ভগীরথের কাহিনি পরিচিত হলেও পুরাণে গঙ্গার আরও কিছু কাহিনি বর্ণিত হয়েছে যা সাধারণত প্রচলিত নয়। দশহরার পুণ্য তিথিতে তুলে ধরা হল সেরকমই আরেকটি কাহিনি।

শিবের জটা থেকে সৃষ্টি গঙ্গার।
শেষ আপডেট: 4 June 2025 18:57
রাত পোহালেই একুশে জ্যৈষ্ঠ, 5 জুন। দশহরা। দেবী গঙ্গাকে পুজো করার শুভক্ষণ। জৈষ্ঠ্যমাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে দেবী মকরবাহনা গঙ্গা মানুষের দশ রকমের পাপ হরণ করেন,এমনই বিশ্বাস আমাদের।
আমরা পুরাণে পাই সগর রাজার ষাট হাজার পুত্রকে মহর্ষি মহাক্রোধী কপিল ভ্রূভঙ্গে ভস্মীভূত করেছিলেন। সেই ষাট হাজার পুত্রের উদ্ধারের জন্য সেই বংশের রাজা ভগীরথ প্রবল তপস্যা করে গঙ্গাকে ধরায় নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের পবিত্র সুরধুনী গঙ্গার জলকে বলা হয় ব্রহ্মবারি, যা স্পর্শ করলে পবিত্রতা অর্জন করা যায়। ভগীরথের কাহিনি পরিচিত হলেও পুরাণে গঙ্গার আরও কিছু কাহিনি বর্ণিত হয়েছে যা সাধারণত প্রচলিত নয়। দশহরার পুণ্য তিথিতে তুলে ধরা হল সেরকমই আরেকটি কাহিনি।
সে অনেক কাল আগের কথা। তখন দক্ষ কন্যা সতী শিবের ঘরনী। আর হিমালয়ের গিরিশিখরে তাঁদের সুখের সংসার। এই সময় গিরিরাজ হিমালয়ের পত্নী মেনকা দেবী অনেকগুলো পুত্রের জন্ম দিয়ে একটি কন্যা সন্তানের আশায় নানা ব্রত পালন করছেন। সতীর সঙ্গে তাঁর খুব ভাব। মেনকার মনের ভাব বুঝতে পেরে সতী বরদান করেন, তোমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করব।

সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর একাংশ নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেন গঙ্গা । কন্যারূপে তিনি শুভ্রকেশ,শুভ্রবরণ ও ত্রিনয়না। এই কন্যাকে দেখে হিমালয় খুব ভালবাসলেন। কিন্তু গঙ্গা একটু বড় হলে স্বর্গ থেকে ডাক এল। দেবর্ষি নারদ হিমালয়ের কাছে এসে গঙ্গার আসল স্বরূপ বোঝালেন। হিমালয় একেবারে রাজি নন। এদিকে গঙ্গার মনে ছিল শিবলাভের ইচ্ছা। তিনি নারদের সঙ্গে স্বর্গে যাওয়ার জন্য জেদ করলেন। নারদ তাঁকে নিয়ে স্বর্গে গেলেন বটে। কিন্তু গঙ্গা পিতা হিমালয়ের কাছে অভিশপ্ত হলেন। হিমালয় বললেন ,'তোমাকে আবার মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে'।
স্বর্গে দেবী আকাশগঙ্গা নামে চিহ্নিত হলেন। তাঁর সাথী হলেন দক্ষের অপর কন্যাগণ আর স্বর্গের অপ্সরারা। আকাশগঙ্গা হয়ে তিনি শিবের গলায় মালা দিতে চাইলেন শিব কেবল তা জটায় ধারণ করে মৌন রইলেন। শিবকে বরণ করা আর হল না। সকলেই গঙ্গাকে ভালবাসেন কিন্তু তাঁর অর্ধ্বাংশ থেকে সৃষ্ট দেবী উমার প্রতিই সকলের মনোযোগ বেশি। কারণ তিনি তারকাসুর বধে সাহায্য করবেন।

এরপর, হিরণ্যকশিপুর নাতি রাজা বলি অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন।স্বয়ং নারায়ণ বামনরূপ ধারণ করে বলির যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। সে সময় তাঁর ত্রিপদ বিস্তারে একপদ আকাশগঙ্গাকে স্পর্শ করল। সেই পদ থেকে গঙ্গা একধারা হয়ে বিষ্ণুর কমণ্ডলুতে এসে পড়লেন। তাঁর অপর নাম তাই বিষ্ণুপদী।
বিষ্ণু গঙ্গাকে ব্যবহার করলেন কিন্তু তিনিও যথাযথ সম্মান দিলেন না। লক্ষ্মী, সরস্বতী আর গঙ্গা তিনজনই বিষ্ণুর প্রিয় ছিলেন। কিন্তু সরস্বতী মোটেই গঙ্গাকে সহ্য করতে পারতেন না। ফলে বিষ্ণুর ভালবাসাকে কেন্দ্র করে বিবাদের সৃষ্টি হল। সরস্বতী গঙ্গাকে অভিশাপ দিলেন। মর্ত্যে নদী হয়ে বয়ে যাও। গঙ্গাও সপত্নী সরস্বতীকে একই অভিশাপ দিলেন। এতদিন শিবপুজোয় কেবল গঙ্গাজলই একমাত্র উপকরণ ছিল। বিষ্ণুর আদেশে লক্ষ্মী শিবপুজো করে বেল ফল ও বিল্বপত্রকে অপরিহার্য করে তুললেন। গঙ্গার মন নির্মল, জল পবিত্র তবু তিনি চির বঞ্চিত।

