তিনি যে একসময় শ্রীরামকৃষ্ণকেই ভগবান বলে বিশ্বাস করতেন তা তাঁর নিজের লেখা থেকেই জানা যায়।
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 23 July 2025 12:49
খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে অধ্যাত্মচেতনা শৈশবে প্রকাশ পেলেও ভগবান আছেন- এ-বিশ্বাস তাঁর অন্তরে দৃঢ় ছিল না। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' এবং রোমাঁ রোলার 'The Life of Ramakrishna' বই দু-খানি পড়ে ভগবান যে আছেন এ বিশ্বাস তাঁর সুদৃঢ় হয়েছে। তাঁর লেখা সাহিত্যে এরপর থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী, উপমা বেশ স্থান পেত। এ-সময়ে তিনি প্রায়ই বেলুড় মঠে যাতায়াত করতেন এবং বিভিন্ন সাধুর সঙ্গে মিশতেন। তিনি যে একসময় শ্রীরামকৃষ্ণকেই ভগবান বলে বিশ্বাস করতেন তা তাঁর নিজের লেখা থেকেই জানা যায়।
একদিন ছেলে বাবলুর জ্বরের জন্য তাঁর মন খুব খারাপ। ১৯ মে, ১৯৫০-এ তিনি লিখেছেন, 'ভগবান রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের ছবির কাছে বাবলুর জন্যে প্রার্থনা করি। পেনিসিলিন নিয়ে যখন আসছি, তখন শুধুই ভাবছি বাবলুকে গিয়ে কেমন দেখব। বাড়ি এসে শুনি ফোঁড়া ফেটে গিয়ে জ্বর কমে গেছে। শ্রীরামকৃষ্ণকে.... কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাব, ভগবান তো বাবা তাকে কি জানাবো ...'
শ্রীরামকৃষ্ণে তাঁর একনিষ্ঠ বিশ্বাস-ভক্তির এ এক জ্বলন্ত নিদর্শন।
পরবর্তী কালে এই বিশ্বাস-ভক্তি এতই পাকা হল যে, তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে জীবনের ধ্রুবতারা রূপে গ্রহণ করে তাঁর ফটো পূজা করে, ধ্যান করে তাঁকে জীবন্তই উপলব্ধি করেছেন। এক সময় বিভূতিভূষণের হৃদযন্ত্র ও কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পূর্বদিন ছিল মঙ্গলবার। তিনি তাঁর স্ত্রী কল্যাণী দেবীকে ভেঙ্গে পড়তে দেখে বলেছেন, 'তুমি অত অধীর হচ্ছ কেন? তিনি পরম পিতা, তিনি ডেকেছেন, আমার প্রয়োজন হয়েছে আমি যাচ্ছি। তোমারও প্রয়োজন হলে তিনি ডাকবেন, তুমিও যাবে। এ তো শুধু এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যাওয়া। এতে এত বিচলিত হওয়ার কী আছে? তিনি তো আমাদের সকলেরই পিতা।'
পরদিন বুধবার। বিভূতিবাবু তাঁর পরিচিত একজন স্বামীজিকে ডেকে পাঠালেন রামকৃষ্ণ মিশন থেকে।। তাঁকে বললেন, 'আর কেন স্বামীজি , এবার নাম শোনান ঠাকুরের!
স্বামীজি বললেন,'আমাদের ওখানকার (সম্ভবত বেলুড় মঠের পুরনো মন্দিরে পূজিত শ্রীরামকৃষ্ণের বড় তৈলচিত্রখানি) সেই বড় ছবিখানার কথা মনে আছে? ঠাকুরের?'
'নিশ্চয়ই' বলে দুহাত তুলে প্রণাম করলেন বিভূতিভূষণ।
ঐদিন মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও তাঁর মুখে ছিল এক অদ্ভুত স্বর্গীয় হাসি। তাঁর শয্যা পার্শ্বে ডাক্তারের স্বীকারোক্তি ,'বহু রোগীর মৃত্যু দেখেছিলাম। এ-হাসি কখনো কল্পনা পর্যন্ত করিনি। যেন দেবতার হাসি।
সেই বড় ছবিধানাতে শ্রীশ্রীঠাকুরের যে দিব্য হাসি তিনি দর্শন করেছেন, বিভূতিভূষণ সেই ছবি নিজ হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তিনি ধ্যান করে এমন সম্পদে পরিপূর্ণ হয়েছিলেন যে, মৃত্যু তাঁর কাছে কষ্টের ছিল না। তাই এভাবে জীবনের অন্তিম লগ্নে অবিচল থেকে নির্ভয়ে পরম পিতার আহ্বানের জন্য অপেক্ষা করেছেন। তিনি তাঁর সহধর্মিণীকে শুনিয়েছেন, 'হয়তো তিনি সংসারের পাপ-পঙ্কিল কর্মফল থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে চান আমাকে। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ দু-হাত বাড়িয়ে কোলে নিতে এসেছেন।'
শ্রীশ্রীঠাকুরের দিব্য হাসি দর্শন বিভূতিভূষণকে এতটাই নিশ্চিন্ত করেছে যে অন্তিম সময়েও অনাবিল হাসিতে তাঁর মুখ ভরে উঠেছে। এই ঘটনা তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত ডাক্তারেরও চোখে ধরা পড়েছিল।
তথ্যঋণ-জগবন্দন ১ম খন্ড