সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই চোখে পড়ছে কাচের গ্লাসে হলুদ রঙা জল (Yellow Water), নীচে ফোনের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো জ্বালালে সোনালি দীপ্তি।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 June 2025 21:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই চোখে পড়ছে কাচের গ্লাসে হলুদ রঙা জল (Yellow Water), নীচে ফোনের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো জ্বালালে সোনালি দীপ্তি। কেউ ফটো তুলছেন, কেউ ভিডিও বানাচ্ছেন, কেউ আবার ক্যাপশনে লিখছেন— ‘নেচার ইজ ম্যাজিক’।
কিন্তু এই জাদু আসলে কী? কেন হঠাৎই এত মানুষ জলজ পাত্রে, গ্লাসে ফেলে দিচ্ছেন চিমটে চিমটে হলুদগুঁড়ো? এটা নিছক সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড, না এর পেছনে রয়েছে কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
হলুদের আলো-আলো খেলা
সম্প্রতি একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে—গ্লাস ভর্তি স্বচ্ছ জলে মেশানো হলুদ গুঁড়োর স্তর। নীচে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো, আর তাতে সেই জল যেন ঝলমল করছে সোনার মতো আলোছায়ায়। অনেকেই একে ‘ম্যাজিক’, ‘গোল্ডেন ওয়াটার’ বা ‘ইলিউশন’ বললেও এর পেছনে আছে একেবারে খাঁটি বিজ্ঞান—টিন্ডাল প্রভাব (Tyndall Effect)।
জলে হলুদ 'জ্বলে'?
বিজ্ঞানী জন টিন্ডালের নামে নামাঙ্কিত এই প্রভাবটি রসায়নের বিষয়। যখন কোনও কলোয়েড দ্রবণ বা কণাসমৃদ্ধ তরল (যেমন জল+হলুদ কণিকা)-এর ভিতর দিয়ে আলো পাঠানো হয়, তখন সেই আলো ক্ষুদ্র কণাগুলোর সঙ্গে বিক্ষিপ্ত (scatter) হয়ে বিচ্ছুরিত প্রতিফলনের মাধ্যমে (Diffuse Reflection) চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আলোটা সেই মাধ্যমের মধ্যে দৃশ্যমান রশ্মি হিসেবে চোখে পড়ে। যাকে রসায়নের ভাষায় টিন্ডাল প্রভাব (Tyndall Effect) বলে। গ্লাস ভর্তি জলের মধ্যে দিয়ে আলো পাঠালে তা বিনা বাধায় বেরিয়ে যায় তবে হলুদ মেশানো হলে হলুদের কণার সঙ্গে ধাক্কা লেগে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে জলে একচামচ ময়দা মেশালে এই এফেক্ট আসবে না। হলুদে উপস্থিত কারকিউমিন (Curcumin) আলো শোষণ করে তা পরিবর্তিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে প্রতিফলিত করে। এবং ইলেকট্রন উত্তেজিত হয়ে আলো তৈরি করে যা দেখে মনে হয় জল জ্বলছে আর তাতেই চোখে-মুখে আলো খেলে যাচ্ছে নেটিজেনদের।
এই প্রভাবের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ? ক্লাসে বিজ্ঞান স্যারের দেখানো সেই “দুধ-জল-লেজার” পরীক্ষা। অথবা সকালে ঘন কুয়াশায় সূর্যকিরণের ছায়া।
এই ট্রেন্ডের জন্ম কোথা থেকে, তা স্পষ্ট নয়। তবে কোনও এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাচের গ্লাসে জল ভরে, তাতে চিমটে চিমটে হলুদগুঁড়ো ঢেলে, নীচ থেকে আলো দিয়ে ভিডিও হিসেবে আপলোড করেন। তারপর একের পর এক রিল, রি-ক্রিয়েশন, চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এখন “#GoldenWaterChallenge” বা “#TyndallEffect” হ্যাশট্যাগে ঝড়।
অনেকেই ভাবছেন, এই জল কি পবিত্র বা তন্ত্র-মন্ত্রজাত? কেউ কেউ আবার এই জল খেয়ে উপকার পাওয়ার দাবিও করছেন। বিজ্ঞান কিন্তু বলছে—এই জলে কোনও বিশেষ গুণ নেই, বরং বেশি পরিমাণ হলুদগুঁড়ো খেলে হজমের সমস্যা পর্যন্ত হতে পারে।
সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান। আর বিজ্ঞান যে কতটা মুগ্ধতা ছড়াতে পারে, তার প্রমাণ এই “জল-হলুদের খেলা”। ট্রেন্ড হোক বা না হোক, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যদি প্রশ্ন করতে শেখে, বুঝতে চায়—তবে তাতেই সার্থক এই আলো-আঁধারের বিজ্ঞান।