শ্রীরামকৃষ্ণের হাস্যময় মুখ কীভাবে নিঃসম্বল মানুষের ভবসাগর পারের সম্বল হতে পারে,তা আমরা দেখি গুরুদেবের জীবনের নানান ঘটনা থেকে।

শ্রীরামকৃষ্ণ
শেষ আপডেট: 9 July 2025 17:09
শ্রীরামকৃষ্ণের হাস্যময় মুখ কীভাবে নিঃসম্বল মানুষের ভবসাগর পারের সম্বল হতে পারে,তা আমরা দেখি গুরুদেবের জীবনের নানান ঘটনা থেকে। শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী অন্তরে ধারণ করে আধ্যাত্মিক সম্পদে অসহায় মানুষও পরিপূর্ণ হয়ে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে। এই সব কাহিনী পড়ে আমরাও নিজেদের জীবন নির্ভার করতে পারি, সংসারের পাপ পঙ্কিলময় কর্ম থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে পারি।
শ্রীরামকৃষ্ণ যখন বিভিন্ন সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন তখন রানি রাসমণির জামাতা জমিদার মথুরামোহন বিশ্বাস ভেবেছিলেন, অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালনের জন্য ঠাকুরের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গেছে। সেটাই তাঁর আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই তাঁর ব্রহ্মচর্যভঙ্গ হলে পুনরায় শারীরিক স্বাস্থ্যলাভের সম্ভাবনা আছে ভেবে তাঁর পরীক্ষা নিতে প্রথমে দক্ষিণেশ্বরে লছমীবাই প্রমুখ সুন্দরী বারনারীকুলের কাছে এবং পরে মেছুয়াবাজার পতিতাপল্লীতে নিয়ে গিয়েছিলেন । সেখানে পতিতাদের দেখামাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ 'মা' 'মা' সম্বোধন করে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়েছিলেন। শিশুসুলভ এরূপ আচরণ দেখে পতিতারাও বুঝলেন, এজন অন্য জগতের মানুষ। তারা লজ্জিত হয়ে সজল নয়নে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁকে বারংবার প্রণাম করে সশঙ্কচিত্তে বিদায় নিলেন।

এই পতিতাদের মধ্যে জনৈক পদ্মরানি শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করেছিলেন তাঁর শ্রীচরণ স্পর্শ করে। একদিন রাতে পদ্মরানি স্বপ্নে দেখলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ হাস্যোজ্জ্বল জ্যোতির্ময় মূর্তিতে তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে আসার জন্য আহ্বান করছেন। পরদিন সকালেই পদ্মরানি স্নান সেরে ফল-ফুল নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এসে ভূমিষ্ট প্রণাম করলেন। তিনি ঠাকুরকে তাঁর দেখা স্বপ্ন বৃত্তান্ত কিছুই বলেননি অথচ অন্তর্যামী ঠাকুর সমস্ত ব্যাপার বুঝে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলছেন, 'ওরে গান কর। কৃষ্ণের গান কর। মার গান কর। ভাবনা কি? পেটের জন্য দেহ দিবি কেন? গলা আছে। গাইবি। ... দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। দুটো পেট বৈ তো নয়।'
প্রকৃতপক্ষে পদ্মরানির অন্তরের কথা অন্তর্যামী শ্রীরামকৃষ্ণ জেনেছিলেন। পদ্মরানির ভয় তাঁর কন্যাকে নিয়ে। তিনি তাঁর কন্যাকে পতিতাপল্লীতে রাখতে রাজি নন কারণ সেখানে রাখলে সে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হবে।সমাজে বেরিয়ে আসবেন তারও সাহস পাচ্ছিলেন না, কারণ সমাজের লোক তাদের গ্রহণ করবে কিনা, এই ভয় তাঁর হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য স্বপ্নে দেখা ঠাকুরের এ-আহ্বান সত্যি কিনা তা যাচাই করার জন্য পদ্মবানি অতি প্রত্যুষে গেলেন ঠাকুরের কাছে দক্ষিণেশ্বরে। তিনি পদ্মরানিকে দেখেই তার মনের কষ্টের কথাগুলি বলতে লাগলেন। সব শুনে পদ্মরানি বিস্মিত হলেন! এরপর নিজ বৃত্তি ত্যাগ করে পদ্মরানি সাহস পেলেন এবং কন্যাসহ পতিতাপল্লী থেকে বেরিয়ে এলেন সমাজে।
পদ্মরানি সেদিনের সেই অলৌকিক দর্শনের পর থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের হাস্যোজ্জ্বল জ্যোতির্ময় মুখখানি ভুলতে পারেন না।

শ্রীরামকৃষ্ণ-তত্ত্বকার মণীন্দ্রকৃষ্ণ গুপ্তও তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন , 'যেদিকেই চক্ষু ফিরাই সেই দিকেই যেন তাঁহার সেই হাসিমুখ দেখিতেছি। ... শুতে গিয়েও দেখি মশারির ভিতরেও জ্বলজ্বল করছে সেই হাসিমুখ।' বস্তুত বিশেষ কোনও দৃশ্য হৃদয়ে সঠিকভাবে একবার ধারণ হলে তা চিরস্থায়ী হয়ে যায়। যে-কারণে পদ্মরানিও তাঁর চলা-ফেরায় সর্বদাই শ্রীরামকৃষ্ণের সেই দুর্লভ হাসিমুখ দর্শন স্মরণ করেছেন নিত্যদিনের আনন্দের সম্বল হিসেবে।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, 'যে যাকে চিন্তা করে, সে তার সত্তা পায়।' পদ্মরানি শ্রীরামকৃষ্ণের সেই জ্যোতির্ময় মূর্তির দিব্য হাসিটুকু নিরন্তর চিন্তা করে নিজ হৃদয়ে এমনভাবে স্থাপন করেছিলেন যে, সর্বদাই শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবে ভাবিত থাকতেন। অন্ধকার ঘর যেমন একটি দেশলাই জ্বাললেই দপ করে আলোকিত হয়ে উঠে, তেমনই পতিতা পদ্মরানির হৃদয়-ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণের হাসি সব আঁধার সরিয়ে আলো জ্বেলে দিল। উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় মূর্তি রূপে তিনি দেখেছেন তা প্রতিষ্ঠা করে ভগবদ্ সম্পদে ভরপুর হলেন পদ্মরানি। তাই তিনি নির্ভার, নিশ্চিন্ত। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মৃত্যুভয়ে তিনি ভীত নন, অন্তিমকালে সজ্ঞানে মুখে উচ্চারণ করলেন ভগবানের নাম। জয় শ্রীরামকৃষ্ণ, জয় শ্রীরামকৃষ্ণ। যে পদ্মরানির ভাগ্যে নরকযাত্রাই হয়তো লেখা ছিল, সেই পদ্মরানি ভবসাগর পাড়ি দিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় মূর্তির হাসিটুকু সম্বল করে।আর রেখে গেলেন অনবদ্য একখানি উপমা চিত্র -আমাদের জন্য।

শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধি রূপ দর্শন করে বরিশালের মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত পরবর্তী কালে বলেছিলেন, 'যা দেখেছি ও পেয়েছি তাতে জীবন মধুময় করে রেখেছে। সেই দিব্যামৃতবর্ষী হাসিটুকু, যতনে পেটরায় পুরে রেখে দিইছি। সে যে নিঃসম্বলের অফুরন্ত সম্বল গো!`
লেখক যশোর রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমের অধ্যক্ষ