
লোকসভা নির্বাচন ২০২৪
শেষ আপডেট: 3 June 2024 15:12
দেবাশিস মিথিয়া
ভারতের ১৮ তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে গত ১ জুন। যা শুরু হয়েছিল ১৯ এপ্রিল। তার আগে রাজনৈতিক প্রচারে, মিছিলে, জনসভায় রীতিমতো সরগরম ছিল গোটা দেশ। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব – নির্বাচন, যত এগিয়েছে উত্তেজনার পারদ ততই বেড়েছে। সাত দফার নির্বাচনে এক এক দফা ভোট মিটেছে আর রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্ক কষেছে, নতুন নতুন স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে নির্বাচন পরিচালনা করেছে।
যে কোনও লড়াইয়ে যেমন জয় পরাজয় থাকে লোকসভা নির্বাচনেও তাই। যে দলের জয়ী সাংসদের সংখ্যা ৫১% বা তার বেশি হবে তারাই সরকার গড়বে। নচেৎ তাদের জায়গা হবে বিরোধী বেঞ্চে। সরকার গড়ার লক্ষ্যেই সবাই লড়াই করেছে। লড়াই জিততে রাজনৈতিক দলগুলি ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ বা ‘ইলেকশন ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহার আসলে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতিপত্র। কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে দেশের মানুষের জন্য আগামী দিনে তারা কী কী করবে সেটাই বলা থাকে ইশতেহারে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকার-সমস্যার সমাধান, কৃষি ও কৃষকের উন্নতি, স্বনির্ভরতার মধ্যে দিয়ে মহিলাদের ক্ষমতায়ন, শিল্প উন্নয়ন ও জিডিপি-র বৃদ্ধি - কমবেশি এইসব প্রতিশ্রুতিই থাকে নির্বাচনী ইশতেহারে। এছাড়াও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা থাকে। উল্লেখ থাকে বৈদেশিক নীতি কী হবে, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দল ক্ষমতায় আসীন হলে কী পদক্ষেপ নেবে। যেহেতু নির্বাচনী ইশতেহার আমজনতার ঘরে ঘরে পৌঁছায় না, তায় দেশের বেশির ভাগ মানুষ ভালো করে পড়তে জানেন না- তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের প্রার্থীকে জেতাতে সেগুলিকে জনসভা থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। জনগণ সেই কথাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা খুঁজবে দলগুলির প্রশাসনিক কাজের মধ্যে থেকে। মিলিয়ে দেখবেন সরকার চালাতে গিয়ে (রাজ্য বা কেন্দ্র) দলগুলো তাদের আগের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে কিনা ।
অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের তুলনা করলে বোঝা যায় এখানে গণতন্ত্র কতটা দামি! এবারে নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ত্রিমুখী লড়াই হল। যদিও মেনস্ট্রিম মিডিয়া এবং অন্য ধারার মিডিয়ার একটা অংশ প্রচার করেছে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি ও রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেই লড়াই হচ্ছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই এটা সত্যি তাহলে বলতে হয় দুই দলের কাছেই সুযোগ ছিল কাজের মাধ্যমে মানুষের কাছে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করার। যা দেখে মানুষ তাদের ভোট দেবেন বা যা দেখিয়ে তারা ভোট চাইবেন।
কী দেখা গেল? কোথাও ভোটের আগেই খুন জখম করে এলাকাকে সন্ত্রস্ত করা হয়েছে, কোথাও ভোটের দিন পাড়ার মধ্যেই ভোটারদের আটকে রেখে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি, কোথাও বিরোধী পক্ষের নির্বাচনী এজেন্টকে বের করে দিয়ে ছাপ্পা মারা চলছে। বুথের ভিতরের ওয়েব কাস্টিং – এর ক্যামেরা ঘুরিয়ে দিয়ে নিজেদের মতো করে ভোট করার প্রবণতা চোখে পড়েছে। সমস্ত অভিযোগের তীর শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। ভোটের দিনের এই বেনিয়মের খানিকটা বিরোধী পার্টির প্রার্থীরা দৌড়াদৌড়ি করে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ বারের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন