
শেষ আপডেট: 11 March 2019 12:10
“চোখের জলের হয় না কোনও রঙ, তবু কত রঙের ছবি আছে আঁকা”— এই গানটা বাজত পুজো প্যান্ডেলে তখন যখন আমাদের একটু একটু পাখা গজাচ্ছে, কবিতা-ছবি-গান সবই বেশ বুঝে গেছি এই রকম একটা ধারণা দৃঢ়মূল হয়ে গেঁথে যাচ্ছে মনে। তো, সেই সময়ে, কিশোরকুমারকে মনে হত মাচার গায়ক, ওঁর বাংলা গানগুলোর লিরিককে মনে হত ‘ন্যাকা ন্যাকা’। ‘চোখের জলের হয় না কোনও রঙ’ এই গানটি প্রথম শুনেও আমার ঠিক এই রকম একটি ধারণাই হয়েছিল। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য ভেঙে পড়ে এইসব ভুলভাল ধারণা। আজ বুঝি, কত বড় সত্য লুকিয়ে আছে এই কথাগুলোর মধ্যে; বুঝি যে, কিশোরকুমারের ঈষৎ নির্লিপ্ত অনায়াস গায়কি কীভাবে ছুঁয়ে দিয়েছে সেই সত্যের অঙ্গবস্ত্র।
#
সত্যিই, রঙহীন চোখের জলের মধ্যে লুকোনো থাকে কতই না রঙ, কতই না সংবেদ, কতই না অভিজ্ঞান! অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে আজ মনে হয় আমিও তো বর্ণহীন অশ্রুর স্তরে স্তরে কত বিচিত্র রঙের ছবিই না আঁকা থাকতে দেখেছি! এর মধ্যে দু’একটি অশ্রুপাতের ছবি একেবারে গেঁথে গেছে মনের মধ্যে। বাবার মৃতদেহ নিয়ে মধ্যরাত্রে বাড়ি ঢোকার সময় যে আর্তচিৎকার এসেছিল মায়ের কণ্ঠ চিরে, সেই চিৎকার আর মাত্র চুয়াল্লিশ বছরের এক নারীর দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারে ঝরতে থাকা অশ্রু আজও খ্যাপা ষাঁড়ের মতো আমায় তাড়া করে ফেরে। সেইদিন আমি শান্ত ছিলাম, কিন্তু এখন যখনই মনে পড়ে যায় ওই দৃশ্য, আমি শুনতে পাই সেই বুক ফাটা কান্না; কাজ ভুলে যাই, পথ হারাই, হিসেবের জীবনে ফিরে আসতে
সময় লাগে। তবে দু’একবার এভাবে ভবিষ্যতে নয়, অশ্রুপাত আমাকে পতনের বর্তমানেই বিহ্বল আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল। তখন সদ্য এম এ পাশ করে যোগ দিয়েছি বরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে। চলছে এইচ এস পরীক্ষার ইনভিজিলেশন ডিউটি। একদিন আমার ডিউটি পড়ল মেয়েদের একটি ঘরে। গুটিকতক মেয়ে, আমি তাদের পাহারাদার। আমার সঙ্গে কোনও শিক্ষক সহকর্মী নেই, আছেন এক মহিলা অশিক্ষক সহকর্মী। তিনি সই করতে পারবেন না, কিন্তু আমাকে সঙ্গ দেবেন। তো, সেই সহকর্মী কী একটি কাজে দোতলার সেই ঘরটি থেকে নেমে গেছেন নীচের অফিস-ঘরে। পাহারাদার হিসেবে আমি তখন একা, অরক্ষিত। দেখলাম, একদম সামনের বেঞ্চে বসে দু’টি মেয়ে কথা বলে চলেছে নিরন্তর। প্রায় একই রকম দেখতে দু’টি মেয়ে, মনে হচ্ছিল যমজ। নিষেধ করলাম কথা বলতে। সেকেন্ড কয়েক চুপ। তারপর আবার শুরু হল কথা। চলতেই থাকল গুনগুন। রাগ উঠে গেল মাথায়। কিচ্ছু না বলে ওই দুই ছাত্রীর একজনের খাতা কেড়ে নিলাম। মেয়েটি কিছুই বলল না। চুপচাপ বসে রইল। শুধু চোখ দিয়ে অবিরল ঝরতে লাগল জল। আমি থতমত। কী করব, কী করা উচিত বুঝেই উঠতে পারছিলাম না। এদিকে সময় যেতে লাগল। আমি মনে মনে চাইছিলাম যে, মেয়েটি একবার বলুক, ‘স্যার, খাতাটা দিন’, অমনি, তক্ষুনি, দিয়ে দেব খাতা। কিন্তু, সে মেয়ে কিছুই বলে না। শুধু তার চোখের জলে লাগে জোয়ার। একটি সতেরো-আঠেরো বছরের মেয়ের অশ্রুর যে এই রকম শক্তি থাকতে পারে, বুঝতেই পারিনি আগে। কোথায় আমি তার খাতা একটুখানিকের জন্য কেড়ে নিয়ে, তাকে জব্দ করব ভেবেছিলাম, উলটে স্রেফ কেঁদেই সে আমাকে জব্দ করেছিল। সে যাত্রা ওই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন আমার সেই অশিক্ষক সহকর্মী।
আরও পড়ুন: ব্লগ: সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…
# চোখের জলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ আমাকে পরেও করতে হয়েছে। যেমন, পৃথিবীর আর সব কিছু আমি সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমার মেয়ের চোখে জল আমি আজও সহ্য করতে পারি না। আজ পর্যন্ত ওকে আমি বকেছি হাতে গুনে দু’তিনবার। তবে ওকে প্রথম বকা দেওয়ার দৃশ্যটি আমি ভুলতে পারি না কিছুতেই। তখন আমি পড়াই ঝাড়গ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজে। থাকি ওই কলেজ সংলগ্ন কোয়াটার্সেই। মেয়ের বয়স তখন মাস আটেক। একদিন সকালে দেখি, আমার বেশ জরুরি কিছু কাগজপত্র টেনে নিয়ে বসে, তিনি মনের সুখে একটি ঢাকনা-ভাঙা কলম নিয়ে তার ওপর আঁকিবুকি কাটছেন। ওই বয়সের শিশুরা ভাষার কতটুকু বোঝে জানি না, কিন্তু যেই মৃদু একটা ধমক দিয়ে তাকে বলেছি, ‘কী হচ্ছে কী’, ব্যাস, অমনি তার কলম থেমে যায়, গুম মেরে বসে থাকে সে, নড়েও না, চড়েও না, আর কয়েক সেকেন্ড পরে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা মুক্তোর দানা। সেই দুর্লভ মুক্তোর দানাটি নিয়ে আমি তখন কী করি বুঝেই উঠতে পারছি না! আমার ওপর সে আমার মেয়ের প্রথম অভিমান— সে তো এক অতিজাগতিক অনুভূতি, এক অমূল্য প্রাপ্তি। কিন্তু, অন্যদিকে আবার আমারই এক ধমকে জন্ম নিয়েছে ওই স্বচ্ছ মুক্তো— তাই ঠিক কী উপায়ে যে আদর করব ওই কোহিনূরের— বুঝেই উঠতে পারছিলাম না। শেষমেশ, কষ্ট আর আনন্দের এক যুগ্ম অনুভূতিতে সে অভিমানকে আমি বরণ করেছিলাম। সে মুক্তোর দানাটিকে করপুটে নিয়ে, তুলে রেখেছিলাম স্মৃতির সিন্দুকে। মাঝে মাঝে আজ সস্তা ন্যাকামোর উল্টোদিকে সে মুক্তোটিকে রাখি, নেড়েচেড়ে দেখি, পবিত্রতায় অবগাহন করি।