Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

Women's WC Final: রাজপুত্র নেই, এ রূপকথার সক্কলে রাজকন্যে!

‘রাজপুত্র নেই, এ রূপকথার সক্কলে রাজকন্যে’—এবার থেকে গল্প বলা হয়তো এভাবেই শুরু হবে!

Women's WC Final: রাজপুত্র নেই, এ রূপকথার সক্কলে রাজকন্যে!

ছবি: গুগল

রূপক মিশ্র

শেষ আপডেট: 3 November 2025 11:22

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজকুমার গেল খোক্কসপুরে। দুর্দান্ত রাক্ষসকে শায়েস্তা করতে। দেখল শায়িত রাজকন্যে। ঘুমন্ত। প্রায় অচেতন। ঠেকাল জিয়নকাঠি। ঝুঁকি নিয়ে। নিয়ম মেনে৷ জেগে উঠল সে! তারপর ভীষণ লড়াই। দুরন্ত যুদ্ধ। শেষমেশ দনুজদলন। খোক্কসপুরী থেকে ঘরের মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে আনা! বুক চিতিয়ে, কলার তুলে!

রূপকথায় রাজপুত্রই সর্বনিয়ন্তা। বিপত্তারক। রাজকন্যে নিষ্ক্রিয়। সুপ্তোত্থিতা। তাদের জাগিয়ে তুলতে হয়। জাগিয়ে তোলে যে, সে পায় রাজত্বের ভাগ। সঙ্গে রাজার মেয়ের নিঃশর্ত অধিকার!

কাল ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে নয়া রূপকথা (নাকি অপরূপকথা?) লিখলেন লিখলেন হরমনপ্রীত, স্মৃতি, রিচারা। ১৯৭৮ সাল থেকে যে জার্নির সূচনা, জেনারেল ক্লাসে ঘাড় গুঁজে, ঠেসাঠেসি করে খেলতে যাওয়া থেকে শুরু করে একদা বোর্ড চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসনের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি, ‘আইসিসি বলেছে তাই, আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে মেয়েদের ক্রিকেটই উঠিয়ে দিতাম’ বলা, কিংবা সামনের বছর ছেলেদের বিশ্বকাপ স্টেডিয়াম বড়সড় স্টেডিয়ামে বসানোর তাড়না থেকে নিয়মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে তুলনায় ছোটখাটো মাঠে গতকাল ফাইনালের আয়োজন—সবের আগল ভাঙার জুনুনই কি হরমনকে প্রাণিত করল শেষ ক্যাচ ধরে ওভাবে দুরন্ত গতিতে ছুটে যেতে? হুইলচেয়ারে বসেও ময়দানে নেমে এলেন প্রতীকা রাওয়াল? অঞ্জুম চোপড়াও ধোপদুরস্ত স্যুটের গরিমা ভুলে জড়িয়ে ধরলেন বীরাঙ্গনাদের?

এ রূপকথায় সত্যি কোনও রাজপুত্র নেই। জিয়নকাঠি মেলে ধরেছে রাজকন্যেরাই। একেকজন একেক রূপ—ইস্পাত, রেশম, আগুন, মাটির তুলনা। হরমনপ্রীত কৌর—চোখে আগুন, বুকে বরফ। জয় হাতে আসতেই দৌড়… সেটা কেবল ম্যাচ জেতার উন্মাদনা নয়; প্রতীক যুগ বদলেরও। মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি ‘উপমান’ আর ‘উপমেয়ে’র ফারাক ভেঙে দিলেন। চোস্ত পাঞ্জাবি গান সাউন্ডবক্সে চালিয়ে হাতাকাটা টিশার্ট গায়ে গলিয়ে মাথা নাড়াতে নাড়াতে নিঝুম, জনহীন মাঠে ছাড়ছেন যখন, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে শোভা পেতে পারে একটাই কাট আউট: ‘আমরা কারও মতো নই, আমরা আমাদের মতো!’

