ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক— সব জায়গাতেই তৈরি হয়েছে ‘ভাইরাল জ্যোতিষী’দের এক নতুন শ্রেণি। রিলস, শর্টস, লাইভ সেশন— নানা মাধ্যমে তাঁরা ভাগ করছেন তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 30 July 2025 17:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক প্রযুক্তির যুগলবন্দিতে বদলে যাচ্ছে ভারতের জ্যোতিষচর্চার (Astrology) রূপ। এখন আর কোষ্ঠী হাতে পুরোহিতের ঘরে নয়, রাশিফল (Horoscope) মিলছে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করেই! ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের (Digital Platform) কল্যাণে শহর থেকে মফস্বল, এমনকি বিদেশেও বসে অনলাইনেই পাওয়া যাচ্ছে ‘জন্মকুণ্ডলী বিশ্লেষণ’ থেকে শুরু করে বাস্তু পরামর্শ— সব কিছু। আর এই প্রবণতাই জন্ম দিয়েছে হাজার কোটি টাকার এক নতুন বাজারের।
অ্যাপেই ভবিষ্যৎ, চ্যাটেই প্রতিকার
বাজারে ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য অ্যাপ— Astrotalk, Guruji, Astroyogi, ClickAstro, আরও কত কী! চ্যাট বা ভিডিও কলে (Video Call) সরাসরি জ্যোতিষীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে এই অ্যাপগুলি। কোনওটা বিনামূল্যে, কোনওটা আবার সাবস্ক্রিপশনের ভিত্তিতে। জন্মতারিখ আর সময় দিলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে কুণ্ডলী, দেওয়া হচ্ছে রত্নপাথরের পরামর্শও। আবার অনেক অ্যাপ থেকেই পুজো-পাঠের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে সংস্থাগুলি।
ইনস্টাগ্রাম রিলসেই জ্যোতিষবার্তা
ইউটিউব, (Youtube) ইনস্টাগ্রাম (Instagram), ফেসবুক (Facebook) — সব জায়গাতেই তৈরি হয়েছে ‘ভাইরাল জ্যোতিষী’দের এক নতুন শ্রেণি। রিলস, শর্টস, লাইভ সেশন— নানা মাধ্যমে তাঁরা ভাগ করছেন তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী। জনপ্রিয়তায় অনেক সময় তাঁরা ছাপিয়ে যাচ্ছেন মূলধারার জ্যোতিষীদেরও।
কে কী দেখছে, জানাচ্ছে সংখ্যাই
এক সমীক্ষা বলছে, ডিজিটাল জ্যোতিষশাস্ত্রের গ্রাহকদের মধ্যে ৫৫% হলেন তরুণ-তরুণী (১৮–৩৫), ৩০% মধ্যবয়স্ক (৩৬–৫০)
১৫% বয়স্ক জনগোষ্ঠী। তাঁদের মূল আকর্ষণ— দ্রুত অ্যাক্সেস, গোপনীয়তা, পছন্দসই পরিষেবা আর আধুনিক ইন্টারফেস। শহরের ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচাতে এটাই তাঁদের ভরসা।
তবে সমস্যা? কম নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেমন সুবিধা, তেমনই বিপদও আছে।
সুবিধা
— যেকোনও সময়, যেকোনও জায়গা থেকে পরিষেবা
— গোপনীয়তা বজায় রেখে পরামর্শ
— বিভিন্ন জ্যোতিষীকে এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া
— অনেক ক্ষেত্রেই খরচও কম
চ্যালেঞ্জ
— প্রতারক জ্যোতিষীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে
— প্ল্যাটফর্মে কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই
— ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
— অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে মানসিক সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
প্রখ্যাত জ্যোতিষী পণ্ডিত রামকৃষ্ণ শাস্ত্রী বলছেন, “এটা এক নতুন দিগন্ত ঠিকই, কিন্তু জ্যোতিষচর্চায় শৃঙ্খলা না থাকলে সমাজেই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
সমাজবিজ্ঞানী অনিতা বসুর মতে, “মানুষ দিশেহারা হয়ে বিশ্বাস খুঁজছে। কিন্তু প্রযুক্তি যখন হাতিয়ার হয়, তখন তা সচেতনভাবে না ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে বাধ্য।”
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি, “জন্মতারিখ, সময়, ব্যক্তিগত প্রশ্ন— এসবই অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য। যেকোনও সময় তা হ্যাক বা বিক্রি হতে পারে।”
সরকারি নজরদারি কই
এই বিশাল অনলাইন জ্যোতিষ বাজারে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের তরফে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা নেই। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলির দাবি— জরুরি ভিত্তিতে এই ক্ষেত্রকে একটি ‘রেগুলেটেড ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
আগামীর দিশা কী
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং (ML)-এর সাহায্যে আগামী দিনে আরও ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ আর নিখুঁত পূর্বাভাস মিলতে পারে বলেই মনে করছেন প্রযুক্তিবিদরা। কিন্তু তার সঙ্গে দরকার নৈতিকতা, তথ্যের নিরাপত্তা আর সরকারি নজরদারি।
শেষ কথা
ডিজিটাল জ্যোতিষ একদিকে যেমন প্রাচীন সংস্কৃতির আধুনিক রূপান্তর, তেমনই এটি এক বিশাল ব্যবসা। আর এই ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন লাখ লাখ মানুষের বিশ্বাস। তাই এই বিশ্বাস যাতে ভাঙা না-যায়, সেই দায় প্রযুক্তি যেমন নেবে, তেমনই নেবে সমাজও।
'দ্য ওয়াল' এই বিষয়বস্তুর প্রচারক নয়; এটি কেবল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।