যিনি ২০ বছর ধরে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে মাঠ কেটেছেন, অথচ কখনও জাতীয় সঙ্গীতের তালে মাঠে নামেননি, সেই মানুষটাই আজ দেশের গর্বের কারিগর।

অমল মজুমদার
শেষ আপডেট: 3 November 2025 18:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাত গড়িয়েছে অনেকটা। ঘড়িতে ১২টা বাজতেই ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম (DY Patil Stadium) গর্জে উঠল। ক্যাচ ধরলেন হারমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)। সাদা বল তাঁর মুঠোয় আসতেই শেষ হল অর্ধশতকের অপেক্ষা। ভারত জিতল মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ (Women’s ODI World Cup 2025)। ইতিহাস লেখা হল নতুন করে। আর সেই মুহূর্তেই দেখা গেল এক আবেগঘন দৃশ্য—হারমন দৌড়ে গিয়ে মাথা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন কোচ অমল মুজুমদারকে (Amol Muzumdar)। তারপর আলিঙ্গন। বোঝা গেল, ভারতের এই জয়ের আড়ালে লুকিয়ে এক সেনাপতির নীরব ছোঁয়া।
অমল মুজুমদার—নামটা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন। ১১,১৬৭ রান (11,167 runs) করেছেন ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে। কিন্তু একবারও ভারতের হয়ে খেলার সুযোগ জোটেনি। মুম্বই রঞ্জি দলের অধিনায়ক, অনূর্ধ্ব-১৯ টিমে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (Sourav Ganguly), রাহুল দ্রাবিড়দের (Rahul Dravid) সতীর্থ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকেই করেছিলেন ২৬০ রান—রেকর্ড এখনও টিকে! অথচ জাতীয় দলে ডাক এল না কোনওদিন। হয়তো ভাগ্যের হিসেবখাতায় কিছু বাকি রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সে গড়মিল মিলিয়ে দিল এবার—মেয়েদের দলের কোচ হয়ে বিশ্বকাপ ছুঁলেন অমল।
২০২৩ সালের অক্টোবর। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট তখন দিকভ্রষ্ট। পাঁচ বছরে তিনবার কোচ বদল—রমেশ পওয়ার (Ramesh Powar), ডব্লিউভি রমন (WV Raman), আবার পওয়ার। দল ভুগছে বিভাজনে, অনাস্থায়, শৃঙ্খলার অভাবে। ঠিক তখনই দায়িত্ব নেন অমল মুজুমদার। মুম্বইয়ের সেই ‘অলরাউন্ড শিক্ষক’মাঠে ফিরলেন নতুন উদ্যমে—হারমন–স্মৃতিদের হাল ফেরানোর লক্ষ্যে। কিন্তু বড় টার্গেট একটাই: ২০২৫ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ।
প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু—গোড়ায় বিশ্বাস ফেরানো। নিজের কেরিয়ারে যে ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছেন, তাকেই বানালেন প্রেরণা। মেয়েদের বললেন, ‘তোমরা আমার মতো হারিয়ে যেও না। তোমাদের কণ্ঠ কেউ যেন দমাতে না পারে।’তাঁর কোচিং ফর্মুলা একেবারে সোজাসাপ্টা—প্রশংসা যেমন নিবিড়, তিরস্কারও তেমনই তীব্র।
ইন্দোরে ইংল্যান্ডের (England) কাছে চার রানে হারের পর ড্রেসিংরুমে অমল নাকি বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি নিজেদের বিশ্বাস না করো, কেউ তোমাদের বিশ্বাস করবে না!’ ঠিক সেই ম্যাচের পরই বদলে যায় দল। হারমন, স্মৃতি মান্ধানা (Smriti Mandhana), জেমাইমা রদ্রিগেজ (Jemimah Rodrigues), দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma)—সবাই মিলে তৈরি করলেন নতুন অধ্যায়। প্রথমে নিউজিল্যান্ডকে (New Zealand) হারানো, তারপর অস্ট্রেলিয়ার (Australia) বিপক্ষে রেকর্ড রানচেজ, আর শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে ৫২ রানের ঐতিহাসিক সাফল্য!
অমল সবসময় বলেছেন, ‘কোচ হিসেবে আমার কাজ মেয়েদের “শেখানো”নয়, তাদের “বিশ্বাস করানো”, যে তারা বিশ্বসেরা।’তাঁর এই দর্শনেই বদলে গেল দলের মনোভাব। ড্রেসিংরুমে নিষেধ অহেতুক জাঁকজমকে, কিন্তু বাধ্যতামূলক সম্মান ও সততা। তিনি জানেন, ভারতের মহিলা ক্রিকেটের আসল চ্যালেঞ্জ স্কিল নয়, মনস্তত্ত্ব। তাই প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে আলাদা সময় কাটাতেন, কথা বলতেন, মানসিক চাপ কমানোর জন্য আয়োজন করতেন ইনডোর সেশন। এমনকি, হারমনপ্রীতকেও মাঝে মাঝে বলতেন, ‘তুমি এখন অধিনায়ক নও, শুধু খেলোয়াড়।’চাপ মুক্ত রাখা, আনন্দে খেলা—এই দর্শনেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতের জন্ম।
অমলের জীবনে এই জয় যেন এক নীরব পুনর্জন্ম। যিনি ২০ বছর ধরে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে মাঠ কেটেছেন, অথচ কখনও জাতীয় সঙ্গীতের তালে মাঠে নামেননি, সেই মানুষটাই আজ দেশের গর্বের কারিগর। ৫১ বছর বয়সে হাতে নিলেন বিশ্বকাপ। হরমনপ্রীতের চোখে জল, মুখে হাসি, আর কোচের পা ছুঁয়ে প্রণাম—এই তিনটি ছবিই বলে দেয়, মেয়েদের সোনালি অধ্যায়ের নিভৃর লেখক কে! এই জয় তাই কেবল ভারতের নয়… এক ক্রিকেটারের প্রতিশোধ—নীরব, সুশৃঙ্খল কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী।