“তখন কেউ জানত না আমরা কী করেছি। আজ দেশ জানে, গর্ব করে। এতেই সব পরিশ্রম সার্থক,” বলেন সুধা শাহ।

২০০৫ সাল, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল - কোচ সুধা শাহ
শেষ আপডেট: 8 November 2025 21:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র একটা জয়ই বদলে দিতে পারে কুড়ি বছরের ইতিহাস। ২০০৫ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে (Women’s World Cup 2025) পরাজয়, যা এক প্রজন্মের লড়াইকে ছায়ায় ঢেকে দিয়েছিল। সেই সময়ের ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের কোচ ছিলেন সুধা শাহ (India Women’s Cricket Team coach Sudha Shah), আজও মনে রেখেছেন নিঃশব্দেই বাড়ি ফিরেছিলেন সেদিন।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েবসাইট abc.net.au-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ফাইনাল খেলছিলাম, তখন ভারতে কেউ জানতই না যে মহিলাদের বিশ্বকাপ হচ্ছে!”
সেই ম্যাচে সেন্টুরিয়নে ভারত হেরেছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৯৮ রানে। অথচ দলের প্রস্তুতি ছিল অসাধারণ। “আমার মেয়েরা দু'বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছে। ফর্মেও ছিল সবাই। কিন্তু ফাইনালে হেরে সব মাটিতে মিশে গেল,” বলেন সুধা।
সেই পরাজয়ের পর যা ঘটেছিল, তা যেন সিনেমার কোনও বিষণ্ণ দৃশ্য। “ফাইনালে হারার পর মুম্বই বিমানবন্দরে নামলাম। কেউ আসেনি, কেউ চিনলও না। চুপচাপ একটা অটো ধরে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম।” আজকের গৌরবময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সেই দিনটা ফিরে দেখলে, সেই সময়ের নিঃসঙ্গতা আরও যেন তীব্র হয়ে ওঠে সুধার চোখে।
কিন্তু ইতিহাস বদলে দিয়েছে জেমিমা রদ্রিগেজ আর হরমনপ্রীত কৌরের দল। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ভারতের মেয়েরা যে বিশ্বজয় করেছে, সেই জয়ের আনন্দে আজও ভিজে চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে একসময়ের ভারতীয় দলের কোচ সুধা শাহের। “এখন অসংখ্য মেয়ে ক্রিকেট খেলতে আসছে। সুযোগও অনেক বেড়েছে। ভাল সুবিধা, ভালো পারিশ্রমিক, আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রাপ্য সম্মান রয়েছে,” তিনি বলেন।
তখন যেখানে চারজন, এখন সেখানে সতেরোজন
সময় বদলেছে, পরিকাঠামোও পাল্টেছে। ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে প্রায় ৪০ হাজার দর্শক উপভোগ করেছেন ফাইনাল, মাঠে ছিল ১৭ জন সাপোর্ট স্টাফের দল। “আমাদের সময় ছিল মাত্র চারজন - কোচ, ম্যানেজার, ফিজিও আর ট্রেনার। এখনকার ক্রিকেটাররা শুধু খেলায় মন দিতে পারে, আর সেটা ফলেও দেখা যাচ্ছে,” বলেন সুধা।
২০১৭-ই ছিল মোড় ঘোরানো বছর
ABC–র প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৭ সালের লর্ডসের ফাইনালই ছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট। সেবারও হার হয়েছিল, কিন্তু হরমনপ্রীত কৌরের ১৭১ রানের ইনিংস বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
এরপর থেকে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে ভারতে মহিলাদের ক্রিকেটের অবস্থান। আজ সেই পথ এসে মিশেছে বিশ্বকাপের জয়ে।
ভারতের জয় পৌঁছে গেছে সীমান্ত পেরিয়ে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম France 24–এর ইংরেজি শোতেও উঠে এসেছে এই জয়। এক সঞ্চালক বলেছেন, “অবিশ্বাস্য! জানতামই না। ভারতীয় ক্রীড়া সংবাদপত্রে আজ উৎসব ‘ঐতিহাসিক’, ‘স্বপ্নপূরণ’, ‘যোগ্য জয়’ - এইসব শিরোনামে উঠে এসেছে সামনে।”
The New York Times লিখেছে, “যেখানে পুরুষ ক্রিকেটারদের ঈশ্বরতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়, সেখানে নারীরা এখন নিজেদের ইতিহাস লিখছে। ৪০ বছর আগে পুরুষ দল যে কাপ জিতেছিল, আজ সেই স্বপ্নপূরণ করল মেয়েরা।”
একটি জয়, যা বদলে দিল দৃষ্টিভঙ্গি
২০০৫ সালে অটোয় চেপে চুপচাপ বাড়ি ফেরা সেই কোচ আজ দেখতে পাচ্ছেন এক যুগের পরিবর্তন। হাজারো দর্শকের করতালির মাঝে, টেলিভিশনের পর্দায়, প্রতিটি ভারতীয়র হৃদয়ে আজ সেই জয় বাজছে নতুন সুরে।
“তখন কেউ জানত না আমরা কী করেছি। আজ দেশ জানে, গর্ব করে। এতেই সব পরিশ্রম সার্থক,” বলেন সুধা শাহ।