আজকের ট্রফি নিঃসন্দেহে বড় জয়। কিন্তু আসলে ভারতের মেয়েরা প্রতিদিনই জেতে।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 November 2025 14:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২ নভেম্বর ২০২৫, ভারতের মেয়েদের ক্রিকেট ইতিহাসে দিনটি আজ সেই অর্থে দাঁড়িয়েছে, যেমনটা ছিল ২৫ জুন ১৯৮৩। নবি মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) যখন ভারতের প্রথম মহিলা দল হিসেবে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ট্রফি (Women's World Cup) তুললেন, অনেকেই মনে করলেন— এ যেন কপিল দেবের লর্ডসের ব্যালকনিতে ট্রফি তোলার পুনরাবৃত্তি।
শুনতে সিনেমার মতো লাগে, মন ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তুলনাটা আসলে ভুল। কারণ, ১৯৮৩ ভারতের পুরুষ ক্রিকেটে বিপ্লবের সূচনা করেছিল ঠিকই কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটে তা বহু আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।
’৭৮-এ শুরু সেই বিপ্লব, যার কথা কেউ বলে না
১৯৭৮ সালে, কপিলদের বিশ্বজয়ের পাঁচ বছর আগেই, ভারত আয়োজন করেছিল এক বিশ্বকাপ। হ্যাঁ, মহিলাদের প্রথম বিশ্বকাপ— পুরুষদের আগেই! মহেন্দ্রকুমার শর্মা নামে এক ক্রীড়া সংগঠক, যিনি মূলত হ্যান্ডবল-সফ্টবলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একদিন রেলস্টেশনে কিছু মেয়েকে ক্রিকেট খেলতে দেখে ভাবলেন, এদেরও একটা সংগঠন দরকার। সেখান থেকেই জন্ম নেয় উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (WCAI)।
সংগঠন না হয় বানানো হল। কিন্তু পরিকাঠামো? অতিসম্প্রতি স্মৃতিচারণ করেছেন প্রথম বিশ্বকাপে ভারতের জার্সিতে নামা অধিনায়ক শান্তা রঙ্গস্বামী। জানিয়েছেন, কীভাবে ট্রেনের কামরার টয়লেটের পাশেই ঘুমিয়ে থাকতে হত তাঁদের। কিট ব্যাগ ভাগ করে ব্যবহার করতে হত। ম্যাচ ফি? শুনলেই অবাক হবেন—কোনও টাকাই পেতেন না। অন্যদিকে, ১৯৮৩-র পুরুষ দলের প্রত্যেকে পেতেন দেড় হাজার টাকা প্রতি ম্যাচে, যা আজকের দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকার সমান। তবুও খেলেছিলেন তাঁরা, দেশের হয়ে। সেটাই ছিল প্রথম বিপ্লব।
১৯৯৭: প্রেক্ষাপট পাল্টায়নি, শুধু আলোটা একটু বেশি ছিল
উনিশ বছর পর, ১৯৯৭ সালে ফের ভারত আয়োজন করে মহিলাদের বিশ্বকাপ। সেবার প্রতিযোগী ১১ দল, সেমিফাইনালে পৌঁছেও যায় ভারত। কিন্তু শেষমেশ হার। তবুও কলকাতার ইডেনে ফাইনাল দেখতে গিয়েছিলেন মেয়েরা—যেখানে তাঁদের জন্য প্যাভিলিয়নে জায়গা হয়নি! দর্শকদের সঙ্গে গ্যালারিতেই বসতে হয়। ফাইনালের সময় মাঠে ঢোকার চেষ্টা করলে গেটে আটকে দেওয়া হয়। ভাবুন, দেশের প্রতিনিধি, অথচ নিজেদের দেশের মাঠেই বঞ্চিত! মিতালি রাজের মতো ক্রিকেটারও, যিনি ২০২৫-এর ট্রফি তুলেছেন, একসময় ট্রেনে চেপে রাজ্য থেকে রাজ্যে যেতেন ম্যাচ খেলতে। এই টুকরো টুকরো অন্ধকার জমতে জমতেই আলো হয়ে ঝলসে উঠল নবি মুম্বইয়ের বাইশ গজে!
২০০৬-এ বোর্ডে ঢোকার পরও বৈষম্যের শেষ হয়নি
২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)-এর নির্দেশে মহিলাদের দলকে অবশেষে নিজের আওতায় নেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI)। কিন্তু সেটাও অনিচ্ছাসহকারে। আর সেই বোর্ডই মেয়েদের কেন্দ্রীয় চুক্তি দিতে সময় নেয় আরও নয় বছর! ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোনও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার কেন্দ্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন না।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি—পাকিস্তান, যেখানে মহিলা খেলোয়াড়েরা মৃত্যুর হুমকি পেতেন, সেখানকার মেয়েদেরও ভারতের তিন বছর আগে জুটেছিল কেন্দ্রীয় চুক্তি।
আজকের জয় আসলে দশকের পর দশকের লড়াইয়ের ফসল। হরমনপ্রীতের দলের এই জয় নতুন বিপ্লব নয়—যেন সেই বিপ্লবেরই মুকুট, যা শুরু হয়েছিল সাতের দশকে। দশকের পর দশক ধরে নিঃশব্দে চলেছে মেয়েদের লড়াই, অপমান, অস্বীকৃতি আর অবিচারের বিরুদ্ধে। আজ তার ফল পেল ভারত।
লেনিন একবার বলেছিলেন— “কিছু দশক থাকে যেখানে কিছুই ঘটে না, আবার কিছু সপ্তাহ থাকে যেখানে দশকের ঘটনা ঘটে যায়।” ভারতের মেয়েদের ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাই হল। গত কয়েক সপ্তাহেই ঘটে গেল দশকের পর দশকের পরিবর্তন।
আজকের ট্রফি নিঃসন্দেহে বড় জয়। কিন্তু আসলে ভারতের মেয়েরা প্রতিদিনই জেতে। যে দেশে ১৪৮টি দেশের মধ্যে নারী-পুরুষ সমতার সূচকে ভারতের স্থান ১৩১তম, সেখানে ক্রিকেট খেলতে পারাটাই বিপ্লব। যে দেশে ৪০ শতাংশ বাল্যবিবাহ হয়, যেখানে লক্ষাধিক কন্যাশিশু শুধু জন্মেই মরতে বসে, সেখানে একটা মেয়ে যখন ব্যাট হাতে নেয়, সেটাই জয়।
এই মেয়েরা শুধু ম্যাচই জেতেন না, জেতেন নিজের জায়গা, নিজের সম্মান, নিজের অস্তিত্ব। ২ নভেম্বর ২০২৫ তাই কোনও নতুন শুরু নয়— এটা ইতিহাসের এক নীরব বিপ্লবের প্রাপ্য সম্মান, যা আমরা এতদিন দেখিনি।