ এবং নির্মম সার্জেননের ছুরির মতো নিস্তব্ধ কিন্তু সতেজ। ক্ষুধার্ত কিন্তু শান্ত। এটা ভারতীয় ক্রিকেটের এক নতুন ধারা।
লর্ডসে এবার আমরা শুকনো গরম গ্রীষ্মের আভাস পাচ্ছি। কুলদীপকে দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবে খেলানোর যথেষ্ট যুক্তি আছে। কুলদীপের রিস্ট স্পিন ইংল্যান্ডের বাঁহাতি মিডিল অর্ডারকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলতে পারে। কিন্তু কুলদীপকে খেলাতে গিয়ে উইনিং টিম কম্বিনেশন ভাঙা কি ঠিক হবে ?
জসপ্রীত বুমরাহর ফিরে আসা তার একটা নিজস্ব চার্ম বহন করে। বুমরাহকে জায়গা করে দিয়ে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণার বাদ পড়া প্রায় এক প্রকার নিশ্চিত। বুমরাহ, সিরাজ, আকাশদীপ, সুন্দর এবং জাদেজা - ভারতের বোলিং অত্যন্ত বৈচিত্রময় এবং সমৃদ্ধশালী। পিচ যদি চতুর্থ দিনে ভেঙে না যায়, জাদেজার অভ্রান্ত নিশানা এবং সুন্দরের নিপুণ বৈচিত্র্য যথেষ্ট ইংরেজদের কোমর ভেঙে দেবে দেবার জন্য। তথাপি কুলদীপের অসাধারণ বৈচিত্র্য শুকনো পিচে বিশেষ করে, তাঁকে ওয়াইলডকার্ড হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য করবে।
ভারতের এই বেঞ্চ এত শক্তিশালী এবং ম্যাচ রেডি যেটা তাদের দলের গভীরতা কে নির্দিষ্ট করে। এঁরা বেঞ্চ গরম করা প্লেয়ার নন, এরা ক্ষুধার্ত সিংহ। এটি একটি ঐতিহ্যশালী দলের সুনিপুণ ব্যাকআপ সিস্টেম এর ইঙ্গিতবাহী। এবার ব্যাটিং-এর দিকে চোখ ফেরানো যাক - শুরুতে অধিনায়ক গিল। যিনি একেবারে দায়িত্ব নিয়ে দলকে প্রায় অন্য মেরুতে নিয়ে গেছেন। তিনটে শতরান বড় কথা নয়, যে ভাবে ঠান্ডা মাথায় ৫৮৫ রান করলেন , তাতে তাঁর সম্পর্কে অন্য মাত্রার শ্রদ্ধা হয়।
গিলের ব্যাটিং দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি সিরিজের গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজের খেলার খলনলচে বদলে ফেলেছেন এবং একজন নতুন তরুণ অধিনায়ক যখন এরকম ব্যাটিং করেন তখন ড্রেসিং রুমে তাঁর সম্মান যে বেড়ে যায় বলাই বাহুল্য।
জয়সওয়ালের ব্যাটিংয়ে তারুণ্য এবং অকুতোভয় ব্যাপারটা প্রবল মাত্রায় উপস্থিত। কেএল রাহুল তার ব্যাটিং দ্বারা দলে স্থিতিশীলতা এনেছেন। লোয়ার অর্ডারে পন্থ এর ক্রিয়েটিভিটি সঙ্গে সুন্দর এবং জাদেজার নির্ভরতা দলকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন জুগিয়েছে। ভারত এখন প্রত্যেকটা উইকেটে পার্টনারশিপ করছে। আগুনের বদলা আগুন . কোনও ধুকপুক নেই, শুধু সময় এবং দলের প্রয়োজন বুঝে খেলা।
এই নব্য ভারত কোনও একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি একটি সমষ্টিগত দলের পরিচয়।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড দল লিডসে জয়ের পর এজবাস্টনে হটাৎ মুখ থুবরে পড়ল। যে বাজবলের জন্য তারা বিখ্যাত - সেই হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ড মডেল খুব ভালো চলে যখন চলে কিন্তু যখন চলে না তখন তার কি বিশ্রী অবস্থা হয় আমরা দেখতে পেলাম। ভারতের ব্যাটিং এবং বোলিং গভীরতা বাজবলের দুর্বলতা একেবারে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের ওপেনিং জুটি দুর্বল, মিডিল অর্ডার ধারাবাহিকতার অভাব এবং বোলিং যত কম বলা যায় ভাল। ব্রড এবং অ্যান্ডারসনের অবসরের পরে ইংল্যান্ডের পেস অ্যাটাক বাংলা রঞ্জি দলের থেকেও খারাপ।
বেন স্টোকস এখনও ইংল্যান্ড দলের রক্ষাকবচ। নির্ভীক যোদ্ধা, নেতা, ধুরন্ধর স্ট্রাটেজিস্ট। কিন্তু ক্রিকেট ১১ জনের খেলা। স্টোকস একা কি করবে? মার্ক উড এবং জফরা আর্চার টিমে এলে হয়ত কিছু উন্নতি হবে কিন্তু তাদের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইংল্যান্ডের স্পিনারদের সম্পর্কে যত কম বলা যায় ততই ভাল। দল এবং খেলা নিয়ে ইংল্যান্ডকে অনেক ভাবতে হবে। শুধু দল নির্বাচন নয়, দল কী ভাবে এই তরুণ অকুতোভয় ভারত কে সামলাবে।
লর্ডস ঐতিহাসিক ভাবে এমন এক মাঠ যেখানে ইংল্যান্ড নিজেদের কে পুনঃ আবিষ্কার করে এবং নিজেদেরকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এবার কী হবে কেউ জানে না। হাওয়া তীব্র ভাবে ভারতের দিকে।
লর্ডসের ঐতিহ্য এক কথায় অপরিসীম। ডব্লিউ জি গ্রেস, ব্র্যাডম্যান, কপিলের ১৯৮৩ ফাইনালের সেই ক্যাচ, গাঙ্গুলির শার্ট খোলা। লর্ডস অনেক কিছুর সাক্ষী। লর্ডস এক ক্রীড়া অ্যাম্ফিথিয়েটার। কিন্তু এই নব্য ভারতের কাছে এটি নিছক একটি মাঠ। বিস্ময় ভরা চোখে দেখার দিন শেষ, এখন জয় করার পালা। গিলের এই ভারত মাথা নোয়াতে রাজি নয়। তারা ইতিহাস বদলাতে চায়। এজবাস্টন যদি সিরিজের সমতা ফেরানোর সাক্ষী হয়, লর্ডস তাহলে ভারতের এই তরুণ তুর্কিদের ইতিহাস লেখার মাঠ। তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছে তাঁরা এখানে থাকবার জন্য এসেছেন।