‘ক্লাসিকাল’, ‘রাপিড’, ‘ব্লিৎজ’—এই সমস্ত শব্দ আকছার ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে। অনেকেই জানেন না বিভিন্ন ধাঁচের দাবাখেলার সূক্ষ্ম ফারাক।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 13 July 2025 11:14
দিনটা ছিল ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০০।
তেহরানের হাড়কাঁপানো শীতে টেবিলের একপ্রান্তে বসে মিখাইল তালের শিষ্য আলেক্সি শিরভ। অন্য প্রান্তে এশিয়ার প্রথম গ্রান্ডমাস্টার, মাদ্রাজের ভূমিপুত্র বিশ্বনাথন আনন্দ। ম্যাচের শুরুটা যদিও করেছিলেন আন্ডারডগ হিসেবে, তবু দিনের শেষে বেরিয়ে এলেন ফিড ওয়ার্ল্ড চেস চ্যাম্পিয়নশিপে (FIDE World Chess Championship) বিশ্বসেরার খেতাব হাতে। দুনিয়া চিনেছিল এমন এক দাবাড়ুকে, যিনি একা হাতে দাবাকে একটা দেশে শুধু যে জনপ্রিয় করেছেন তাই নয়, একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখিয়েছেন গুকেশ, প্রজ্ঞানন্দা, নিহাল সারিন, ভিদিথ গুজরাতির মতো একঝাঁক তরুণকে।
ইদানীং দাবাকে ঘিরে যে জনপ্রিয়তা বেশ তুঙ্গে উঠেছে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকেই ভারতের এই তরুণ ব্রিগেডের আন্তর্জাতিক দাবায় অভাবনীয় সাফল্যের অনুষঙ্গ টেনেআনছেন। বিশেষত নরওয়ে ও জাগ্রেবে ডি গুকেশের ম্যাগনস কার্লসেনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সাফল্য ক্রিকেটীয় আফিমে আছন্ন ভারতীয়দের মধ্যে যে বেশ খানিকটা হজুগে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে এতে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই!
মোটামুটিভাবে গুটির চালগুলির বিষয়ে খানিকটা সড়গড় থাকলেও পেশাগত দাবার জগতের বিভিন্ন ফরম্যাটের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা নিয়ে ওয়াকিবহাল নন অনেকেই। সোশাল মিডিয়ার দৌলতে ‘ক্লাসিকাল’, ‘রাপিড’, ‘ব্লিৎজ’—এই সমস্ত শব্দ আকছার ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে। অনেকেই জানেন না বিভিন্ন ধাঁচের দাবাখেলার সূক্ষ্ম ফারাক। কেন কিছু খেলোয়াড় একটি নির্দিষ্ট ফর্ম্যাটে তুখোড় হলেও অন্য ফর্ম্যাটে মুখ থুবড়ে পড়েন, তার কারণ বুঝতে গিয়ে অনেক শিক্ষানবিশ দাবাপ্রেমী বেশ ফাঁপড়ে পড়েন। দাবার সূক্ষতা ও জটিলতার স্বাদ পূর্ণরূপে পেতে তাই যেমন জরুরি চালগুলির নিয়ম জানা, ঠিক ততটাই দরকার দাবার বিভিন্ন ফর্ম্যাটের বৈশিষ্টগুলি সম্পর্কে একটা মোটামুটি আন্দাজ।
আন্তর্জাতিক দাবার নিয়ামক সংস্থা ‘ফিডে’র হ্যান্ডবুক অনুযায়ী প্রধানত তিনটি ধাঁচে আন্তর্জাতিক দাবার যাবতীয় প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে: ক্লাসিক্যাল, রাপিড এবং ব্লিৎজ।
ক্লাসিক্যাল ফর্ম্যাটে সময়ের সেরকম বালাই নেই বললেই চলে। যদিও একটি ম্যাচ শেষ করার সর্বোচ্চ সময়সীমা ১০ ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখানে প্রতিটি চালের পেছনে থাকে প্রতিযোগীদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, গভীর বিশ্লেষণ এবং কৌশলগত অন্তর্দৃষ্টি।
র্যাপিড ফর্ম্যাটে একজন প্রতিযোগীর সমস্ত চাল শেষ করার ন্যূনতম সময়সীমা ১০ মিনিট এবং সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট। সময়ের গণ্ডি যেহেতু সীমিত, তাই প্রতিযোগীর স্মৃতিশক্তি ও দ্রুত কালকুলেশন করার ক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই অপরিহার্য তার পজিশনাল ইন্টুইশন।
ক্রিকেটের পরিভাষায় ক্লাসিক্যাল আর রাপিড যদি হয় টেস্ট এবং ওয়ান ডে ম্যাচ, তালে ব্লিৎজ-কে নিসন্দেহে দাবার টি-২০ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। অন্যভাবে বললে, ব্লিৎজ হল র্যাপিডেরই ঈষৎ দ্রুতলয়ের সংস্করণ। এই ফর্ম্যাটে প্রতিযোগীর সমস্ত চাল শেষ করার ন্যূনতম সময় ৩ মিনিট ও সর্বোচ্চ ১০ মিনিট। পাশাপাশি রয়েছে সংযুক্ত সময়ের (Time Increment) সুবিধা। ঘড়ির কাঁটা যেহেতু শুরু থেকেই ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে, তাই এই ফর্ম্যাটে ম্যাচ জিততে বুদ্ধির গোড়ায় শান দিলেই চলে না, একইসাথে চাই ইস্পাতকঠিন স্নায়ু এবং দাবার শত শত প্যাটার্নের পারমুটেশন-কম্বিনেশনকে মুহূর্তে শনাক্ত করার মতো ইগলের চোখ!
আন্তর্জাতিকভাবে র্যাপিড ফর্ম্যাটে প্রথম খেলা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে এবং ব্লিৎজে প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয় ২০০৬ সালে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে ফিডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাপিড ও ব্লিৎজ একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পেশাগত পরিসরে মূলত এই তিনটি ফর্ম্যাট মান্যতা পেলেও বেসরকারিভাবে, বিশেষত, ভার্চুয়াল জগতে দাবার বিভিন্ন ধাঁচা, যেমন: বুলেট (সময়সীমা সর্বমোট ৩ মিনিট), ফিশার রান্ডমের (শক্তিশালী ঘুটিগুলি ম্যাচের শুরুতেই এলোমেলোভাবে সাজানো থাকে যাতে কোনও প্রতিযোগী পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে খেলা না শুরু করতে পারে) মতো ফ্রিস্টাইল আয়োজনও সমানভাবে জনপ্রিয়।
আসলে দিনের শেষে ফর্ম্যাট নিয়ে এত পরীক্ষানিরীক্ষার উদ্দেশ্য একটাই: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাবাকে নতুন নতুন আঙ্গিকে মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।