চার টেস্ট, ২০ দিন, ৫৯ খানা সেশনের সমাপ্তি পর্ব শুরু হচ্ছে আজ। বাইশ গজের যুদ্ধের গগগনে আঁচ আরও বাড়িয়েছে মাঠের বাইরে টেনশন।

শুভমান-গম্ভীর
শেষ আপডেট: 31 July 2025 11:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মে মাসের ৭ তারিখ রোহিত শর্মা অবসর না নিলে ছবিটা অন্যরকম হত।
জুনে জসপ্রীত বুমরাহ চোট-আঘাতের কারণ সামনে টেনে স্বেচ্ছায় নির্বাচকদের প্রস্তাব নাকচ না করলেও দ্বিতীয় বিকল্পের দেখা মিলত।
দুটোর কোনওটাই সত্যি হয়নি। কোচ-অধিনায়কের অনেক স্মরণীয় জুটি ভারতীয় ক্রিকেট আগে দেখেছে। সেটা হতে পারে গ্যারি কার্স্টেন-মহেন্দ্র সিং ধোনি, হতে পারে জন রাইট-সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা রবি শাস্ত্রী-বিরাট কোহলি। সমস্ত সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক আর সমালোচনাকে দূরে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, এমন পার্টনারশিপ ভারতীয় ক্রিকেটের নকশা অনেকখানি বদলে দিয়েছে। কোন পথে জাতীয় দল এগবে, তার ব্লু-প্রিন্ট বাতলে দিয়েছে।
গৌতম গম্ভীর-শুভমান গিল জুটির যাত্রা সবে শুরু। সামনের পথ অনেকটা। যদিও অগ্রজদের সঙ্গে ফারাক একটাই। এই পার্টনারশিপ, এই সম্পর্ক তথাকথিত ‘অর্গ্যানিক’ নয়। আজ রোহিত অবসর না নিলে, বুমরাহ নেতৃত্বের প্রস্তাব না ফেরালে শুভমান গিল দলের বিশ্বস্ত মিডল অর্ডার ব্যাটার হিসেবে প্রথম একাদশে জায়গা পেতেন। না জড়াতেন ডাকেট-ক্রলির সঙ্গে ঝামেলায়, না মিডিয়ার মুখোমুখি হতে হত।
অথচ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে সবকিছু। যেটা হওয়ার ছিল না, সেটাই হয়েছে। টিম ইন্ডিয়ার টেস্ট অধিনায়ক শুভমান ও হেডকোচ গৌতম গম্ভীর আজ ওভালের প্রি-ম্যাচ কনফারেন্সে পাশাপাশি বসে। স্রেফ টেস্ট জিততে নয়, দলকে প্রাপ্য সম্মান কিংবা সমর্থক-অনুরাগীদের গর্বিত করতেও নয়—আজ একজন বাইশ গজে নামবেন, অন্যজন সাজঘরে বসে কড়া নজর রাখবেন এটা মাথায় রেখে যে, সিরিজ ড্র করে দেশে ফেরা মানে সংশয়ী, ছিদ্রান্বেষী, যাঁরা সফর শুরুর আগে ভারত কত ব্যবধানে হারবে তার অনুমান শুরু করেছিলেন, তাঁদের মুখে ঝামা ঘষে দেওয়া, নিজেদের আসন আরও পাকাপাকিভাবে মজবুত করা এবং তরুণ ব্রিগেডও যে বড় মঞ্চে সাফল্য পেতে পারে—এই বোধ শুধু অনুরাগীদের মধ্যে নয়, ক্রিকেটবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া!
