এটি শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতই (World's largest underwater waterfall) নয়, পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশও বটে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 5 January 2026 13:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফলস বা জলপ্রপাতটি (world's largest waterfall) কোথায়, এই প্রশ্নের উত্তর শুনে অনেকেই চমকে যাবেন। কারণ এই জলপ্রপাত চোখে দেখা যায় না, শোনা যায় না তার গর্জন, এমনকি জলকণার কুয়াশাও তৈরি করে না। অথচ এর উচ্চতা প্রায় ১১,৫০০ ফুট - বিশ্বের যে কোনও দৃশ্যমান জলপ্রপাতের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
এই রহস্যময় জলপ্রপাতটির নাম ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটার্যাক্ট (Denmark Strait Cataract)। এটি রয়েছে আইসল্যান্ড (Iceland) ও গ্রিনল্যান্ডের (Greenland) মাঝখানে, তবে তার পুরো অস্তিত্বটাই কিন্তু সমুদ্রের গভীরে।

পৃথিবীর বাকি জলপ্রপাতগুলির সঙ্গে তুলনা করলে বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়ে বইকি। উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাতের (Niagra Falls) সর্বোচ্চ অংশের উচ্চতা মাত্র ১৮১ ফুট।
Angel Falls in Venezuela
The world's tallest uninterrupted waterfall pic.twitter.com/SicEj0Pwtj— Go Homestays (@GoHomestay) January 4, 2026
ভেনেজুয়েলার অ্যাঞ্জেল ফলস (Angel Falls Venezuela), যা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থলভাগের জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত, তার উচ্চতা ৩,২১২ ফুট। কিন্তু এই দুই জলপ্রপাতই ডেনমার্ক স্ট্রেইটের সামনে যেন নস্যি।
তবু এই বিশাল জলপ্রপাতের কোনও দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। কারণ এটি শুরু হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট নীচে। তাই তার প্রবল শব্দ শোনা যায় না, দেখা যায় না কোনও কুয়াশা বা জলের ধোঁয়া।
কীভাবে তৈরি হল এই অদৃশ্য জলপ্রপাত?
ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটার্যাক্ট আবিষ্কৃত হয় কয়েক দশক আগে। সমুদ্রপথে জলের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। এটি স্থলভাগের জলপ্রপাতের মতো পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা কোনও নদীর জলপ্রবাহ থেকে তৈরি হয়নি।
এই জলপ্রপাত আসলে একটি সাবমেরিন ক্যাসকেড, অর্থাৎ সমুদ্রের নীচে তৈরি হওয়া জলপ্রবাহ। এখানে নর্ডিক সাগর থেকে আসা ঠান্ডা ও বেশি ঘন জল ডেনমার্ক স্ট্রেইট দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে নেমে যায়। এই পতনের সময় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন ঘনমিটার জল নীচের দিকে প্রবাহিত হয়, যা অ্যামাজন নদীর আটলান্টিকে প্রবেশ করা জলের পরিমাণের থেকেও অনেক বেশি।
বরফযুগের স্মৃতি বয়ে আনা ১১,৫০০ ফুটের রিজ
এই বিশাল জলপ্রপাতের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেষ বরফযুগের (Iceage) এক গভীর সম্পর্ক। প্রায় ১৭,৫০০ থেকে ১১,৫০০ বছর আগে, হিমবাহের গতিবিধিতে সমুদ্রের তলায় একটি বিশাল রিজ বা উঁচু অংশ তৈরি হয়। পরবর্তী কালে সেখানে জমে থাকা হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং দীর্ঘদিনের সমুদ্রস্রোত মিলিয়ে এই রিজ আরও শক্ত ও স্থায়ী হয়ে ওঠে।
এই রিজের উপর দিয়েই ঠান্ডা ও ভারী জল প্রবল বেগে নীচে নেমে আসে, তৈরি করে এমন এক জলপ্রপাত - যার বিশালত্ব কল্পনাতীত।
শুধু জলপ্রপাত নয়, এটি পৃথিবীর জলবায়ুর নিয়ন্ত্রকও
ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটার্যাক্ট শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতই নয়, এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার (climate change) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রের বহু নীচে থাকা এই জলপ্রপাত সরাসরি যুক্ত Atlantic Meridional Overturning Circulation (AMOC) প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নর্ডিক সাগরের ঠান্ডা জল আটলান্টিকে পৌঁছয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাপ ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে। এর উপর নির্ভর করেই ইউরোপের তুলনামূলক কম তাপমাত্রা, সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন নিয়ন্ত্রিত হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই 'অদৃশ্য' জলপ্রপাত না থাকলে পৃথিবীর আবহাওয়া, সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র এবং জলবায়ু আজকের মতো হয়ে উঠতে পারত না।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া ডেনমার্ক স্ট্রেইটেও
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই জলপ্রপাতকেও ছুঁতে শুরু করেছে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা। আর্কটিক অঞ্চলের জল উষ্ণ হয়ে উঠলে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। তার ফলে ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটার্যাক্টের প্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে বা সম্পূর্ণ অন্যরকম রূপ নিতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে - আবহাওয়ার ধরন বদলাতে পারে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়তে পারে, ঘূর্ণিঝড় আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং তাদের গতিপথও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে।
সামুদ্রিক বিজ্ঞানী আনা সানচেজ ভিডাল ইতিমধ্যেই এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে এমন একটি অঞ্চলের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “কাতালান উপকূলে শীতকালে ট্রামোনটানে বাতাসের দিন কমে যাওয়ায় গালফ অব লায়ন ও উত্তর কাতালান উপকূলে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হচ্ছে। জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে যার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যা গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের উপর বড় প্রভাব ফেলে।”