এই কঠিন লড়াইয়ে হাল ছাড়তে নারাজ বহু যুদ্ধের সৈনিক। আগের পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। যে কারণে জীবনকে দেখার নজরও গেছে পালটে।

বিয়ন বর্গ
শেষ আপডেট: 18 September 2025 18:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি ছিলেন টেনিস কোর্টের বরফশীতল সম্রাট। যাঁকে একসময় ডাকা হত ‘আইস ম্যান’ নামে। র্যাকেট হাতে বোমারু সার্ভ হাঁকাতেন যখন, এতটুকু সাড়াশব্দ বেরত না, মুখের অঙ্গভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় ছিল না, কী ভীষণ পরিশ্রম আর ঘাম ঝরাতে হচ্ছে! আনকোরা দর্শক থেকে শিক্ষানবীশ খেলুড়ে—সব্বাই ভাবত, টেনিস নামক খেলাটা বুঝি তেমন শ্রমসাধ্য নয়।
সেই কিংবদন্তি বিয়ন বর্গ (Bjorn Borg) আজ জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি। ৬৯ বছরে দাঁড়িয়ে তিনি লড়ছেন ‘নিয়ত আগ্রাসী’ প্রোস্টেট ক্যানসারের (Prostate Cancer) বিরুদ্ধে। আত্মজীবনী ‘হার্টবিটস: আ মেমোয়ারে’র শেষ অধ্যায়ে সামনে আনেন এই খবর। জানান, কর্কটের থাবা এই মুহূর্তে ‘চূড়ান্ত স্টেজে’। কিন্তু হাল ছাড়ছেন না তিনি। মুষ্টিবদ্ধ ঘোষণা—‘প্রতিদিন লড়ব… ঠিক যেমন লড়েছি উইম্বলডনের ফাইনালে!’
২০২৪ সালে অস্ত্রোপচারের পর আপাতত রেমিশনে রয়েছেন। যখন ধরা পড়ল, তখন থেকে আজ অবধি শারীরিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানসিক ধক্কায় জেরবার তিনি। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্গ অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘ডাক্তার আমায় সোজাসুজি বলেছিলেন—অবস্থা খুবই খারাপ। ঘুমন্ত ক্যানসার সেল রয়েছে শরীরে, যেগুলো ভবিষ্যতে জেগে উঠবে। প্রতি ছয় মাসে পরীক্ষা করাতে হবে। দুই সপ্তাহ আগেই করালাম অন্তিম টেস্ট!’
সন্দেহ দেখা দেয় ২০২৩ সালে। তবে থেকে নিয়মিত চেকআপ করাতেন। কিন্তু সেবার লেভার কাপে (Laver Cup) দলের অধিনায়ক হিসেবে ভ্যাঙ্কুভারে যান। পরীক্ষার ফলোআপ করতে দেরি হয়ে যায়। পরে দেশে ফিরতেই ধরা পড়ে আসল বিপদ। বর্গের কথায়, ‘সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হল, শরীরে কোনও উপসর্গ বোঝা যায়নি। তখনও একেবারে স্বাভাবিক লাগছিল। হঠাৎ করেই সবকিছু পালটে গেল!’
যদিও এই কঠিন লড়াইয়ে হাল ছাড়তে নারাজ বহু যুদ্ধের সৈনিক। আগের পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। যে কারণে জীবনকে দেখার নজরও গেছে পালটে। বললেন, ‘আমি প্রতিদিনকে একেকটা দিন হিসেবে, একেকটা বছর হিসেবে নিই। আশা করি ঠিক থাকব!’
