
রতন টাটা
শেষ আপডেট: 10 October 2024 09:57
সালটা ছিল ২০০৩। সে বছর জুনের মাঝামাঝি মুম্বইয়ের ফ্লোরা ফাউন্টেনের বম্বে হাউসের অফিস থেকে এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিলেন টাটা গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান রতন টাটা। বৃষ্টির জেরে যানজটে থমকে গিয়েছে সামনের রাস্তা। রতন টাটা দেখেন রাস্তায় একটি টু-হুইলারে এক দম্পত্তি ও তাঁদের দুই শিশু সন্তান বৃষ্টিতে ভিজছে। চালক বাদে কারও মাথায় হেলমেট নেই। বৃষ্টিতে মুম্বইয়ের রাস্তা ততদিনে খানাখন্দে ভরে গিয়েছে।
দিনসাতেক পর পর পুণেতে টাটা মোটরর্সের প্ল্যান্টে গিয়ে রতন টাটা সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারদের সেই দম্পতির কথা জানিয়ে বলেন, আমরা কি এমন কোনও চার চাকা বানাতে পারি যা এই ধরনের সাধারণ মধ্যবিত্ত কিনতে পারবেন। সে বছরই জেনেভায় কার ফেস্টিভ্যালে তিনি ন্যানো গাড়ির মডেল পেশ করে জানান, ভারতীয়রা মাত্র এক লাখ টাকায় এই গাড়ি কিনতে পারবেন।
পুণের কারখানায় মডেল ন্যানো কার তৈরির পর বাজারেও এসে যায়। রতন টাটা ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর রবি কুমার চাইছিলেন, শুধু ন্যানোর জন্য আলাদা একটা প্ল্যান্ট গড়তে। সেই খবর জানাজানি হতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীরা। লড়াইয়ে জিতে যান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। মার্কসবাদী মুখ্যমন্ত্রীর আগ্রহ মুগ্ধ করে রতন টাটাকে। অনেকবার বলেছেন সে কথা। পাহাড়ি রাজ্যে কারখানা গড়লে বাড়তি আর্থিক ছাড় পাওয়া যায় জেনেও রতন টাটা বাংলাকেই তাই বেছে নেন। বাড়তি কারণ ছিল অদূরে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, যে দেশগুলি গাড়ি চড়ে, কিন্তু বানায় না। কলকাতা বন্দরের সুবিধা থাকায় সাগরপথে বাণিজ্যের সুবিধার কথাও তাঁর বিবেচনায় ছিল। টাটা মোটরস তাই বেছে নেয় সিঙ্গুরকে।
কিন্তু সিঙ্গুরে আশিভাগ কারখানা হয়েও কেন ব্যর্থ হল ন্যানো প্রকল্প? সেই সময় রাইটার্স বিল্ডিংসের শিল্প ও ভূমি দফতরে আমার নিত্য যাতায়াত। শিল্প নিয়ে তখন খবরের বন্যা বইছে সরকারি মহলে। প্রথম দিন থেকেই টাটাদের কারখানা সংক্রান্ত খবরাখবর রাখছিলাম। আমার মতে সিঙ্গুর ব্যর্থ হওয়ার একাধিক কারণের একটি অবশ্যই রতন টাটার ভুল। অনেক ভুল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের। এছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপস না করা মনোভাব তো ছিলই।
শিল্প ক্ষেত্রে টাটাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অন্য কোম্পানিগুলির থেকে বরাবর বেশি। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম, সিঙ্গুরের কারখানায় কত লোকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাকরি হবে, অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন আসবে, এসব বিষয়ে টাটারা গোড়াতেই নমো নমো করে দু-চার কথা বলে মুখ বন্ধ করে ফেলে। তাঁদের জনসংযোগ সেল তেমন একটা সক্রিয় ছিল না। কারখানার গুরুত্ব বোঝানোর দায়িত্ব তারা রাজ্য সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়। আসলে ততদিনে ভারতের শিল্পমহলে এই ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছে, কারখানা গড়ে তারা দেশের প্রতি মহান কর্তব্য সাধন করছে। জমি, জল, বিদ্যুৎ তাদের সস্তায় দেওয়া এবং সব কিছুর ব্যবস্থা করা সরকারের কাজ।
ফলে শিল্পায়ন, সিঙ্গুরের কারখানা নিয়ে যাবতীয় প্রচার এবং কৃতিত্ব দাবি করতে থাকে সিপিএম। পশ্চিমবভঙ্গের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত রাজ্যে শাসক দলের কথা সব মানুষ বিশ্বাস না-ই করতে পারে। করেওনি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২৩৫ আসনে জিতে ক্ষমতায় টিকে গেলেও বামফ্রন্ট ভোট পেয়েছিল ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ মানুষ বামফ্রন্টকে চায়নি। চায়নি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আবার মুখ্যমন্ত্রী হন। টাটাদের কারখানার জন্য তারা সিপিএমের কথায় জমি না দিলে দোষারোপ করার অবকাশ নেই। তার উপর ২০০৬-এর ভোটে লালঝড়ের মুখেও সিঙ্গুরে জিতেছিল তৃণমূল।
