কথিত আছে, ১৬শ শতকে তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই প্রথম গৃহস্থদের উপযোগী কালীপ্রতিমার রূপকল্প দেন। তার আগে দেবীর উপাসনা হতো ‘যন্ত্রে’ বা গোপন তান্ত্রিক (Tantra Sadhana) রূপে, যেমন শবশিবা বা গুপ্ত প্রতিমা। পরে তন্ত্রগ্রন্থ, দেবীপুরাণ, দেবীমাহাত্ম্য ও কালিকাপুরাণে দেবীর বিভিন্ন মূর্তির বর্ণনা প্রসারিত হয়।

শেষ আপডেট: 14 October 2025 17:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজকের যে কালী বা শ্যামা মূর্তি (Ma Kali) দেখা যায়, তা সহস্র বছরের পুরনো নয়। কথিত আছে, ১৬শ শতকে তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই প্রথম গৃহস্থদের উপযোগী কালীপ্রতিমার রূপকল্প দেন। তার আগে দেবীর উপাসনা হতো ‘যন্ত্রে’ বা গোপন তান্ত্রিক (Tantra Sadhana) রূপে, যেমন শবশিবা বা গুপ্ত প্রতিমা। পরে তন্ত্রগ্রন্থ, দেবীপুরাণ, দেবীমাহাত্ম্য ও কালিকাপুরাণে দেবীর বিভিন্ন মূর্তির বর্ণনা প্রসারিত হয়। সাধারণভাবে দেবীকে চার হাতযুক্ত, কৃষ্ণবর্ণা (কখনও নীল), উন্মত্ত কেশ, গলায় মুণ্ডমালা ও অসুরের ছিন্নমুণ্ড হাতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। তিনি মহাদেবের বুকে পদার্পণ করে আদি শক্তির বিজয়কে প্রকাশ করেন।
‘ওঁ খড়্গং চক্রগদেষুচাপপরিঘান শূলং ভুশুণ্ডীং শিরঃ…’ — এই ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিত মহাকালীর রূপই দেবীর প্রাচীন তান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতীক। শাক্ত মতে, তিনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি স্রষ্টা, চেতনার উন্মেষের মূল শক্তি। দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী হিসেবে কালী কেবল এক পূজ্য দেবতা নন— তিনি সৃষ্টির মূলে থাকা আদ্যাশক্তির প্রতীক।
কালীর নানা রূপে (maa kali different forms) আরাধনা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে— দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, রক্ষাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী থেকে মহাকালী পর্যন্ত। আবার ‘ব্রহ্মময়ী’, ‘ভবতারিণী’, ‘আনন্দময়ী’ বা ‘করুণাময়ী’ নামেও বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা ও পূজা প্রচলিত। তোড়ল তন্ত্র মতে, কালী আটরূপা বা অষ্টবিধা— দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী (ma kali names)। মহাকাল সংহিতায় তাঁর রূপ আরও বিস্তৃত— সেখানে নববিধা কালীর বর্ণনা পাওয়া যায়। কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী, চণ্ডিকাকালী সহ নানা রূপে দেবী পূজিতা হয়ে আসছেন।
দক্ষিণাকালী: মৃত্যুর ভয়কে জয় করে রক্ষা
কালীর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রূপ দক্ষিণাকালী। বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যুর দেবতা যমও যাঁর ভয়ে সরে যান, তিনি দক্ষিণাকালী। ভয়ঙ্কর এই দেবীর চেহারায় যেমন আছে রুদ্রতা, তেমনই ভক্তকে সুরক্ষার আশ্বাস। চার হাতে তিনি ধারণ করেন সদ্যছিন্ন মুণ্ড ও খড়্গ, বর ও অভয় মুদ্রা। কৃষ্ণবর্ণা এই দেবীকে মহাভয়ঙ্কর হলেও তিনি আসলে মুক্তির প্রতীক।

দক্ষিণাকালী
মহাকালী: আদ্যাশক্তির রূপ
তন্ত্রসারে মহাকালী পঞ্চমুখী ও পনেরো চক্ষুরূপে বর্ণিত, আর কালিকাপুরাণে তিনি দশমুখী, দশভুজা, দশপদা। তাঁর হাতে খড়্গ থেকে শুরু করে চক্র, ধনুক-বাণ, শঙ্খ— সব অস্ত্র। তিনি ভক্তকে কঠিন সাধনায় ভয় দেখালেও অন্তে প্রদান করেন কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধি।

