যা আশঙ্কা করা গিয়েছিল, ঠিক তাই ঘটল।
সোমবার দুপুরে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর আশা প্রকাশ করেছিলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর বাদে আফগানিস্তানে শান্তি ফিরতে চলেছে। সেই শুনে অনেকেই বলেছিলেন, তালিবান কি কখনও শান্তির পথে ফিরতে পারে। একটু বেলা গড়াতেই বোঝা গেল, তাঁদের আশঙ্কাই সত্যি। খবর এল, আফগানিস্তানের পূর্বদিকে খোস্ত প্রদেশে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
সন্ধ্যা নাগাদ জানা গেল, তালিবানের মুখপাত্র জাবিউল্লা মুজাহিদ বিদেশি সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, আফগান সরকারের সঙ্গে আমাদের আংশিক যুদ্ধবিরতির যে চুক্তি হয়েছিল, তা শেষ করা হচ্ছে। আমরা যোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়েছি, পুরোদমে আফগান সরকারের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
গত রবিবারই কাতারের রাজধানী দোহায় তালিবানের সঙ্গে আমেরিকার শান্তি চুক্তি হয়। তার দিন দু'য়েকের মধ্যে পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধযাত্রা করছে তালিবান। তবে আমেরিকাদের তারা কিছু বলবে না। তাদের টার্গেট কেবল আফগান সৈনিকরা। তারা চায়, আফগানিস্তানের জেলে যে পাঁচ হাজার তালিবান যোদ্ধা বন্দি আছে, তাদের এখনই ছেড়ে দেওয়া হোক। তাদের হাতেও সরকারের এক হাজার সেনা বন্দি। তালিবান যোদ্ধারা মুক্তি পেলে তাদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বেঁকে বসেছেন প্রেসিডেন্ট আশরফ গনি।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, তালিবান বাহিনীর যে সৈনিকরা জেলে আছে, তাদের বেশিরভাগ কট্টর জঙ্গি। অতীতে তারা নানা হিংসাত্মক কাজে যুক্ত ছিল। এই সব লোককে ছেড়ে দিলে সমূহ বিপদ। তারা দেশে শান্তিভঙ্গ করবে।
কিন্তু তাদের আটকে রাখলেও যে আফগানিস্তানে শান্তি ফিরবে, এমনটাও মনে হচ্ছে না। তালিবান স্পষ্ট করে দিয়েছে, সোমবারের বিস্ফোরণ সূচনামাত্র। আরও রক্তক্ষয়ী হামলা আসন্ন। যতদিন দেশে মার্কিন সেনা ছিল, ততদিন তারা একটু সংযত থাকত। অবশ্য চোরাগোপ্তা হামলা, বিস্ফোরণ চালিয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থির করেছেন, আর একজন মার্কিন সেনাও আফগানিস্তানে রাখবেন না। এবার তালিবানকে পায় কে?
ট্রাম্প বরাবরই আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরোধী। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে, ২০১৫ সালে সিএনএনকে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমরা আফগানিস্তানের ব্যাপারে জড়িয়ে গিয়ে বিরাট ভুল করেছি। সেই ভুলের জের টেনে চলার মানে হয় না।
যুদ্ধ শুরু করা সোজা, শেষ করা তত সোজা নয়। ট্রাম্পের মনে যাই থাক, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
২০০১ সালে নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারে আত্মঘাতী হামলার পরে আমেরিকা ঘোষণা করেছিল, তালিবানকে শেষ করে দেব। বাস্তবে ১৯ বছর যুদ্ধ করেও সফল হয়নি। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বিশ হাজারের বেশি। যুদ্ধ চালাতে আমেরিকার খরচ হয়েছে ৯৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রায় ৭ লক্ষ ১৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। কিন্তু এখন করোনাভাইরাসের জন্য বিশ্ব জুড়ে আর একটি আর্থিক মন্দা ঘনিয়ে আসছে। এই অবস্থায় যুদ্ধের খরচ চালাতে গেলে আমেরিকা ফতুর হয়ে যাবে। তার প্রভাব পড়বে নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। তাই তড়িঘড়ি ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে সরে আসছেন।
এর ফলে আপাতত সবচেয়ে বিপদে পড়লেন আশরফ গনি। এর পরে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলিও সম্ভবত বিপদে পড়বে। বস্তুত তালিবানের উত্থানে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ তারা প্রতিবেশী দেশগুলিতে জেহাদিদের সাহায্য করবে। আমাদের দেশে কাশ্মীরে ও অন্যত্র যারা জঙ্গি হানা চালিয়ে যেতে চায়, তালিবান তাদেরও অস্ত্রশস্ত্র, বিস্ফোরক ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেবে।
দ্বিতীয়ত, তালিবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনীর অনেকে তালিবানকে সাহায্য করে থাকেন। তাঁরাও সুযোগ বুঝে তালিবানকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাইবেন।
এর ওপরে আছে চিন। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে তারাও ভারত বিরোধী কার্যকলাপে মদত দেবে। সেক্ষেত্রে তালিবান, পাকিস্তান ও চিন, তিনটি শক্তি মিলে চেষ্টা করবে যাতে ভারতের অভ্যন্তরে গোলমাল পাকিয়ে তোলা যায়।
ভারতীয় সমাজে যত মেরুকরণ হবে, হিন্দু-মুসলিম তিক্ততা বাড়বে, তত সুবিধা হবে বিদেশি শত্রুদের। ইতিমধ্যে আইএস নামে জঙ্গি গোষ্ঠীটি দিল্লি দাঙ্গার ছবি দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আগামী দিনে তালিবান একই কাজ করলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
এই পরিস্থিতিতে ঘরে বাইরে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জেহাদি হানা ঠেকাতে সীমান্তে পাহারা জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের মধ্যে পরাস্ত করতে হবে বিভেদকামী শক্তিকে। তবে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদের মোকাবিলা করা যাবে।