চার টেস্ট, ২০ দিন, ৫৯ খানা সেশনের সমাপ্তি পর্ব শুরু হচ্ছে আজ। বাইশ গজের যুদ্ধের গগগনে আঁচ আরও বাড়িয়েছে মাঠের বাইরে টেনশন। পিচ কিউরেটরের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছেন গম্ভীর। বল পরিবর্তন নিয়ে আম্পায়ারের সঙ্গে তর্ক বাঁধিয়েছেন ঋষভ পন্থ। সময় নষ্ট নিয়ে ইংরেজ ব্যাটারদের দিকে তেড়ে গিয়েছেন শুভমান। লিডস, এজবাস্টন, লর্ডসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের উপসংহার মঞ্চ ওভাল। ইংল্যান্ড জিতলে ট্রফি বগলদাবা করে বাড়ি যাবেন স্টোকসরা। আর ভারতের জয় মানে আধাআধি সম্মানভাগ। জুনের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় দল যখন ইংল্যান্ড উড়ে গেল, তখন চার টেস্টের পর এমন সম্ভাবনার কথা বললে অতি বড় সমর্থকও হয়তো বিশ্বাস করতেন না। সিরিজ ফিনালের বল গড়ানোর আগে এই পরিসর তৈরি করাটাই গৌতম-গিল জুটির বড় সাফল্য।
কোচ গম্ভীরের কাছে এই সফর ছিল আত্মনিরীক্ষা, আত্মবিশ্লেষণের। যতই চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতুন না কেন, তার আগে ঘরের মাঠে লাল বলের ক্রিকেটের নিউজিল্যান্ডের হাতে হোয়াইটওয়াশ হওয়া এবং অজিদের ঘরের মাঠে বর্ডার-গাভাসকর ট্রফি খুইয়ে আসার ক্ষত এখনও দগদগে। ইংল্যান্ডে সিরিজ হারার অর্থ পরপর তিনটি সিরিজে পরাজয়। যা কোচের কুর্সি টালমাটাল রাখার জন্য যথেষ্ট। ওভাল টেস্ট জিতে সেই আসন মজবুত রাখতে চাইবেন গম্ভীর।
অন্যদিকে শুভমান। সিরিজ শুরুর আগে নাগাড়ে অপবাদ শুনে যেতে হয়েছে, তিনি দেশের মাটিতে পাটা পিচে বাঘ, বিদেশের জমিতে ব্যর্থ। কৃষ্ণামাচারি শ্রীকান্ত থেকে সুনীল গাভাসকর—কেউ প্রচ্ছন্ন সুরে, কেউ প্রকট ঢঙে সতর্কবার্তা ছুড়ে দিয়েছিলেন। লিডসে সেই যে রানের পাহাড় গড়া শুরু করলেন, তা চার নম্বর টেস্টেও থামেনি। চারখানা সেঞ্চুরি সমেত ৭২২ রান! সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। সফরে আসার আগে ‘আমি সিরিজের সেরা ব্যাটসম্যান হতে চাই’ বলাটা যে বুদ্ধিভ্রষ্ট অহমিকা ছিল না, তার প্রমাণ ব্যাট হাতে সাফ সাফ দিয়েছেন শুভমান গিল!
বাকি ছিল অধিনায়ক হিসেবে নিজের জাত চেনানো। মাথা নুইয়ে, বিনীত সুরে কথা বলা পাঞ্জাবের তরুণ যেন ইংল্যান্ডের বাইশ গজে নবজীবন পেয়েছেন। কখনও স্থিতধী… মনে পড়েছে ধোনির কথা, কখনও আগ্রাসী… কোহলির স্মৃতি উস্কে উঠেছে! এখনও অনেক জার্নি বাকি। কিন্তু যেভাবে নিজের দাপট ও ব্যক্তিত্ব দেখিয়েছেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, দীর্ঘ সফর ও অনবরত চোট-আঘাতে জর্জরিত ড্রেসিংরুমকে একসূত্রে গাঁথার যে পর্বতপ্রমাণ চ্যালেঞ্জ সামনে দাঁড়িয়েছিল, তা অতিক্রম করেছেন শুভমান। ‘বিশ্বস্ত ব্যাটার’ থেকে ‘আস্থাভাজজন অধিনায়ক’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আসলে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী জার্নি। গন্তব্য এখনও দূর। কিন্তু সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছেন শুভমান। ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যাটে রান আসাটা যে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, তাকে মূলধন করেই আগামী দিনে এগিয়ে যেতে চান!
সাংবাদিক সম্মেলনে গতকাল যে ভঙ্গিমায় জবাব দিচ্ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল মানুষ হিসেবেই বুঝি জন্মান্তর হয়েছে! ‘এই সিরিজ আমাদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার সমৃদ্ধ করেছে। আসলে বেশ কিছু জিনিস স্রেফ অভিজ্ঞতায় অর্জিত হয়। আমি নিজেও এই চার টেস্ট থেকে অনেক বিষয় জেনেছি, বুঝেছি। আশা করি, সিরিজের শেষটুকু আমরা খুব ভালভাবে করতে পারব!’
শুভমানের কথা সত্যি হোক। দেশের তামাম ক্রিকেট অনুরাগীর আপাতত এটুকুই চাওয়া।