কী করে ভুলি স্মৃতি মন্ধানার স্ট্রোকপ্লে? যার ছন্দ বুঝিয়ে দেয়, কেমন করে গতি আর সৌন্দর্য একসঙ্গে, হাত ধরাধরি করে চলে। কিংবা শেফালি বর্মা, রিচা ঘোষ! ‘চাপ’ শব্দটাই যাদের অভিধানে নেই। আছে ‘হিসেব’—কত ওভার বাকি, ফিল্ডার কই, কোথা দিয়ে বলটা পালাবে, কেন সেঞ্চুরি হল না-র একঝাঁক প্রশ্ন!

অমনজ্যোত কৌরের গল্পে কাঠচেরাইয়ের গন্ধ। বাবা রাতজেগে বানিয়ে দিলেন প্রথম ব্যাট। মেয়ের ১৯ বছর বাদে ব্যাকলিফ্টে উঠে ছক্কা হাঁকাল! রেনুকার দৌড়ে গিরিপথের সর্পিল বাঁক—ঠান্ডা বাতাস, লাবডুব লাবডুব, দূরে শাল–দেওদারের উদাসী বিকেল। রাধা যাদবের রাউন্ড-দ্য-উইকেট বোলিং—দুধ–সবজি বেচা থেকে যে শৃঙ্খলা শেখা, সেটাই ফাইনালে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে শেখাল! জেমাইমা রদ্রিগেস—দলের অন্দরে একমুঠো টাটকা আলো। গান গায়, রিল বানায়, আবার ব্যাট হাতে মারে নিখুঁত কভার ড্রাইভ—একই মেয়ের কী বিচিত্র রং! স্নেহ রানা—অবসরে আঁকিবুঁকি, তারপর বল হাতে মুছে ফেলে ক্যানভাসের সমস্ত দ্বিধা। উমা ছেত্রী—ময়দানে দাঁড়িয়ে কি শোনে কাঁসরের ঘণ্টা? গ্রামে যে ভজন গায় সে! উইকেটের পেছনে টেম্পো ধরে রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করে চলে।

এই যে একটি একটি করে চরিত্র—এরা কেবল খুঁটি নয়… স্থাপত্যের গাঁথুনি। তাই গতকাল জয়ের রজনী হলেও, নিছক উদযাপন নয়… আসলে এক গড়ে তোলার রাত। যা শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে—খটখটে শুকনো পিচে সাদা বল, স্কুল মাঠে গরম দুপুর, কোচের কড়া কথা, বাড়ির একবেলার কম রান্না দিয়ে! স্খলনস্বীকারে দোষ নেই, তাই বলতেই হয়—এমন একটা দলের মেরুদণ্ড নেই বলে ভেবে ভুলেছিলাম আমরা। সেই তেজ, সেই খিদে, সেই সংগ্রাম ছিল, আছে, থাকবে—কেবল আলোটা একটু দূরে ছিল।

আসলে জেতার বাইরেও লড়াই আছে—ভাষার, টাকার, সময়ের। ভাষা বদল শুরু হয়েছে—‘মেয়েদের খেলা’ শব্দটা আপাতত দরজার বাইরে। এখন শুধুই ‘ক্রিকেট’। টাকার ‘ইনক্রিমেন্টাল’বদল, কিন্তু আজকের রাতটা স্পন্সরের টেবিলে ধাক্কা। সময়ের লড়াইটাই সবচেয়ে কঠিন—প্রাইম-টাইমে জায়গা পাওয়া, বারোয়ারি ময়দানের প্র্যাকটিসে বুট পায়ে ট্রেনিংয়ের সময় জোগাড়, ট্র্যাফিক–কোচিং–এক্সাম—সব ঠেলে অনুশীলনের ঘড়িটা ঠিক রাখা। এসবের জট খুললেই মনের জট খোলে। গতরাতের খেতাব এই গিঁট কিছুটা হলেও আলগা করবে।

