এই জয় দেখাল, ভারতীয় টেনিসে আবার গভীরতা তৈরি হচ্ছে। যার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে দক্ষিণেশ্বর সুরেশ।

দক্ষিণেশ্বর সুরেশ
শেষ আপডেট: 9 February 2026 11:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডেভিস কাপ (Davis Cup) এমনই এক মঞ্চ, যেখানে র্যাঙ্কিং, খ্যাতি, প্রতিভা সবই লেখা থাকে কাগজে, আর আসল চরিত্র ধরা পড়ে কোর্টে। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে দ্বৈরথে (World Group I tie) এই সত্য আরও একবার প্রমাণিত হল। আগাগোড়া কঠিন এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানে জিতে নিল ভারত। আর এই জয়ের কেন্দ্রে একটাই নাম—দক্ষিণেশ্বর সুরেশ (Dhakshineswar Suresh)। তিনটি ম্যাচ খেললেন, তিনটিতেই জয়। দু’টি সিঙ্গলস, একটি ডাবলস। এক কথায়, ‘ট্রিপল-হল’!
কেন এই নজির 'বিরল'?
দক্ষিণেশ্বরের এই পারফরম্যান্স ডেভিস কাপ ইতিহাসে বিরল। নিজের মাত্র দ্বিতীয় ডেভিস কাপ টাই খেলতে নেমে এহেন কীর্তি ভারতীয় টেনিসে হাতেগোনা কয়েকজনই দেখাতে পেরেছেন। শেষবার এমন নজির স্থাপন করেন লিয়েন্ডার পেজ (Leander Paes)—২০০৪ সালে জাপানের বিরুদ্ধে। দুই দশকের বেশি সময় পর সেই তালিকায় ঢুকে পড়লেন ২৫ বছর বয়সি তরুণ প্রতিভা।
ডাবলসে ইউকি ভাম্বরির (Yuki Bhambri) সঙ্গে জুটি বেঁধে ডেভিড পেল–স্যান্ডার অ্যারেন্ডস জুটিকে তিন ঘণ্টার ম্যারাথনে হারিয়ে দেন দক্ষিণেশ্বর। স্কোরলাইন ৭–৬(০), ৩–৬, ৭–৬(১)। যা ভারতের হাতে ২–১ লিড তুলে দেয়। সেখান থেকেই গল্পটা ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে নামে নেদারল্যান্ডসের দিকে।
নির্ণায়ক ম্যাচে স্নায়ুর পরীক্ষা
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল শেষ রাবারে। হিসেব তখন ২–২। ভারতের ভরসা তিনি একাই—দক্ষিণেশ্বর সুরেশ। প্রতিপক্ষ গাই ডে ওউডেন (Guy de Ouden)। এর আগে ডাবলসে প্রায় তিন ঘণ্টা কোর্টে কাটানোর পর ক্লান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না সুরেশের চোখেমুখে কিংবা পারফরম্যান্সে। সার্ভ, ফ্ল্যাট গ্রাউন্ডস্ট্রোক আর চাপের মুখে ঠান্ডা মাথা—এই তিন অস্ত্রেই ম্যাচটা নিজের করে নেন তিনি। ৬–৪, ৭–৬(৪) স্কোরলাইনে জয়। শেষ পয়েন্টের পর কোর্টে শুয়ে পড়া শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, সেটা ছিল এক ধরনের মুক্তি—নিজের জায়গা নিশ্চিত করার মুহূর্ত।
কে এই দক্ষিণেশ্বর সুরেশ?
তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের ছেলে দক্ষিণেশ্বর সুরেশ আদতে ভারতীয় টেনিসের চেনা ‘টেমপ্লেটে’র বাইরের মুখ। ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চির ডানহাতি খেলোয়াড় পুরোপুরি আধুনিক পাওয়ার বেসলাইনার। বড় সার্ভ, ভারী ফোরহ্যান্ড আর পয়েন্ট নিজের হাতে নেওয়ার মানসিকতা—সব মিলিয়ে তিনি আলাদা। বেড়ে উঠেছেন মূলত আমেরিকার কলেজ টেনিস সিস্টেমে। জর্জিয়া গুইনেট কলেজে (Georgia Gwinnett College) হাতপাকানো শুরু, তারপর ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটি (Wake Forest University)। এই কলেজ সার্কিটই তাঁকে চাপ সামলাতে শিখিয়েছে—যার ছাপ স্পষ্ট ডেভিস কাপে।
র্যাঙ্কিংয়ের দিক থেকে ঢাক্ষিণেশ্বর এখনও শীর্ষে নন। বিশ্ব র্যাঙ্কিং প্রায় ৪৬৫-এর আশপাশে। কিন্তু ডেভিস কাপ দেখাল, বড় মঞ্চে কে কোথায় দাঁড়িয়ে সেটা মুখ্য বিষয় নয়, মানসিকতা আর ম্যাচ-টেম্পারামেন্টই আসল।
ভারতের জন্য সুখবর
এই জয়ে ভারত পৌঁছে গেল কোয়ালিফায়ার্স রাউন্ড ২-এ (Qualifiers Round 2)। ২০১৯ সালে ডেভিস কাপের নতুন ফরম্যাট চালু হওয়ার পর এই প্রথমবার। তার চেয়েও বড় কথা, হাতে এল এক নতুন ভরসার মুখ। সুইজারল্যান্ডকে তাদের মাঠে হারানোর পর নেদারল্যান্ডস—পরপর ইউরোপীয় দলকে পরাস্ত করা নিছক ভাগ্যের জোরে সম্ভব নয়। এই জয় দেখাল, ভারতীয় টেনিসে আবার গভীরতা তৈরি হচ্ছে। যার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে দক্ষিণেশ্বর সুরেশ। সপ্তাহান্তে তিনি শুধু ম্যাচ জেতেননি। নিজের পরিচয় লিখে দিয়েছেন। ভারতীয় টেনিস মানচিত্রে নতুন করে দাগ কেটেছেন। এখন দেখার, এই দাগ কতটা স্থায়ী হয়।