তিনি শিবের জটায় বাস করেন। কিন্তু পার্বতী শিবের স্ত্রী, তিনি নন। শিব আর গঙ্গা - দুজনের মিলন অসম্পূর্ণই ছিল। কিন্তু ঘটনাক্রমে শিববীর্য ধারণ করলেন গঙ্গা। পুত্র হল।সেই পুত্রকে কৃত্তিকা নক্ষত্র পালন করলেন, তাই নাম হল কার্তিক। নক্ষত্রদের সঙ্গে গঙ্গার ভাল সম্পর্ক। তাঁরা গঙ্গাকে ভালবাসেন,বিপদে পড়লে রক্ষা করেন। তাঁদের আশীর্বাদেই গঙ্গা বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হলেন।তিনি বিপদনাশিনী দেবী গঙ্গা। তাই যে বিপদে পড়ে সেই গঙ্গার শরণাপন্ন হয় এবং রক্ষা পায়।
একবার অষ্টবসু অভিশপ্ত হলেন। মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করতে হবে , অষ্টবসু গঙ্গার শরণাপন্ন হলেন। অষ্টবসুকে রক্ষা করতে গঙ্গা এলেন মর্ত্যে। হস্তিনাপুর নরেশ শান্তনুকে শর্তসাপেক্ষে বিবাহ করলেন। তাঁর কোনও কাজেই রাজা নিষেধবাক্য উচ্চারণ করতে পারবেন না। অষ্টবসুর সাতজনকে তিনি জন্মের পর নিজের জলে বিসর্জন দিয়ে উদ্ধার করলেন। শেষ বসু হলেন ভীষ্ম। মহাভারতের নায়ক। তাঁকে রাজ্য পরিচালনার উপযুক্ত করে রাজা শান্তনুর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন গঙ্গা।
শিবের প্রতি গঙ্গার বিশেষ প্রীতি। শিব গঙ্গার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে বিহার করেন। এই ঘটনা পার্বতী জানতে পারলে প্রচণ্ড অশান্তি হয়। পার্বতীকে খবর দেন তাঁর দুই সখী জয়া বিজয়া। আর গঙ্গার দরদী হন নক্ষত্রকুল। এই নিয়ে গড়ে ওঠে পুরাণের নানা কাহিনি।
গঙ্গার সর্বদা মনে হয় পিতা হিমালয়ের অভিশাপের কথা। মর্ত্যে থেকে স্বর্গে এলেন বটে কিন্তু শিব বা বিষ্ণু, কারও কাছেই যোগ্য সম্মান পেলেন না। তার থেকে মর্ত্যে সম্মান অনেক বেশি পেলেন।

সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র কপিল মুনির দৃষ্টিতে ভষ্ম হয়ে যায়। তাঁদেরকে উদ্ধার করার জন্য কয়েক পুরুষ ধরে তপস্যা করে চলেন রাজপরিবার। শেষে ভগীরথ গঙ্গা অবতরণের জন্য তপস্যা করেন। অঙ্গীকার করেন গঙ্গা, কিন্তু শিবজটায় ঘুরপাক থেতে থাকেন। শেষে শিব নিজ জটার দক্ষিণ দিকের অংশ ছিঁড়ে গঙ্গাকে পথ করে দেন। তাঁর পথে জহ্নু মুনি তাঁকে পান করে গতিপথ রুদ্ধ করেন। শিব তাঁকে মুক্ত করেন তাই গঙ্গার আরেক নাম হয় জাহ্নবী। আবার তিনি হিমালয় বক্ষ থেকে ভগীরথের সঙ্গে সঙ্গে বয়ে চলেন। শেষে সাগর সঙ্গমে এসে মিলিত হন। বিষ্ণু ও শিব তাঁকে মর্যাদা না দিলেও সাগর কিন্তু ফিরিয়ে দিলেন না। পরম প্রেমিকের মতো গভীর মমতায় নিজের প্রেয়সীকে তুলে নিলেন। তাই আজও সাগর সঙ্গম উল্লেখযোগ্য তীর্থ রূপে পরিচিত।