শ্রীক্ষেত্র ও কালীক্ষেত্রের ভৌগোলিক দূরত্ব যেন ঘুচে য়ায় জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে। সব পথ এসে মিলে যায় ভক্তের হৃদয়ে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 11 June 2025 14:03
কলিযুগে কালী ও কৃষ্ণ অভিন্ন । প্রতি বছর স্নানযাত্রার পুণ্যলগ্নে একথা স্মরণ করিয়ে দেন দেবতা স্বয়ং। একদিকে পুরীর শ্রীক্ষেত্র যেমন মেতে ওঠে জগন্নাথপ্রভুর স্নানযাত্রায়, অন্যদিকে কলকাতার কালীক্ষেত্র কালীঘাটে এদিন মায়ের প্রস্থরীভূত শ্রীঅঙ্গের স্নানরীতি পালন করা হয়। শ্রীক্ষেত্র ও কালীক্ষেত্রের ভৌগোলিক দূরত্ব যেন ঘুচে য়ায় জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে। সব পথ এসে মিলে যায় ভক্তের হৃদয়ে।
রত্নবেদী থেকে স্নানবেদীতে আসেন জগন্নাথদেব
জ্যৈষ্ঠ মাস। ওড়িশার সমুদ্রতট এইসময় সূর্যের গনগনে তাপে জ্বলতে থাকে। অঙ্গের দহন জুড়তে জগন্নাথপ্রভু পুরীর জগন্নাথধামের শ্রীমন্দিরের রত্নবেদী থেকে নেমে স্নানবেদীতে আসেন। এক শো আট কলস জলে স্নান করেন প্রভু।এই দেবস্নান ঘিরে পুরীর মন্দিরে চলে স্নানযাত্রা উৎসব। জগন্নাথদেবের এই মহাস্নান ভক্তি ভরে একবার দর্শন করলে জীবনের সব পাপ ধুয়ে যায়, কলুষতার অন্ধকার কেটে নতুন জীবন লাভ হয় আর জীবন চক্র থেকে মুক্তি মেলে অর্থাৎ পুনর্জন্ম হয় না-এমনই বিশ্বাস ভক্তদের। কথিত আছে, জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতেই দারুমূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল জগন্নাথদেবের। তাই এই দিনটিকে মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথিও বলা হয়।

উপাসনা রীতি ভিন্ন, তবু সাদৃশ্য আছে
জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিটি পুরীর জগন্নাথধামের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপুর্ণ ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ মহাতীর্থ কালীঘাট মন্দিরের ক্ষেত্রেও। জগন্নাথদেবের পুজো পদ্ধতি অনেকটাই বৈষ্ণব ঘেঁষা। আর সম্পূর্ণ শাক্ত মতে পুজো হয় কালীঘাটের মা কালীর। তাহলে সাদৃশ্যটা কোথায়?আসলে উপাসনা পদ্ধতি আলাদা হলেও প্রথাগত কিছু মিল রযেছে।
শক্তিপীঠের আদিপীঠ কালীঘাটে পড়েছিল সতীর পদাঙ্গুলি। কথিত আছে , জ্যৈষ্ঠ মাসের এই পূর্ণিমা তিথিতে প্রস্তরীভূত সেই দেবীর পদাঙ্গুলি হ্রদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন দুই ব্রহ্মচারী -ব্রহ্মানন্দ গিরি ও আত্মারাম ব্রহ্মচারী। এই দিনেই তাঁরা মন্ত্র পাঠ করে প্রস্তরীভূত সতী অঙ্গে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীরই আদেশে ব্রহ্মপীঠের নীচে অগ্নিকোণে রাখা হয় প্রস্তরীভূত পদাঙ্গুলি। সতী অঙ্গের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলে দিনটিকে কালীঘাটের মায়েরও আবির্ভাব তিথি হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়।

স্নানরীতি পালন করা হয় কালীঘাটেও
পুরীর শ্রীমন্দিরের রত্নবেদী থেকে নেমে জগন্নাথদেব যান স্নানবেদীতে। একশো আট কলস জলে তাঁকে স্নান করান পুরোহিতরা। দেবতার এই মহাস্নান দর্শন করেন ভক্তবৃন্দ। আগেই লিখেছি, জগন্নাথদেবের এই স্নানযাত্রা দর্শন করলে সব পাপ ধুয়ে যায়,পুনর্জন্ম হয় না। কালীঘাট মন্দিরেও স্নানযাত্রার দিন সতী অঙ্গের প্রস্তরীভূত শিলাটিকে স্নান করানো হয়। তবে ভক্তরা তা দেখতে পান না। এখন এই শিলাটি দক্ষিণা কালীর বেদীর নীচে একটি রুপোর সিন্দুকে রাখা থাকে। প্রতি বছর স্নানযাত্রার দিন ভোরে আচারনিয়ম মেনে স্নান উৎসবের সূচনা হয়। পূজারীরা স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে চোখে কাপড় বেঁধে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন। রুপোর সিন্দুক থেকে সতীর প্রস্তরীভূত শিলাকে স্নান করানো হয় গঙ্গাজল, অগুরু,জবাকুসুম তেল, আতরের মিশ্রণ দিয়ে। স্নানের পর সতী অঙ্গ মুছে তাঁকে বেনারসি বস্ত্র দিয়ে ঢেকে আবার রুপোর সিন্দুকে ভরে রাখা হয়। প্রতি বছর স্নানযাত্রার দিন এই নিয়ম কড়া অনুশাসন মেনে পালন করা হয় কালীঘাট মন্দিরে।

দক্ষিণা কালী অন্য রূপে আসেন ভক্তের কাছে
সতী অঙ্গের স্নানপূজা ভক্তরা দেখতে না পেলেও অনেকেই জানেন না স্নানযাত্রার পুণ্য দিনে উষালগ্নে কালিঘাটের দেবী দক্ষিণা কালী ভক্তের সামনে আসেন বৈষ্ণবী রূপে। পূজারীরা শ্বেতচন্দনের তিলক এঁকে দেন দেবীর কপালে।মায়ের অদ্ভুত মায়াময় লাবণ্যে ভক্তরা আবেগে ভাসেন। ভক্তিভাবে আকুল হয়ে গেয়ে ওঠেন
'মাগো আনন্দময়ী নিরানন্দ করো না...'

এর পিছনেও একটা গল্প আছে। বহুদিন আগে ভবানীদাস চক্রবর্তী নামে মায়ের মন্দিরের একজন পূজারী স্বপ্ন দেখেন , মা তাঁর কাছে তিলক পরতে চাইছেন। স্নানযাত্রার আগের রাতে এই স্বপ্নাদেশ পেয়ে ভগবানদাস রাত থাকতেই মন্দিরে যান। উষা লগ্নে দেবী দক্ষিণা কালীর কপালে এঁকে দেন শ্বেতচন্দনের তিলক। মায়ের এই স্নিগ্ধ বৈষ্ণবী রূপ দেখতে আজও কালীঘাটের মন্দিরে ভক্তের ঢল নামে। ভক্তের ভাবাবেগ মিলিয়ে দেয় শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবাদর্শকে।