উইমেনস প্রিমিয়ার লিগ এই পটপরিবর্তনের সূচক। ড্রেসিং রুমে বিদেশি কোচিং, বিশ্লেষক, জিপিএস ভেস্ট, স্কাউটিং—সব মিলিয়ে স্তরবদল । স্মৃতির গেমিং-ইনস্টিংক্ট, ডিপ্লয়মেন্টে কাজে লাগছে। দীপ্তির নিখুঁত ক্যালকুলেশন—ওভার-পরিকল্পনায়। রিচার সাহসী পদক্ষেপ—শেষ ওভারে ‘রিস্ক’–‘রিওয়ার্ড’ গ্রাফের নতুন গণিত। ভুলব না জেমাইমার ‘রিল’–কালচারও! বাইরে কে কী ভাবলো সেটা বাদ দিয়ে, ভিতরে মন হালকা করার সাইকোলজি। মাঠের পরিশ্রম বাইরের দুনিয়াকে বদলে দিচ্ছে… আবার বাইরের জীবন থেকে মাঠে ঢুকেছে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’–বোধ। এই অদ্ভুত মিশ্রণই দলকে পরিণত ও আধুনিক করে তুলেছে।

এখন প্রশ্ন—পরবর্তী গন্তব্য কোথায়? প্রথমেই দরকার মাইক্রো লেভেলে জেলাস্তরে টার্ফ–পিচ। ছোট টার্গেট: প্রতি জেলায় অন্তত দু’টি করে মেয়েদের অ্যাকাডেমি বানানো, সপ্তাহে চারদিন কোচিং, বছরে ৪০ ম্যাচ।

দুই, স্কুল–বোর্ডে ‘ডাবল পিরিয়ড’ বাধ্যতামূলক—একদিন খেলা, পরদিন ম্যাচ–সিমুলেশন। ট্রেনিং সেন্টারে মেয়েদের জন্য আলাদা কিট, ‘কোন’–‘স্টাম্প’–‘বোলিং মেশিন’ ভাগাভাগি নয়।

তিন, সম্প্রচারে অভ্যেস বদল—প্রি–ম্যাচ শোতে নারীবিশেষজ্ঞ, হাফটাইমে ট্যাকটিকাল বোর্ড, ডেটা–স্ক্রিন চাই। ‘কিউট প্যাকেজ’ নয়, দরকার ‘কোর ক্রিকেট’।

চার, লিগাল–নিয়মে মাতৃত্বকালীন সাপোর্ট—রিটেইনার, ট্রাভেল–সাপোর্ট, রিহ্যাব—চুক্তিতে আমূল পরিবর্তন জরুরি।

এই বদল আনার গল্পে মিডিয়ার কাজটা কঠিন, কিন্তু তাদের ভূমিকা আরও জোরদার হওয়া দরকার। ‘মেয়েদের খেল’ বলে ছাড়লেই চলবে না। ভেতরের জটিলতা বুঝে বলতে হবে। কেন শ্রী চরণী মাঝের ওভারে স্লোয়ার–টস–স্পিড ভ্যারিয়েশন করেন, কেন রিচা স্লট–বলে জোর না করে লেট–কাট নিলেন—এসব বিশ্লেষণ যত বাড়বে, ‘প্রশংসা’ আর ‘নিন্দা’ থেকে ‘সমালোচনা’-তে বদল তত দ্রুত হবে। যত গঠনমূলক ‘সমালোচনা’, ততই আস্তে আস্তে বড় হওয়া!

সবশেষে ফিরে যাই রূপকথায়। বরাবর বলা হয়েছে—রাজপুত্র এল, শাপমোচন হল, রাজার সিংহাসন পেল রক্ষে! গতরাতের গল্পের ন্যারেটিভ উলটো—রাজকন্যেরাই বাঁচাল রাজ্য, রাজপুত্ররা স্ট্যান্ডে হাততালি দিল! স্মৃতি আর হরমন যখন সাজঘর আড়াআড়ি বিভাজনের গুজবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে তেরঙা পতাকার তলায় একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলেন, স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো রোহিত শর্মার চোখে জল, মুখে হাসি!

‘রাজপুত্র নেই, এ রূপকথার সক্কলে রাজকন্যে’—এবার থেকে গল্প বলা হয়তো এভাবেই শুরু হবে!


```