স্ট্র্যাটেজি - বিরোধী প্রার্থীদের গতিবিধিকে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে দেওয়া। সে কাজে তারা ১০০% সফল। ফল দাঁড়ালো, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারলেন না। বলা ভাল দিতে দেওয়া হল না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” প্রশ্ন হল, ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলি কেন মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? গণতন্ত্রে মানুষই তো সব। তারাই তো শেষ কথা বলবেন। এর একটাই উত্তর, শাসক দলগুলির নিজেদের কাজের প্রতিই কোনও আস্থা নেই। এমন কোনও কাজ তারা করেনি যা দেখিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়, ভোট বৈতরণী পার হওয়া যায়।
গোটা নির্বাচন পরিচালনা করেছে দেশের নির্বাচন কমিশন। এই স্বশাসিত সংস্থা, মানুষকে সচেতন করে ভোটদানে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিয়েছে। সেই বিজ্ঞাপনের ভাষা আশা জাগায়, স্বপ্ন দেখায়- “আমার আছে ভোটশক্তি, ভোট দেবো, দেশ গড়বো।” ভোটারদেরকে উৎসাহ দিতে এস এম এস পাঠিয়ে জানিয়েছে, “আপনার ভোট, আপনার কন্ঠস্বর। নিজের ভোট অবশ্যই দিন।” খবর পাঠিয়েছেন, “প্রিয় ভোটার, ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটদানকেন্দ্রে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছে। গর্বের সঙ্গে নিজের হাতে কালিটি লাগান এবং গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসবের শরিক হয়ে উঠুন।” এ কাজ সম্পূর্ণ করতে গত কয়েকমাস ধরে সাজো সাজো রব। কয়েকশ’ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে এসেছে। লোকের মনে সাহস জোগাতে সেই বাহিনী পাড়ায় পাড়ায় রুট মার্চ করেছে। বিরোধী দলের নেতারাও সেই ভরসাতে বুক বেঁধে জনগণকে বলেছে এবার রাজ্যের শাসকদল কিছু করতে পারবে না। নিশ্চিন্তে ভোট দিন। কিন্তু বাস্তবে অন্য ছবিই ধরা পড়লো। শেষ দফার নির্বাচনে ৯ টি কেন্দ্রে ভোট করাতে ৯৬৭ কোম্পানির কেন্দ্রীয় বাহিনী, ৩৩০০০ পুলিশকে ব্যবহার করেও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে পারল না নির্বাচন কমিশন। শেষ দফার ভোটে তাদের কাছে ২৯৮৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। গোটা ভোট পর্বে সেই সংখ্যা ১০ হাজার ১৩৭টি। নিয়ম ভাঙার সব খেলাই প্রত্যক্ষ করেছে রাজ্যবাসীর সঙ্গে সারা দেশ। সেই নিয়ম ভাঙায় কী নেই? ভোটারের মাথা ফেটেছে, বিরোধী প্রার্থীর গায়ে হাত উঠেছে, ইভিএম জলে পড়েছে, আরও কত কী? বুথের মধ্যে রাজ্য পুলিশ থাকার কথা নয় কিন্তু তাদের অবাধ যাতায়াত করতে দেখা গেছে। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের একটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের ব্যালট ইউনিটে সিপিএম ও বিজেপির চিহ্নের ওপরে কালো টেপ মারা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী সিপিএমের নির্বাচনী এজেন্ট সেজে বুথের ভিতর লোক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের দিন প্রচার আইনত দণ্ডনীয় হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যের শাসকদলের এক কর্মীকে হ্যান্ড মাইক হাতে ভোটের দিন নিজেদের প্রার্থীর সমর্থনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। এ ঘটনা ৫ নম্বর দমদম রোডের। নির্বাচনের প্রার্থী ও তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের বুথে ঢোকার আইনি আধিকার আছে। এবারের নির্বাচনে দেখা গেলো সেই কাজেও তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা বিরোধী প্রার্থীদের বাধা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভরসায় সুষ্ঠ নির্বাচনের আশায় যারা বুক বেঁধেছিলেন ছিলেন আজ তাঁরাই বলছেন বাহিনীর ভূমিকা আশানুরূপ নয়। নির্বাচন বিশ্লেষকদের বক্তব্য ইলেকশনের দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে পরিচালনা করে রাজ্য পুলিশ। তারা ইচ্ছে করেই এই বাহিনীকে সঠিক ব্যবহার করেনি।
