স্টোকস নেই, আর্চার নেই, বুমরাহ অনিশ্চিত! এক অদ্ভুত সিরিজের চূড়ান্ত টেস্টে উত্তেজনার পারদ চরমে। ওভালের সবুজ পিচে বাজবলের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 31 July 2025 12:05
দেখতে গেলে এটি একটি অদ্ভুত সিরিজ। কিছু বিশেষজ্ঞের কাছে এই সিরিজ ২০০৫ অ্যাশেজ সিরিজের মতোই উত্তেজক এবং টানটান, যেখানে চূড়ান্ত যবনিকা লর্ডসের সেই তীব্র বেদনা - স্যার জাদেজা যেখানে উল্টোদিকে সিরাজের ব্যাট থেকে বল স্টাম্পে গড়িয়ে পড়ার হৃদয় বিদারক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ্য করলেন। তারা এটাও বলছেন যে চতুর্থ টেস্টে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে ০/২ থেকে নিদারুণ লড়াই করে টেস্ট ড্র করা- এটাও এই সিরিজের এক দারুণ মুহূর্ত। অথবা লিডসে প্রথম টেস্ট যেখানে ইংল্যান্ড শেষ দিনে পাহাড় পর্বত রান তাড়া করে জিতে যায়। অথবা দ্বিতীয় টেস্টে ভারত কীভাবে বুমরাহ ছাড়া জিতল।
বস্তুত, এই সিরিজ এর চারটি টেস্টই একটি মহান সিরিজের মাল-মশলা নিয়ে উপস্হিত হয়েছে।
অথচ এর উল্টো টাও কিন্তু বলা যায়। কারণ এই সিরিজের প্রত্যেকটি টেস্টের উইকেট একদম পাটা এবং দুই দলের বোলিং আক্রমণ অত্যন্ত সাদামাটা- কাজেই প্রত্যেক টেস্টেই খেলা মোটামুটি ভাবে প্রত্যাশিত ভাবে এগিয়েছে পঞ্চম দিন অবধি, যেখানে গিয়ে প্রত্যেক বার ক্রিকেট এক মহান অনিশ্চয়তার খেলা হিসেবে এক অতি উত্তেজক মোড় নিয়েছে।
এটা হবার প্রধান কারণ ইংল্যান্ডের বহু প্রচলিত বাজবল। বাজবলের প্রথম শর্ত হল, পাটা উইকেট। যেখানে তাদের ওভার পিছু ৫+ রানের ব্যাটিং স্টাইল বজায় রাখতে পারবে তারা। জো রুটকে বাদ দিলে তাদের ব্যাটিং লাইন আপে এমন কেউ নেই যে মুভিং বলে পারদর্শী, অথবা তীব্র গতির পেসে, অথবা কোয়ালিটি স্পিন অ্যাটাকের বিরুদ্ধে।
এই সিরিজ এক অদ্ভুত সিরিজ- যেখানে শেষ মুহূর্তে অনেক নাটক, মিলনান্তক এবং বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দিন- ভারতের হেড কোচ বনাম ওভালের কিউরেটর লি ফোর্টিস। বুধবার ইংল্যান্ড যখন দল ঘোষণা করল, দেখা গেল তাদের ক্যাপ্টেন বেন স্টোকসের নাম নেই। স্টোকস লর্ডস এবং ওল্ড ট্রাফোর্ডে অত্যধিক বোলিং করায় শরীরের ওপর চাপ পড়ায় কাঁধের পেশীতে যে চাপ পড়ল তাতে ৩৫ বছর বয়স্ক স্টোকস কে আসন্ন অ্যাশেজের কথা ভেবে নিজেকে সরিয়ে নিতে হল।
আরেকটি বিষয় আমাদের চমকে দিল।যারাই পিচ দেখেছিলেন, স্টোকস এবং গিল সমেত, সবার মত ছিল যে, ওভালের পিচ পেস বোলারদের সহায়ক পিচ। দূর থেকে পিচ একদম সবুজের আভা, যা দেখে ক্যাপ্টেনরা তাঁদের টিম পেসার দিয়ে সাজাতে শুরু করেনা।
ভারত তাদের ১ নং পেসারকে খেলাবার কথা ভাবছে। বুমরাহ এই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ইংল্যান্ড টিমকে উপরে ফেলার পক্ষে একদম আদর্শ বোলার।
কিন্তু অধিনায়ক গিলকে যখন প্রেস কনফারেন্সে বুমরাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হল, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, “আমরা উইকেট দেখে ভাবব কী করব।” সিরিজের আগে যদিও ঠিক হয়েছিল যে, বুমরাহ ৩টির বেশি টেস্ট খেলবেন না। তথাপি, ওভালের উইকেট দেখে এবং সিরিজ ১-২ পিছিয়ে, এই অবস্থায় বুমরাহকে খেলানো যাই কিনা এ এক উত্তেজক সিদ্ধান্ত হতে পারে- এবং ইংরেজিতে যাকে বলে ট্রিকি কল।