আমার ধারণা, সিপিএম এবং রাজ্য সরকারের হাতে সবটা ছেড়ে না দিয়ে টাটা গোষ্ঠী নিজেরা কারখানা নিয়ে আরও আন্তরিকভাবে নিজেদের কথা বললে হয়তো অনেক মানুষ জমি দিতে আগ্রহী হতেন কিংবা এত মানুষ আপত্তি করতেন না।
আন্দোলনের একটা পর্বে এসে তৃণমূল সিঙ্গুরে আশি ভাগ হয়ে যাওয়া কারখানা ঘিরে বসে পড়েছিল। অবরোধ তুলতে গেলে শত শত মানুষকে গুলি করে মারতে হত। স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মচলায় তাঁর ঐতিহাসিক অনশন কর্মসূচি শেষ করে সিঙ্গুরে ধরনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও ‘অবরোধ’ তৃণমূলের কর্মসূচিতে ছিল না। দিনটির কথা আমার বেশ মনে আছে। ২০০৮-এর অগাস্টের এক বিকালে রাইটার্সে আসেন তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং পূর্ণেন্দু বসু। পার্থ তখন বিরোধী দলনেতা, যিনি শিক্ষামন্ত্রী হয়ে স্কুলের চাকরি বিক্রির দুর্নীতি করে এখন জেলে।
বুদ্ধদেববাবু এবং শিল্পপতি নিরুপম সেনের সঙ্গে বৈঠকে পার্থ-পূর্ণেন্দুর কথা হয়েছিল, সিঙ্গুরের কারখানা থেকে অনেকটা দূরে হবে তৃণমূলের ধরনা মঞ্চ, যাতে টাটাদের গাড়ি, লোকজন যেতে বাধা তৈরি না হয়। যদিও ওই পরিস্থিতিতে তৃণমূলকে ধরনায় বসতে দিতে নিরুপম সেন একেবারেই রাজি ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন তৃণমূল ধরনায় বসে গেলে তাদের সরানো কঠিন হবে।
কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বিরোধী দলের প্রতিবাদের অধিকার মেনে নিয়ে জেলাশাসক বিনোদ কুমারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কারখানা থেকে অনেকটা দূরে যেন তৃণমূলকে ধরনায় বসার অনুমতি দেওয়া হয়।
তৃণমূল যদিও কথা রাখেনি। তারা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করে কার্যত টাটার কারখানার কাজ বন্ধ করে দেয়। একটা পর্যায় বিরক্ত রতন টাটা কারখানা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
সিঙ্গুর থেকে গুজরাতের সানন্দে গিয়ে কারখানা করলেও ন্যানো গাড়ি কিন্তু বাজারে চলেনি। বহু বছর হল সেটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এক লাখি গাড়ি ভারতবাসীর কেন পছন্দ হল না?
তারও একাধিক কারণ। প্রথমত, গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ভারতবাসীর যে ভাবনা এবং বিবেচনা কাজ করে টাটাদের বিশেষজ্ঞরা সেগুলি বিবেচনায় রাখেননি। পুনের কারখানা থেকে বাজারে আসা ন্যানো গাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার একাধিক ঘটনা জানাজানি হতে সুরক্ষা নিয়ে মানুষ চিন্তিত ছিলেন। গাড়িটির সঙ্গে অটো রিকশর কোনও ফারাক ছিল না। ছোটখাট দুর্ঘটনাতেও চালক-আরোহীর মৃত্যুর বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। তাছাড়া ভারতবাসীর গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ, সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ছাড়াও কাজ করে সামাজিক মর্যাদা। ন্যানো গাড়ি ভারতবাসীকে সেটা দিতে পারেনি।
আসলে রতন টাটা দেশবাসীকে সস্তায় চার চাকার গাড়ি চড়াবেন বলে ন্যানোর নাম রেখেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান পিপলস কার।’ ভারতীয় সমাজে মজ্জাগত একটি ভাবনা হল রেশন থেকে শুরু করে বাজারে যে পণ্যই জনগণের বা অর্ডিনারি পিপলের, সেগুলি তেমন ভরসাযোগ্য নয়। এই ভুল বুঝতে পেরে টাটারা গাড়ির নাম বদলে করে ইন্ডিয়ান স্মার্ট কার। কিন্তু নামে কী আর চরিত্র বদলায়?
ততদিনে ন্যানো গাড়ি নিয়ে মানুষের উৎসাহ উবে গিয়েছে। তাছাড়া টাটারা দু-চাকার গাড়ি বিক্রি করে না বলে গ্রাম-মফস্বলে তাদের কোনও বিপণন কেন্দ্র ছিল না। ফলে লাখ টাকার গাড়ি কিনতেও কয়েক হাজার টাকা খরচ করে মানুষকে শহরে ছুটতে হচ্ছিল। ন্যানো গাড়ি বাজারে না চলার সেটাও একটা কারণ।
রতন টাটা এক মহৎ উদ্দেশ্যে এই গাড়ির স্বপ্ন দেখলেও তা ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। সে কারণে কোম্পানির পরিচালন বোর্ডে তাঁকে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই তাঁকে এই কারণে আরও বেশি করে মনে রাখবে যে তিনি সেই ধনপতি ব্যবসায়ী যিনি আম আদমিকে চার চাকা চড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন।