অর্ণব মৌলিক
(chatteravik@gmail.com)
দেখতে দেখতে চেনা পরিবেশ আর চারপাশটা খুব দ্রুত পালটে গেল। পৃথিবী যে পাল্টাচ্ছে সে খবর যখন পাচ্ছিলাম, তখনও পর্যন্ত আমাদের চারপাশ স্বাভাবিক ছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল। কিন্তু আশাও ছিল, ভারতে কিছু হবে না। এদিকে ওই মারণ ভাইরাস এসে পৌঁছবে না। সংবাদপত্র, ইন্টারনেটে চিন, ইতালির খবর পাচ্ছিলাম। লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন; এসব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলাম। ইতালির খবরে একটু ভয় লাগতে লাগল। চিন্তা হল। চিন থেকে এত দূরে এত কম জনসংখ্যা এবং ভারতের চেয়ে সব দিক থেকে এগিয়ে থাকা একটা দেশে যেভাবে এই মারণ ভাইরাস তার কামড় বসিয়েছে, তাতে এই একমৈা ত্রিশ কোটির এই দেশে, যেখানে প্রতি পদে শুধু রাজনীতি আর ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, যেখানে মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না, সেখানে কী হতে পারে এই ভেবে শিহরিত হচ্ছিলাম। তবুও মনে হচ্ছিল ভারতে মনে হয় কিছু হবে না।
কিন্তু আশংকা সত্যি হল। চিন থেকে আসা একটি মেয়ে কেরলের, করোনা আক্রান্ত হলেন। তারপর দিল্লি থেকেও খবর আসতে লাগল। ইতিমধ্যে আমাদের এখানেও মানুষ নড়েচড়ে বসেছে। নড়েচড়ে, অর্থাৎ হঠাৎ করে ওষুধের দোকান থেকে স্যানিটাইজার উধাও হতে শুরু করল। মানুষ মাস্ক খুঁজছে। যা হোক একটা। এবং ব্যবসায়ীরা তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে শুরু করে দিলেন।
দিল্লি এবং পাশের রাজ্য ওড়িশার স্কুলগুলোতে ছুটি হয়ে গেল খবর পেলাম। এরপর পরপর এবং দ্রুত সব পাল্টাতে শুরু করল।
১৪ মার্চ: সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল। বিকালে স্কুল থেকে ফেরার সময়ই খবরটা পেলাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৩১ মার্চ পর্যন্ত সমস্ত স্কুল, কলেজ সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। ভয় হল। এই প্রথম ছুটিতে কোনও আনন্দ হল না। কেন জানি না, মনে হল সামনের দিন ভাল না। পরদিন বা দিন-দুয়েক পরে খবর পেলাম কোর্টও বন্ধ হয়ে গেল। যেহেতু বাড়ি থেকে দূরে থাকি, তাই বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল।
১৭ মার্চ: দমদমে দেখলাম তখনও মোটামুটি সব স্বাভাবিক। পার্থক্য বলতে কিছু মানুষ মুখে রুমাল বা যেকোনও একটা মাস্ক বাঁধছে। কিন্তু বেশিরভাগই না। আর ভিড়টা মনে হয় একটু কম। বাড়ি এলাম। কিন্তু মন ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছিল দু’-একদিনের মধ্যে সব বন্ধ হবে।
১৯ মার্চ (?): খবরটা পড়ে চমকে উঠলাম। বাংলার এক উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তান প্রথম এই ভাইরাস লন্ডন থেকে বয়ে রাজ্যে নিয়ে এল এবং খুব সম্ভব তার দ্বারা অনেকে সংক্রমিত। এবং সত্যি যেটা মনে হল, এবার খুলে গেল নরকের দ্বার!
২১ মার্চ: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরের দিন অর্থাৎ ২২ তারিখ ‘জনতা কার্ফু’ ঘোষণা করলেন প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে। এবং পরবর্তী ঘোষণায় দেশজুড়ে শুরু হল লকডাউন। অর্থাৎ সব বন্ধ! সব! বাস, লরি, ট্রেন, সমস্ত কিছুর চাকা রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল। ক্রমে বন্ধ হল আন্তর্জাতিক ও আন্ত্যঃরাজ্য বিমান, বাস ও রেল যোগাযোগ। সব দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, সিনেমা হল, মন্দির, মসজিদ, গির্জা সব বন্ধ হয়ে গেল। ভ্যাটিকান সিটি ফাঁকা। তারাপীঠ, পুরীর জগন্নাথ ধাম বন্ধ। মক্কার কাবাঘর বন্ধ। মানব ইতিহাসে এই প্রথমবারের জন্য একসঙ্গে গোটা সভ্যতা থেমে গেল!
কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা দিন। এই ক’দিনে চিন্তায় একটা বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। মন যেন শুধু সংখ্যার হিসেব নিচ্ছে। যাকে কেউ বলছেন পরিসংখ্যান, কেউ ক্রোনোলজি। প্রতিদিন সংখ্যাগুলো পাল্টে যাচ্ছে। সোশাল সাইটে বিভিন্ন জন বারে বারে সেগুলো পোস্ট করছেন। ভাল লাগছে না। একটা ভাল না লাগা গ্রাস করছে। কিন্তু মনখারাপটা তো শুধু নিজেকে বা নিজের পরিবার নিয়ে নয়। সারা পৃথিবীতে যেন মারণযজ্ঞ চলছে। সংখ্যাটা প্রতিমুহূর্তে পাল্টাচ্ছে। খবরের চ্যানেলে হেডলাইন থাকছে; ইতালিতে, আমেরিকায় গত চব্বিশ ঘণ্টায় মৃত এত। এবং সংখ্যাগুলো দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার হচ্ছে।
ভারত গরিব দেশ। অন্তত এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ খুব গরিব। অসংখ্য মানুষ নিজের জেলা বা রাজ্য ছেড়ে ভিনরাজ্যে থাকেন দিনমজুরের কাজে। পরিবারসহ বা ছাড়া। বিশেষ করে আমি নিজেই কর্মসূত্রে এমন এক জেলায় থাকি যেখান থেকে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা সর্বাধিক। যখন দেখছি দেশ লকডাউন হওয়ার জন্য তারা স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ হাজার মাইল পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছেন বাড়ি ফেরার জন্য, অন্তত মৃত্যুটা যাতে বাড়িতে হয় এই আশায়। এবং তাদের মধ্যে বহু, পথেই মৃত্যুকে বরণ করছেন। একজন দেখলাম ভাঙা পা নিয়ে হাঁটার জন্য প্লাস্টার খুলে ফেলছেন। কেউ অসুস্থ স্ত্রীকে কাঁধে বসিয়ে হাঁটছেন, কেউ শুধু জল খেয়ে শত মাইল পার করেছেন। আবার পুলিশের ভয়। সেই ভয়ে রাজপথ ছেড়ে জঙ্গল টপকে, নদী সাঁতরে ফিরছেন। খুব কষ্ট হচ্ছে এদের জন্য। কান্না পাচ্ছে। আর মাথায় জমা হচ্ছে পরিসংখ্যান, ক্রোনোলজি।
আজকে দুপুরে একটা বই পড়তে পড়তে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে কতকগুলো শব্দ মাথায় আঘাত করছে মনে হল। কোয়ারেন্টাইন! আইসোলেশন! আজকে কত তারিখ? কী বার? আমি কোথায় আছি? কোয়ারেন্টাইন! আইসোলেশন! লকডাউন! প্রচণ্ড কষ্টে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। মনে হল, কেউ যেন আমার গলা টিপে ধরেছে। মাথাটা ভারি দুর্বল লাগছে। ছুটে গিয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে দিলাম। জল খেলাম কিছুটা। ছাদে গেলাম। এ ক’দিন এটাই একমাত্র স্থান পরিবর্তনের স্থান।
আমরা ভাল নেই। আগামীতে আরও কত খারাপ থাকব জানি না। দিল্লিতে একটা ধর্মীর জনসমাগম থেকে আরও প্রচুর প্রচুর লোকের মধ্যে এই মারণ ভাইরাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইন্দোরে স্বাস্থ্যপরীক্ষায় যাওয়া চিকিৎসক-নার্সদের ওপর মানুষ ঢিল ছুড়েছে। কোথায় একটা হসপিটাল থেকে কোয়ারেন্টাইনে থাকা লোকজন পালিয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কতজন আক্রান্ত আর মৃত, তা নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে।
আমি ক্রোনোলজি বুঝি না। কিন্তু একটা জিনিস বেশ বুঝতে পারছি, এই পরিসংখ্যানের ভিতর আমি বা আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢুকে যাচ্ছি। আমরা ঢুকে যচ্ছি। আমরাও কি সংখ্যা হয়ে যাব? সামনে কি সেই দিন? কলকাতার এক ঠিকাশ্রমিক বলেছিলেন, ‘আমরা মারা যাব। হয় করোনায়, নয় খিদেতে!’
যুবকেরা নিজ উদ্যোগে সংগৃহীত অর্থ, চাল, খাবার পৌঁছে দিচ্ছে অন্নহীন পরিবারে
সবুজ বিশ্বাস
(sobujalaya@gmail.com)
এখন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার তাড়া নেই। রোজ সকালে পাখিরা জানালায় এসে কিচিরমিচির জুড়ে দেয়। ওদের ঝগড়ায় ঘুম ভাঙে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবি এমন সুখের সময় আর কখন ছিল। মায়ের কোলে। তারপর তো চার বছরেই স্কুলে, টিউশনি। বড় হয়ে বাজারের থলে হাতে তড়িঘড়ি বাজার সেরে কাজে যাওয়ার তাড়া। এখন তো সেসব নেই। বাবুর মতো ন’টায় বিছানা ছেড়ে, চায়ের কাপ নিয়ে বসা।
এতদিন সহধর্মিণীর হাতের চায়ে নাক সিঁটকানো যে মোটেও ঠিক হয়নি, তা টের পেলাম প্রথম চা বানাতে গিয়ে। প্রথমদিন কিন্তু ওভেনের নব-টা উল্টোদিকে ঘুরিয়েছিলাম। নব-টাকে একবার এদিক একবার ওদিক করছিলাম। প্রথম চা বানিয়ে বিশ্বাস করতেই পারছিলাম না যে, আমি এত খারাপ চা বানাতে পারি। দু’চুমুক দিয়েই বাইরে এসে চুপ করে চা-টা ফেলে দিয়েছিলাম। বউকে ঘুনাক্ষরেও টের পেতে দিইনি। তবে হ্যাঁ, এই ফাঁকে চা বানানোটা মোটামুটি রপ্ত করে ফেলেছি। এখন ওকেও চা বানিয়ে দিচ্ছি। বাকি সময় ঘরের জানালার লোহার গ্রিল, দরজা, ঘরের কার্নিশে জমে থাকা আবর্জনা, দেওয়ালের ফাটলে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা বট-পাকুড়ের গাছ কেটে, টিউবওয়েল চাতালে জমে থাকা শ্যাওলা থেকে ঘরের ঝুল ছাড়া সবই পরিষ্কার করছি।
আমি একটি জরুরি পরিষেবায় কাজ করি। বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে বেরোতেই হয়। গ্রামে মানুষজন দেখা যায়, মাঠে কৃষক চাষ করে, গরু ছাগল ও মোষ চরে। লেখাপড়া জানা মানুষ ঘরে থাকেন। তবে নিঝুম শহর। মানুষজন নেই। যেন, কতকালের পুরনো ঘরবাড়ি ইতিহাস বহন করছে। এখন কোলাহল, গাড়ির হর্ন ও যানবাহনের শব্দ পাখির কলতানে চাপা পড়ে গিয়েছে। তবে, ভাইরাসের ভয়ে ঘরবন্দির মধ্যে একদল যুবক ছোট ছোট দলবেঁধে নিজ উদ্যোগে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে অর্থ, চাল, খাবার সংগ্রহ করে পৌঁছে দিচ্ছে অন্নহীন পরিবারের হাতে। এটা তো আশার ছবি। সময় করে তাদের সঙ্গ দিই।
বাকি সময় রঙপেন্সিল নিয়ে সাড়ে তিন বছরের মেয়ের সঙ্গে ছবি আঁকতে বসছি। মেয়েকে ট্যারাব্যাঁকা হাতে আম, কলা, পাখি ও পাহাড় এঁকে দিই। ও আমার আঁকা নেয় না। সে নিজে নিজে রঙ নিয়ে রঙিন স্বপ্ন গড়ে। আমি ওর আগামীর রঙিন দিনটা বসে দেখি।