ভারত বলতে পারে তাদের কাছে বুমরাহর যোগ্য বিকল্প আছে, কারণ একমাত্র যে টেস্ট তারা এই সিরিজে জিতেছে তা বুমরাহ ছাড়া। কিন্তু ইংল্যান্ড সেই একই কথা বলতে পারবে না তাদের কুশলী অধিনায়ক স্টোকসের ব্যাপারে। এই দলের হৃদয়, হাত-পা সবই স্টোকস। তাঁকে ছাড়া ইংল্যান্ডকে মাঠে নামতে হবে অন্য স্ট্রাটেজি মাথায় রেখে।
লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ ব্যক্তিত্বদের মতো একটি টিম অস্তিত্বহীনতায় ভোগে যখন তাদের প্রাণপুরুষ মাঠে নামতে পারেন না। স্টোকসকে অনুকরণ করা অসম্ভব। স্টোকসের অধিনায়কত্ব অদ্ভুত এবং সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে। সনাতন অধিনায়কদের মতো নয়। ড্রইং বোর্ড থেকে মাঠে সেটা নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। অলি পোপ কি পারবে সেটা অনুকরণ করতে বা নিজের বাজবল পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে?
বেন স্টোকস যে এনার্জি তাঁর দলের মধ্যে সঞ্চারিত করেন, তা এক কথায় অনুনকরণীয়। স্টোকস টিম নিয়ে যখন মাঠে নামেন তখন দলের মধ্যে যে চার্জ দেখা যায় তা এক কথায় অভাবনীয়। স্পাইডার ম্যানের মতো হাইপার একটিভ ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব তিনি, সারাক্ষণ টিম কে তাতিয়ে রাখা, ফিল্ডার বদল করা , টিমের সঙ্গে কথা বলা, আম্পায়ারদের সঙ্গে কথা বলা এবং খেলা শেষ হবার আগেই ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে করমর্দন করা। স্টোকসের মধ্যে যে ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব এবং গ্ল্যামার আছে তা অন্যের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা।
স্টোকসের চালিকা শক্তি অপরিসীম। অলি পোপের পক্ষে স্টোকস হওয়া বেশ শক্ত। এ ছাড়া যখন দল হতোদ্যম হয়ে পড়বে তখন বাড়তি অক্সিজেন কে জোগাবেন? যখন দলের মনোবল তলানিতে তখন হাত ঘুরিয়ে ১০ ওভার বল এখানে কে করবেনা? পোপ তা করতে পারবেন না। পোপের উচিত তাঁর নিজের ক্রিকেট বুদ্ধি প্রয়োগ করা। তাহলে কি ইংল্যান্ড এক নতুন বাজবল প্রয়োগ করবে?
এই সিরিজ সত্যি এক অদ্ভুত সিরিজ। দুই দলই ভাববে তাদের এই সিরিজ জেতা উচিত ছিল। ইংল্যান্ড ভাববে তারা ম্যাঞ্চেস্টারে চতুর্থ দিনেই খেলা শেষ করে সিরিজ জিততে পারত। ভারত ভাববে লিডস এবং লর্ডসে জেতা ম্যাচ তাদের হাতছাড়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের ক্ষতচিহ্ন অনেক তাজা এবং চতুর্থ এবং পঞ্চম টেস্টের মাঝে সময় অনেক কম। নতুন অধিনায়ক পোপের তত্বাবধানে তাদের নতুন করে সবকিছু উদ্ভাবন করতে হবে।
ভারতের জন্য ব্যাপারটা অনেক সোজা। শেষ টেস্টে এসে তাদের অনেক ব্যালান্সড মনে হচ্ছে। ম্যাঞ্চেস্টারে টেস্ট ড্র করে গিলকে আর প্রশ্ন করা যাবে না কেন কুলদীপ কে না খেলিয়ে অলরাউন্ডার খেলানো হচ্ছে। কুলদীপকে না খেলানো নিয়ে অবশ্য জলঘোলা কম হল না। কিন্তু ভারত যেভাবে খেলছে সে প্রশ্ন চাপা পড়ে গেল।
সিরিজের প্রথম পিচ যেটা একদম সবুজ হতে চলেছে এবং দুই দলের সেরা দুই বোলার- আর্চার এবং বুমরাহ প্রথম একাদশে নেই। এটি সত্যি এক অদ্ভুত সিরিজ। ইংল্যান্ড অন্ধকারে হাতরাচ্ছে, ভারত লম্বা টানেলের শেষে আলো দেখতে পাচ্ছে।