‘‘ভারত স্বাধীন করতে সেদিন পরেছিলাম ফাঁসি, মায়ের ভাষা বলছি বলে আজকে বাংলাদেশি?’’
নাড়িয়ে দিল বহু হৃদয়। লাল-হলুদ জার্সির ভিতর থেকে ফুটে উঠল মাটি, মা আর মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালবাসা।

ছবি- রণদীপ দে
শেষ আপডেট: 6 August 2025 22:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুধু ফুটবল নয়, গ্যালারিও যেন হয়ে উঠল প্রতিবাদের মঞ্চ। মায়ের ভাষা নিয়ে অপমান, নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন লাল-হলুদ সমর্থকরা।
গ্যালারি মানেই তো কেবল গোল হলে হাততালি নয়, যুগ যুগ ধরে এ মঞ্চে হাঁটছে আবেগ, কান্না, গর্ব আর প্রতিবাদ, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। বুধবার যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গল বনাম নামধারী এফসি-র ম্যাচেও তার অন্যথা হল না। তবে খেলার চেয়েও বড় হয়ে উঠল গ্যালারির ব্যানার।
সেই ব্যানারে লেখা, ‘‘ভারত স্বাধীন করতে সেদিন পরেছিলাম ফাঁসি, মায়ের ভাষা বলছি বলে আজকে বাংলাদেশি?’’ নাড়িয়ে দিল বহু হৃদয়। লাল-হলুদ জার্সির ভিতর থেকে ফুটে উঠল মাটি, মা আর মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালবাসা।
ইস্টবেঙ্গলের ফ্যান গ্রুপ ‘ইস্টবেঙ্গল আলট্রাস’ সেই ব্যানার পোস্ট করে লিখেছে, “এ ভাষা রবীন্দ্রনাথের, সুভাষচন্দ্রের, বিদ্যাসাগরের। কিন্তু আজ সেই ভাষা বললেই বাংলাদেশি তকমা! অত্যাচার, অপমান আর কত সহ্য করব?”
শুধু পোস্ট নয়, তাদের সেই বার্তা আরও জোরালো করে তুলেছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি। মুম্বইয়ে বাংলা বলার ‘অপরাধে’ মুর্শিদাবাদের শামিম শেখকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। তারপর শারীরিক নিগ্রহ, অপমান। ইসলামপুরের সাব্বিরের তো আরও করুণ পরিণতি, বাংলায় কথা বলায় পা ভেঙে দেয় দুষ্কৃতীরা। ভিনরাজ্য থেকে পালিয়ে আসছেন অনেকে, ফিরে আসছেন নিজের ঘরে অপমানের বোঝা বয়ে।
গ্যালারি দেখেছে ভুভুজোলার আওয়াজ, মেক্সিকান ওয়েভের উত্তাল ঢেউ। কিন্তু একইসঙ্গে রাজনৈতিক বার্তার আঁচও লেগেছে তার গায়ে এনআরসি নিয়ে হোক বা রসগোল্লা-যুদ্ধ। এবারও যুবভারতী ব্যতিক্রম নয়।
সল্টলেকের স্টেডিয়াম দেখাল এক অনন্য মুহূর্ত, মায়ের ভাষা, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব ও প্রতিবাদের সম্মিলিত উচ্চারণ, ইস্টবেঙ্গলের হাত ধরে।
একটা সময় ছিল, মোহনবাগানের খালি পায়ের শিল্ড জয় হয়ে উঠেছিল উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক। আজ, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা লড়ছেন এক ভিন্ন যুদ্ধে, বাংলা ভাষাকে 'বাংলাদেশি' বলে অপমান করার বিরুদ্ধে।
তাঁরা লিখেছেন, ‘‘আমরা হলাম যুদ্ধবাজ,
মাঠের বাইরেও করব রাজ
লড়াই করে দেখিয়ে দেব, বাঙালির স্পর্ধা আজ।’’
খেলা শেষে যখন মাঠ খালি হয়ে যায়, গ্যালারির আলো নিভে আসে, থেকে যায় কিছু প্রতিধ্বনি। এদিন যুবভারতী ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকেই বলছিলেন, ‘‘এ শুধু খেলা নয়, এক আবেগ, এক প্রতিবাদ, এক পরিচয়-রক্ষার লড়াই।’’
এই প্রতিবাদ হয়তো কোনও সরকারের কানে পৌঁছবে না এখনই। কিন্তু ইতিহাস তো গ্যালারির গর্জনও মনে রাখে। আজকের এই কণ্ঠস্বর হয়তো আগামী দিনের অহংকার হয়ে উঠবে, বাংলার ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার সনদ হয়ে।