মাইকেল নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র মাত্র তিনটি শব্দে বাঁধা—ড্রিম, প্ল্যান, রিচ। স্বপ্ন সকলেরই থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে যদি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা জুড়ে না যায়, তাহলে দিশাহীন হয়ে পড়টা স্বাভাবিক।

মাইকেল ফেলপস
শেষ আপডেট: 18 January 2026 13:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর লড়াইয়ের ময়দান সাঁতার। তরল জলেই জটিল যুদ্ধ জিতে নিয়েছেন মাইকেল ফেলপস (Michael Phelps)। সুইমিং সাম্রাজ্যের অবিসংবাদী চ্যাম্পিয়ন৷ তেইশ-তেইশটা সোনার মেডেল। অলিম্পিক্সে (Olympics)। পাঁচটা রুপো। অ্যাথলিটরা যখন এমন গ্ল্যামারাস মঞ্চে নিদেনপক্ষে একটা ব্রোঞ্জপ্রাপ্তিকেই জীবনের অন্যতম অর্জন বলে মনে করেন, তখন ফেলপসের চিন্তার ‘স্ফেয়ার'টাই আলাদা। যেখানে সোনা বিনে বাকি সবকিছু তুচ্ছ... সত্যি বলতে নিরর্থক৷ কেউ জিজ্ঞেস করলে নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেন, অলিম্পিক্সে (Olympics) তিনি তেইশটিই ‘পদক' জিতেছেন৷ ‘আঠাশে'র হিসেব তো গুগলের৷ তাঁর নয়। নিজের রেকর্ডখাতায় বাকি পাঁচটার কোনও এন্ট্রি নেই৷ তারা ত্যাজ্য৷ বাতিল৷ সোনাই শুধু সাফল্যের স্মারক নয়, স্বীকৃতির ‘একমাত্র' খতিয়ান।
মধ্যমেধার এ ভবসাগরে যখন তুচ্ছ অর্জনকেও দ্বিগুণ, তিনগুণ, শতগুণ বাড়িয়ে দেখার ও দেখানোর রোগ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গিয়েছে, তখন নিছক সাফল্যের অঙ্কে নয়, চিন্তার এ বিপুল সাম্রাজ্যেও মাইকেল ফেলপস (Michael Phelps) যেন এক ও একাকী৷ ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ'—শব্দবন্ধ বহু ব্যবহারে ক্লিশে হলেও মার্কিন সাঁতারুর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যেন খাপে খাপ মিলে যায়।
‘ড্রিম–প্ল্যান–রিচ’: ফেলপসের তিন সূত্র
মাইকেল নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র মাত্র তিনটি শব্দে বাঁধা—ড্রিম, প্ল্যান, রিচ। স্বপ্ন সকলেরই থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে যদি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা জুড়ে না যায়, তাহলে দিশাহীন হয়ে পড়টা স্বাভাবিক। স্বপ্ন কেবল আবেগ জাগায়, পথ দেখায় পরিকল্পনাই।
রাজ শামানির (Raj Shamani) পডকাস্টে ফেলপস স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আজ তুমি কী করতে পারছ—সেটাই আসল। গতকাল বা আগামিকাল নয়।’এই ‘বর্তমান’-কেন্দ্রিক মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। লক্ষ্যকে ভবিষ্যতের মায়াবী কিছু না বানিয়ে, ফেলপস নামিয়ে এনেছেন প্রাত্যহিক রুটিনে।
একাগ্র সিদ্ধান্ত কেন জরুরি?
কিশোর বয়সেই ফেলপস বাকি সব খেলাধুলো ছেড়ে শুধু সাঁতারে মন দেন। সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। ভয় ছিল। দ্বিধা ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন, অর্ধেক মন নিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছনো যায় না। একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আর পিছনে তাকাননি।
এই জায়গাটাই তাঁর দর্শনের ভরকেন্দ্র। ‘তুমি কী চাও’—প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে নেওয়া। তারপর সেই জবাবের সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসকে মিলিয়ে নেওয়া। ফেলপসের ভাষায়, ‘গোলটা ঠিক করো। তারপর সবচেয়ে ছোট ছোট জিনিসগুলো ধরো, যেগুলো করলে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছনোর একটা সুযোগ তৈরি হয়।’
অজুহাতের কোনও জায়গা নেই
ফেলপসের সিস্টেমে সবচেয়ে কঠিন শব্দ সম্ভবত ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ আসলে নিজের কাছেই সবচেয়ে বেশি মিথ্যে বলে। লক্ষ্য থাকলেও, কাজ না করলে সেটা শুধু কথার ফুলঝুরি। বক্তব্য পরিষ্কার—যদি টার্গেট সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে অজুহাত জন্মাতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে না করা, শরীর খারাপ লাগা, মন না চাওয়া—এই সবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই: লক্ষ্যটা কি জরুরি, যে এই অস্বস্তিগুলোকে পাশ কাটিয়ে কাজের কাজটা করবে? ফেলপস স্বীকার করেছেন, এমন বহু দিন ছিল যখন ট্রেনিংয়ে যেতে মন চায়নি। তবু গিয়েছেন। কারণ টার্গেট বরাবর তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পেয়ে এসেছে!
অভ্যাসই পরিচয় গড়ে দেয়
ফেলপসের সাফল্যের আরেকটা বড় স্তম্ভ—অভ্যাস। অনুপ্রেরণার উপর ভরসা করেননি। কারণ সেটা আসে-যায়। কিন্তু অভ্যাস থাকলে কাজ থামে না। প্রতিদিন কী করছ, সেটাই বলে দেয় তুমি আসলে কে। ৩০ দিনের নিয়মিত চর্চার পর কোনও কাজ আর আলাদা করে ভাবতে হয় না—পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। এই ধারাবাহিকতাই ২০০৪ থেকে ২০১৬—পাঁচটা অলিম্পিক্স (Olympics) জুড়ে একই মান ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
সাফল্যের পরের শূন্যতা ও মানসিক লড়াই
তবে এই নিখুঁত সিস্টেমও ফেলপসকে মানসিক অন্ধকার থেকে বাঁচাতে পারেনি। অলিম্পিক্স (Olympics) জেতার পরেও গভীর শূন্যতা গ্রাস করেছিল। লক্ষ্য পূরণ হলে কী হবে—এই প্রশ্নের উত্তর ফেলপসের কাছে তখন ছিল না। ২০১৪ সালের পর তিনি থেরাপির সাহায্য নেন। মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেন। আজ ফেলপস স্বীকার করেন, শরীরের মতো মনের যত্ন নেওয়াও জরুরি। ব্যায়াম আর মেডেলের জন্য নয়—মানসিক ভারসাম্যের জন্যও সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
পুলের বাইরে ফেলপস: জীবনের নতুন লক্ষ্য
আজ ফেলপস তিন সন্তানের বাবা। জীবনের প্রশ্ন বদলেছে। এখন আর ‘আমি কতটা জিতব?’ নয়। বরং, ‘আমার সন্তানদের জীবনে সেরা সুযোগটা কীভাবে দেব?’—বদলে গিয়েছে সওয়ালের বিন্যাস! তবু সূত্র পাল্টায়নি। লক্ষ্য ঠিক করা। ভেঙে নাও। প্রতিদিন কাজ করো। মুছে ফেল অস্বস্তি। আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সামনে সৎ থাকো।
এই কারণেই ‘মাইকেল ফেলপস (Michael Phelps) প্রটোকল’ কেবল সাঁতারের কাহিনি নয়। জীবন গড়ার এক ব্যবহারিক নকশা। যেখানে সাফল্য কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত অভ্যাসের অনিবার্য ফল।