মহাকালী
ভদ্রকালী: কল্যাণের দেবী
‘ভদ্র’ মানে কল্যাণ, ‘কাল’ মানে সময়। এই রূপে কালী মৃত্যুকালে জীবের কল্যাণ সাধন করেন। কালিকাপুরাণ মতে, তাঁর গাত্রে অতসীফুলের মতো নীল আভা, মুক্ত কেশ আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তিনি জীবনের শেষ প্রহরে মুক্তির পথ দেখান।

ভদ্রকালী
রক্ষাকালী: নাগরিক রূপে দেবী
দক্ষিণাকালীরই নাগরিক রূপ রক্ষাকালী। নগর রক্ষার জন্য প্রাচীন কালে এই দেবীর আরাধনা হতো। তন্ত্রগ্রন্থে তাঁর একাধিক রূপের বর্ণনা রয়েছে— সৃষ্টিকালী, রক্তকালী, মৃত্যুকালী, যমকালী, মহাভৈরবকালী ইত্যাদি। সময়ের জন্মদাত্রী, পালনকর্ত্রী ও প্রলয়কারিণী বলেই তাঁর নাম কালী। তিনি মৃত্যুর উপর দাঁড়িয়ে জীবন ও চেতনার প্রতীক হয়ে আছেন যুগের পর যুগ।

রক্ষাকালী
সিদ্ধকালী: সাধকদের গোপন উপাস্যা
এই রূপে কালী সাধারণ গৃহস্থের ঘরে পুজিত হন না। সিদ্ধসাধকরা ধ্যানে তাঁকে ধারণ করেন। দ্বিভুজা রূপে কল্পিত সিদ্ধকালীর খড়্গে আঘাত হানলে চন্দ্রমণ্ডল থেকে অমৃত ঝরে পড়ে, যা তিনি কপালপাত্রে ধারণ করে পান করেন। এই রূপে তিনি ভুবনেশ্বরী— পরমানন্দের প্রতীক।

সিদ্ধকালী
চামুণ্ডাকালী: অসুরবিনাশিনী
চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধের জন্য দুর্গার কপাল থেকে উদ্ভব হয়েছিল এই চামুণ্ডার। অস্থিচর্মসার এই দেবীর হাতে দণ্ড ও চন্দ্রহাস। সন্ধিপুজোর সময় এই রূপে দেবীর বিশেষ আরাধনা হয়।

চামুণ্ডাকালী
গুহ্যকালী: গুপ্ত সাধনার দেবী
গুহ্যকালীর উপাসনা প্রকাশ্যে হয় না। সাধকরা ভয়ঙ্কর এই দেবীর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। গলায় নরমুণ্ডের মালা, গাত্রে গাঢ় কালো আভা, নাগ দ্বারা বেষ্টিত আসন— এই দেবী শক্তির গুপ্ততম রূপ। তন্ত্র মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীর স্থান সর্বোচ্চ।

গুহ্যকালী
শ্মশানকালী: অন্ধকারের প্রভু
শ্মশানকালীর রূপে দেবীর অবস্থান চিরকালই ভয়ংকর। কালো গাত্র, রক্তবর্ণ চোখ, ছিন্নমুণ্ড ও খড়্গ— তিনি শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী। সাধারণ গৃহস্থবাড়িতে এই প্রতিমা রাখা হয় না। সাধকের কাছে এই রূপে দেবী মোক্ষের প্রতীক।

শ্মশানকালী
শ্রীকালী: দারুকবিনাশিনী
শ্রীকালীর এই রূপে দেবী অসুর দারুককে বিনাশ করেন। মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন তিনি। এই রূপে তিনি ত্রিশূলধারিণী ও সর্পশোভিতা।

শ্রীকালী
আদ্যাকালী: সৃষ্টির মূলস্বরূপ
মহানির্বাণ তন্ত্রে বর্ণিত আদ্যাকালী দেবী ত্রিনেত্রা, নীলবর্ণা, চন্দ্রললাট ও রক্তপদ্মাসীনা। মহাকালের নৃত্য দর্শন করে তিনি আনন্দে আত্মমগ্ন।

আদ্যাকালী
এইভাবে দেবী কালীর প্রতিটি রূপই এক একটি তন্ত্র, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক সাধনার অধ্যায়। কখনও তিনি ভয়ঙ্কর, কখনও মমতাময়ী— কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তিনি শক্তির উৎস, সময়ের প্রতীক এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক।