হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে শ্রীরাধা কেবল শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গিনী নন, তিনি ভক্তির পরাকাষ্ঠা ও প্রেমের সর্বোচ্চ প্রতীক। রাধা নামটি ভক্তদের কাছে শুধু এক দেবীর পরিচয় নয়, ভক্তির এমন এক মহিমা, যেখানে ঈশ্বরপ্রেম সর্বস্ব। বৈষ্ণব দর্শনে বলা হয়—রাধা ছাড়া কৃষ্ণ অসম্পূর্ণ, কৃষ্ণ ছাড়া রাধাও পূর্ণ নন।

শেষ আপডেট: 19 August 2025 12:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ বছর রাধাষ্টমী (Radhashtami 2025) পালিত হবে ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ৩১ আগস্ট ২০২৫, রবিবার। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতেই এই পূণ্যদিন উদযাপিত হয়। জন্মাষ্টমীর ঠিক পনেরো দিন পর রাধাষ্টমী আসে। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম যেমন ভক্তদের কাছে আনন্দঘন দিন, তেমনি শ্রীরাধার আবির্ভাবতিথিও ভক্তদের হৃদয়ে অপরিসীম আনন্দ ও ভক্তির সঞ্চার করে।
রাধাষ্টমীর তাৎপর্য
হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে শ্রীরাধা কেবল শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গিনী নন, তিনি ভক্তির পরাকাষ্ঠা ও প্রেমের সর্বোচ্চ প্রতীক। রাধা নামটি ভক্তদের কাছে শুধু এক দেবীর পরিচয় নয়, ভক্তির এমন এক মহিমা, যেখানে ঈশ্বরপ্রেম সর্বস্ব। বৈষ্ণব দর্শনে বলা হয়—রাধা ছাড়া কৃষ্ণ অসম্পূর্ণ, কৃষ্ণ ছাড়া রাধাও পূর্ণ নন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে রাধা
চৈতন্যদেব রাধার ভক্তিকে চরম ভক্তি বা মহাভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতে, শ্রীকৃষ্ণকে বোঝার সর্বোত্তম উপায় হল রাধার প্রেমকে উপলব্ধি করা। এজন্যই বৃন্দাবন, নবদ্বীপ বা পুরীর ভক্তি আন্দোলনে রাধার পূজা বিশেষ স্থান পেয়েছে।
শ্রীরাধার জন্মকথা নিয়ে নানা পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী পাওয়া যায়। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, শ্রীরাধার জন্ম হয়েছিল বৃন্দাবনের বর্ষানা গ্রামে, বৃষভানু ও কীর্তিদার ঘরে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে উল্লেখ রয়েছে—তিনি আদ্যাশক্তির অবতার, যিনি কৃষ্ণের লীলার জন্য মানব রূপে অবতীর্ণ হন। আর এক মতে, রাধা জন্মের সময় অদ্ভুতভাবে পদ্মফুলের উপর আবির্ভূত হয়েছিলেন।
আচার-অনুষ্ঠান, উপবাস ও পূজা
রাধাষ্টমীর দিনে ভক্তরা সাধারণত উপবাস রাখেন। অনেকেই নির্জলা উপবাস পালন করেন, আবার অনেকে ফলাহার করেন। ভোরে স্নান-সাধন সেরে রাধাকৃষ্ণের মন্দিরে গিয়ে পূজা দেন। ভক্তরা রাধাকে ষোড়শোপচারে পূজা করেন। রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তির অর্চনা হয় ফুল, তুলসী, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য দিয়ে। বিশেষভাবে গাওয়া হয় রাধাষ্টক স্তোত্র ও রাধা-কৃষ্ণ লীলা সংগীত।
এই দিনে মিষ্টি, মাখন, দুধ, দই, মাখন-চিনি ইত্যাদি ভোগ দেওয়া হয়। গোপালের মতোই রাধা মাখনপ্রেমী বলে ভক্তদের বিশ্বাস।
বৃন্দাবনে রাধাষ্টমী
বৃন্দাবনের বারসানা, যেখানে রাধার জন্ম, সেখানে এই উৎসবের মহিমা সর্বাধিক। সকাল থেকে হাজার হাজার ভক্ত পদযাত্রা করে পৌঁছান শ্রীরাধা রাণী মন্দিরে। সেখানে ফুলে, আলোয় ও ভজন-সঙ্কীর্তনে মুখরিত হয় সমগ্র পরিবেশ।
নবদ্বীপ ও মায়াপুর
গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের প্রধান কেন্দ্র নবদ্বীপ-মায়াপুরে রাধাষ্টমীর দিন ভক্তরা সারাদিন হরিনাম-সঙ্কীর্তন করেন। ইস্কন মন্দিরে রাধা-মাধবের বিশেষ সজ্জা ও মহাভোগ হয়। তা ছাড়া নদীয়া, বীরভূম, বর্ধমান, কলকাতার বৈষ্ণব মন্দিরগুলিতে বিশেষ আরতি, কীর্তন ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন হয়।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম হিন্দু দর্শনে কেবল রোমান্টিকতা নয়, এটি জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনরূপী প্রেম। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, রাধার মধ্যে যে প্রেম ও আত্মনিবেদন কৃষ্ণের জন্য, তা-ই ভক্তদের আদর্শ হওয়া উচিত। চণ্ডীদাস লিখেছিলেন—"শুনহ রাধার একবার নাম, তাহার সম নয় কেহ ধাম"। অর্থাৎ, রাধার নাম উচ্চারণ করলেই ভক্ত হৃদয়ে প্রেমের সঞ্চার হয়।
রাধাষ্টমী পালনের বৈশিষ্ট্য- স্তোত্রপাঠ: রাধাষ্টক, গীতগোবিন্দ পাঠ।
সঙ্কীর্তন: হরিনাম ও রাধাকৃষ্ণ লীলা কীর্তন।
অভিষেক: মূর্তির দুধ, দই, মধু, ঘৃত ও গঙ্গাজল দিয়ে অভিষেক।
ভোগ: ৫৬ ধরনের ভোগ দেওয়া হয় বহু মন্দিরে।
নাটক ও লীলা: স্থানীয়ভাবে রাধাকৃষ্ণের লীলাভিনয় মঞ্চস্থ হয়।
রাধাষ্টমী তাই কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ভক্তির অনন্য প্রকাশ। বৃন্দাবন থেকে বাংলার গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র এই দিন ভক্তরা রাধানামের মাহাত্ম্যে মগ্ন হন। এ বছর ৩১ আগস্ট, ১৪ ভাদ্রের অষ্টমীতে আবারও ভক্ত হৃদয় একসঙ্গে উচ্চারণ করবে—“রাধে রাধে!”