আর একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত তা হল নির্বাচনী ব্যয়। নিবার্চনের জন্য বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের বোঝা পরোক্ষে চেপে যায় জনগণের উপর। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন, ব্যয়ের দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ডকে ভেঙে দেবে এরকমই অনুমান। সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ বা সিএমএস-এর সভাপতি এন ভাস্কর রাও ৩৫ বছর ধরে নির্বাচনী খরচ ট্র্যাক করছেন, তাঁর হিসেবে এবারের লোকসভা নির্বাচনের আনুমানিক ব্যয় ১.৩৫ লক্ষ কোটি টাকায় (নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর খরচ মিলিয়ে) গিয়ে ঠেকবে। যা ২০১৯ সালে ৬০০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। নির্বাচনী ব্যয়ের একটা বড় অংশ ভোটারদের উপহার দিতে খরচ হয় যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। ২০১৯ সালে ভোটে খরচের যে হিসেব প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে দেখা গেছে, প্রায় ২০-২৫% টাকা সরাসরি ভোটারদের কাছে গিয়েছিল। বেশিটা খরচ হয়েছিল প্রার্থীদের প্রচারে, তার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০-৩৫%। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রথাগত ব্যয় এবং লজিস্টিকে ব্যয় হয়েছিল যথাক্রমে মোট ব্যয়ের ১৫-২০ % ও ৮-১০ %। বাকিটা বিবিধ খাতে খরচ হয়। ২০২৪ এর হিসেব প্রকাশ পেলে বোঝা যাবে এবারে কোন খাতে কত খরচ হল। তবে নির্বাচনের আনুমানিক ব্যয়কে দেশের মোট ভোটার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে দেখা যাচ্ছে একটা ভোট পোল করাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪০০ টাকা। এত কিছু তো সবই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের জন্য। সেই অধিকার ঠেকিয়ে নিজের পক্ষে ভোট করার পিছনে আর যাই থাক সমাজ সেবার মানসিকতা নেই। আছে ক্ষমতা দখলের লোভ। অর্থ রোজগারের সুপ্ত বাসনা। সংসদের উভয় কক্ষে কোটিপতি-সাংসদের সংখ্যা বৃদ্ধি সেই কথাটাই বলে।
গণতান্ত্রিক অধিকার বার বার ছিনিয়ে নিলে জনগণ একদিন রুখে দাঁড়াবেই। সেই বার্তা দিয়েছেন জয়নগর লোকসভার কুলতলির তথাকথিত পিছিয়ে পড়া মহিলারা। ওই মহিলারা পুলিশ অফিসারের চোখে চোখ রেখে যে ভাবে অভিযোগ করছিলেন, নিজেদের দাবি জানাচ্ছিলেন, সেই শরীরী ভাষাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। অভিযোগ ছিল মেরিগঞ্জ এলাকার বেণীমাধবপুর এফপি স্কুলে ৪০ ও ৪১ নম্বর বুথে সাত সকালেই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দিচ্ছেন। কী দাবি ছিল? তাদের ক্যাম্প ভাঙা হয়েছে সেটা তৈরি করে দিতে হবে, ইভিএম পাল্টাতে হবে, বুথের ভিতরের ওয়েব কাস্টিং এর ক্যামেরা কে বা কারা ঘুরিয়ে দিয়েছে সেটা ঠিক করে দিতে হবে। কোনওটাই অন্যায় দাবি নয়। সবগুলিই গণতন্ত্র বাঁচাতে জরুরি। এঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে তাই এঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শহরের এগিয়ে থাকা সুশীলসমাজ যাঁরা কোনও কিছু ঘটলে অন্যায় বলে পথে নামতেন, যাঁদের কথা বিশ্বাস করে ২০১১ সালে মানুষ রাজ্যে সরকার বদল করেছিলেন; নির্বাচন ঘিরে এই যে চরম অরাজকতা এটা তো গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জার – বিষয়টা তাঁদের কে ভাবাচ্ছে না!! ভাবলে হয়তো শাসকের রোষানলে পড়তে হবে কিছু সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে – তাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে মনে রাখা উচিত ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনও একদিন শেষ হয়েছিল। এরও শেষ হবে কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই যাবে।
মতামত লেখকের নিজস্ব