আসলে বিয়ন বর্গের জীবন মানেই তো রুদ্ধশ্বাস নাটক। কোর্টে শাসন করা, রেকর্ড তৈরি করা—তারপর আচমকা সব ছেড়ে দেওয়া। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যখন অন্যরা শীর্ষে উঠতে শুরু করছেন, তখনই আচমকা বিদায় ঘোষণা! অর্জনের তালিকা দীর্ঘ—১১টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম, টানা পাঁচটি উইম্বলডন, ছ’বার ফরাসি ওপেন। উইম্বলডনে টানা ৪১ ম্যাচ জেতার বিশ্বরেকর্ড। ১০৯ সপ্তাহ কাটিয়েছেন র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের এক নম্বরে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচ? অবশ্যই ১৯৮০ সালের উইম্বলডন ফাইনাল। যেখানে জন ম্যাকেনরোর (John McEnroe) সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টার মহারণে সাত–সাতটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট বাঁচিয়ে শেষমেশ ট্রফি ছিনিয়ে নেন বর্গ। স্মৃতি রোমন্থনে বলেন, ‘এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সন্তোষজনক ম্যাচ। সবকিছু মজুত ছিল সেখানে!’ তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ডাকা হত ‘ফায়ার অ্যান্ড আইস’ নামে। ম্যাকেনরো মানেই অগ্নিবলাকা, আর বর্গ যেন আক্ষরিক অর্থে শীতলবারি! পরের বছর অবশ্য সেই শৈত্য মুছে দেন ম্যাকেনরো। ১৯৮১ সালের উইম্বলডন ফাইনালে হারান বর্গকে, পরে ইউএস ওপেনের ফাইনালেও শেষ হাসি হাসেন তিনিই। হতাশা ভুলে যাওয়া সহজ ছিল না। যে কারণে অবসাদ থেকে ধীরে ধীরে খেলাটাই ছেড়ে দেন সুইডিশ তারকা!
কোর্টকে বিদায়ের পর জীবনের আরেক অধ্যায়ও পদে পদে কাঁটায় আস্তীর্ণ। আত্মজীবনীতে খোলাখুলি লিখেছেন—‘আমার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। আজকের মতো তখন গাইড করার মানুষও দেখিনি। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে আড়াল করার জন্য মাদক, ওষুধ, অ্যালকোহল—সবকিছুর আশ্রয় নিই। অথচ জানতাম এগুলো আমাকে ধ্বংস করছে!’ ১৯৮৯ সালে মিলানে ওভারডোজের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা বর্গকে ভেতর থেকে বদলে দেয়!
১৯৯১ থেকে ১৯৯৩। আবার টেনিসে ফেরার চেষ্টা। কিন্তু একটিও ম্যাচ জিততে পারেননি। তবুও অসন্তুষ্টি নেই। খোলাখুলি স্বীকার করেন, ‘আমি বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হই। শেষে জীবনটা গুছিয়ে নিয়েছি। আজ আমি নিজেকে নিয়ে খুশি।’
বর্গ এখন জীবনকে নতুন করে দেখছেন। আর ফিরে যাচ্ছেন সীমাহীন সাফল্যের আলোয়। ছোটবেলায় বাবার টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে পাওয়া র্যাকেট দিয়েই প্রথম অনুশীলন। এতটাই ভারী ছিল যে, এক হাতে বাগে আনা যেত না। অসুবিধাকে সুবিধা করার এক্সপেরিমেন্ট থেকেই তৈরি হয় তাঁর অনন্য ‘ডাবল-হ্যান্ডেড ব্যাকহ্যান্ড’। যা একদিন বিশ্বটেনিসের ব্যাকরণ পাল্টে দেয়।
আজ তিনি দাঁড়িয়ে আরেক চূড়ান্ত ফাইনালের সামনে। প্রতিপক্ষ মরণব্যাধি। অস্ত্রোপচারের পরও প্রতি মুহূর্তে থেকে যাচ্ছে অজানা শঙ্কা। তবু বর্গের মুখে পালটা চ্যালেঞ্জ। ম্যাচ পয়েন্ট জিতেও বিগতস্পৃহ থাকতেন যিনি, তিনি একইভাবে সান্দ্র-শীতল কণ্ঠে বলে দেন: ‘প্রতিটি দিনকে আমি উইম্বলডনের ফাইনাল মনে করি। লড়ব… লড়াই চালিয়ে যাব!’