গৌরীদি বলতেন 'কবিতার প্রতি নিবিড় অনুরাগ আর কাব্যবোধ ছাড়া আবৃত্তি হয় না'
শোভনসুন্দর বসু
২০১৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিনে, সকালে অয়নের ফোন– গত মধ্য রাত্রে বাড়িতে হামলা। সরস্বতী
পুজোর ভাসান পরবর্তী ঝামেলা। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম, গৌরীদি তখন আতঙ্কিত অবস্থায়
শেষ আপডেট: 27 August 2021 03:57
শোভনসুন্দর বসু
২০১৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিনে, সকালে অয়নের ফোন– গত মধ্য রাত্রে বাড়িতে হামলা। সরস্বতী
পুজোর ভাসান পরবর্তী ঝামেলা। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম, গৌরীদি তখন আতঙ্কিত অবস্থায় এক সাংবাদিককে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই অবস্থাতেও তাঁর কথার মধ্যে প্রতিটি শব্দের ও বর্ণের উচ্চারণ
স্পষ্ট। আমি অবাক হয়ে শুনছি ওই আশ্চর্য প্রতিভাময়ীর উচ্চারণ ও অভিব্যক্তি।
কাট টু ১৯৯৪ সাল। আমি তখন ছাত্র। দিল্লির পুজোতে অনুষ্ঠান করতে গেছি এক অগ্রজ আবৃত্তিশিল্পীর সঙ্গে। সেখানে গিয়ে দেখি, গৌরীদি আর পার্থদাও নিমন্ত্রিত সেই অনুষ্ঠানে। বঙ্গভবনে পাশাপাশি ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। একদিন হঠাৎ শুনি গৌরীদি খুব উত্তেজিত হয়ে কাকে যেন বকাবকি করছেন অনুষ্ঠান সম্পর্কীত কোনও ত্রুটির জন্য। সেখানেও আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম– ওই রাগারাগির মধ্যেও তাঁর কণ্ঠ থেকে হীরকদ্যুতির মতো উচ্চারণ নির্গত হচ্ছে। সেবার আমরা সাতদিন ছিলাম দিল্লিতে। মায়ের মতো স্নেহ দিয়ে তিনি আগলে রেখেছিলেন আমাদের।
ছোটোবেলা থেকে রেডিওতে গৌরীদির ঘোষণা ও আবৃত্তি শুনে বড় হয়েছি। ১৯৬৪ সালের পয়লা জুন থেকে আপামর বঙ্গবাসী বেতারে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে শুরু করে এবং মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়।
আমাদের মেদিনীপুর শহরে, মহুয়া সিনেমাহলে, তখন প্রায় রবিবারে বিভিন্ন শিল্পীদের অনুষ্ঠান হত। সেখানেই প্রথম ওঁর কণ্ঠে 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ' শুনি আমি। 'সাধারণ মেয়ে'ও সেখানেই শুনেছি। প্রতিভা বসুর লেখা থেকে দূরভাষিণী, নবনীতা দেবসেনের জীবনবৃত্ত– আবৃত্তি ও দ্বৈতপাঠ শুনে আপ্লুত হয়েছি। প্রতিভা বসুর আর একটি গল্প থেকে শ্রুতিনাট্যরূপে পাঠের মাঝে তাঁর কিন্নর কণ্ঠে ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না’ গানের কয়েক ছত্র শোনার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। একজন আবৃত্তিশিল্পীর গলায় স্পষ্ট ও শীলিত অভিব্যক্তিতে রবীন্দ্রনাথের এই গান যে কতখানি প্রাণ পেতে পারে– তা গৌরীদির কণ্ঠে না শুনলে জানা মুশকিল ছিল। পরবর্তীতে গানের এই গায়নরীতি আমি আর কোথাও শুনিনি। বেশ কিছুদিন পর, 'প্রেম' নামের একটি ক্যাসেটে গৌরীদির কণ্ঠে অতুলপ্রসাদের গান শুনেছি। সেই গানের দ্যোতনাও অসামান্য। এখনও আমার কানে তা যেন সাউন্ড-চিপের মতো লেগে আছে।
গৌরীদির কাছে শুনেছিলাম, তাঁর মা হেমলতা মজুমদারের কাছ থেকেই তিনি কবিতা-চর্চার অনুপ্রেরণা পান। শিশুকালে মা তাঁকে ঘুম পাড়াতেন মীর মোসাররফ হোসেনের সম্পূর্ণ ‘বিষাদসিন্ধু’ শোনাতে শোনাতে। জসীমউদ্দিনের ‘কবর’ও তিনি মায়ের মুখেই শুনেছিলেন প্রথম। বহুবার নানা কথোপকথনে গৌরীদির মুখে শুনেছি, আবৃত্তি শিল্পকে কেবল শিক্ষার মধ্যে দিয়ে অর্জন করা অসম্ভব। কবিতার প্রতি নিবিড় অনুরাগ এবং কাব্যবোধ আবৃত্তির জন্য সবচেয়ে জরুরি। কবিতার প্রকরণগত সমস্ত দিক আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে শিক্ষক শশিভূষণ দাশগুপ্ত, সুকুমার সেন, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, আশুতোষ ভট্টাচার্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রভাব তাঁর জীবনে প্রবল। বাংলা সাহিত্যের ছন্দ, কবিতার অন্তর, কবিতার ভাষা, তার ইঙ্গিত ও ইশারা রপ্ত করেছিলেন তিনি এই শিক্ষকদের কাছ থেকেই।
গৌরীদি জানতেন কবিতার মধ্যে বেঁচে থাকা যায়। জীবনে কবিতার মৃত্যু নেই। জীবনের রসের সন্ধান তাঁকে বরাবর দিয়ে এসেছে কবিতা। সত্তরোর্ধ বয়সেও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন স্বামী ও প্রবাদপ্রতিম আবৃত্তিশিল্পী পার্থ ঘোষ। আধুনিক কবিতা বাদে জীবনানন্দ দাসের কবিতা পড়ার মধ্যে গৌরীদি এক অসাধারণ মাদকতা রচনা করতেন। তিনি এও মনে করতেন, আবৃত্তিকার একটি কবিতার সফল আবৃত্তিরূপ দিতে পারলেন কিনা তা বিচার করতে পারেন কেবল শ্রোতা। তিনি বলতেন বাংলা শব্দের উচ্চারণ এমন হবে যা শুনে বানানটা ঠিক করে নিতে পারে শ্রোতারা। র, ড়, ঢ় এর উচ্চারণের যে ধ্বনিগত পার্থক্য তা শিখতে হয় গৌরীদির কাছে। সংস্কৃত শব্দের বা S/SH স্পষ্টতা বাংলা ভাষার দৃষ্টান্ত হয়ে রইল ওঁর উচ্চারণে। ওঁর মাইক্রোফোনের ব্যবহারও ছিল শেখার মতো। তখন এত উন্নত প্রযুক্তি ছিলোনা, কিন্ত রেডিও-তে ঘোষণা ও মঞ্চের আবৃত্তিতে মাইক্রোফোন যে একইভাবে ব্যবহৃত হয়না, মানে condenser এবং dynamic মাইক্রোফোন ব্যবহারের কৌশল, সেও শিক্ষনীয় ছিল তাঁর পরিবেশনে।
লেখক এই সময়ের সুবিখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী