এই শহরের শিশুরা জন্মের পরই দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখে অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের একে একে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কেউ হাঁটতে পারে না, কেউ কথা বলার শক্তিও হারায়। শেষমেশ হুইলচেয়ারে বন্দি হয় তাদের ভবিষ্যৎ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস (দ্য ওয়াল)
শেষ আপডেট: 23 June 2025 14:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বের ছোট্ট শহর সেরিনা ডস পিন্টো। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ হাজার। দূর-দূরান্তের কেউ শহরটির নামও শোনেননি এক সময়। অথচ এখানেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেড়ে উঠছে এমন সব শিশু, যাদের জীবনের গতি থেমে যাচ্ছে হাঁটি হাঁটি পা পা করতে না করতেই। এই শহরের শিশুরা জন্মের পরই দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখে অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের একে একে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কেউ হাঁটতে পারে না, কেউ কথা বলার শক্তিও হারায়। শেষমেশ হুইলচেয়ারে বন্দি হয় তাদের ভবিষ্যৎ।
দু’দশক আগে এই দুঃস্বপ্নকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিলেন শহরের মানুষ। কেউই ভাবেননি, নিজেদেরই এক বংশগত অভ্যাস এমন পরিণতির কারণ হয়ে উঠবে। ২০০৫ সাল। সাও পাওলো থেকে আসা এক জিনতত্ত্ববিদ সেরিনা শহরে পা রাখেন। তাঁর নাম সিলভানা সান্তোস। কোনও আন্তর্জাতিক প্রোজেক্ট নয়, এই যাত্রা ছিল ব্যক্তিগত—কারণ তাঁর কয়েকজন ব্রাজ়িলীয় প্রতিবেশীর অনুরোধে তিনি এসেছিলেন দেখতে, কেন তাদের নিজের শহরের বহু শিশু হাঁটতে পারে না।
সান্তোস প্রথমেই বুঝে যান, এখানে কিছু একটা ভুল হচ্ছে। প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি পরিবার যেন লড়ছে একই ছায়ার সঙ্গে। তিনি দরজা দরজা ঘুরে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন, খুঁজে বের করেন অসুস্থ শিশুদের অভিন্ন লক্ষণ, এবং শেষমেশ শনাক্ত করেন এক ভয়ঙ্কর বিরল বংশগত রোগ—স্পোয়ান সিনড্রোম।
গবেষণায় উঠে আসে এক নির্মম বাস্তব—এই শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ দম্পতি আত্মীয়। কেউ ভাই-বোন, কেউ তুতো, কেউ জ্ঞাতিভাই। এই অন্তঃপ্রজননের ফলে শহরের জিনপুলে ঘটেছে মারাত্মক ক্ষয়, যার জেরে ছড়িয়ে পড়েছে এই বিরল রোগ।
‘স্পোয়ান সিনড্রোম’ হয় তখনই, যখন সন্তানের বাবা ও মা—উভয়েই একটি নির্দিষ্ট ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন। দু’টি জিন একত্রিত হলে সন্তান আক্রান্ত হয়। এতে মস্তিষ্কে একটি প্রোটিনের অতিরিক্ত উৎপাদন শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয়।
সান্তোসের ভাষায়, “এই শহরের মানুষ জানতেন তাঁরা আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে করছেন, কিন্তু বহু প্রজন্ম আগে থেকে যে এই অভ্যাস চলছে—তা কেউ জানতেন না।” গবেষকরা মনে করেন, ত্রুটিপূর্ণ এই জিনটি ব্রাজিলে এসেছিল ৫০০ বছর আগে ইউরোপীয় বসতিদের সঙ্গে। আজকের রোগীর ডিএনএ-তে পাওয়া গিয়েছে পর্তুগিজ, ডাচ ও ইহুদি বংশধরদের ছাপ। এমনকি, মিশরের দুটি রোগীর জিনেও মিল পাওয়া গেছে।
এই রোগের কোনও চিকিৎসা নেই। কিন্তু সচেতনতা থাকলে প্রতিরোধ সম্ভব। সান্তোসের গবেষণার পর আজ শহরের মানুষ জানেন—পরিবারের ভেতরে বিয়ে মানেই ভবিষ্যতের জন্য বিপদ ডেকে আনা। সান্তোসের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে আজ সেরিনায় আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহের হার কমেছে অনেকটাই।
সেরিনা ডস পিন্টো এখন আর অজানা নয়। এটি হয়ে উঠেছে বিজ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির এক চিত্রনাট্য, যেখানে এক বিজ্ঞানীর প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছিল একটি শহরের চেতনা। ‘স্পোয়ান সিনড্রোম’-এর সঙ্গে যাঁরা যুদ্ধ করছেন তাঁদের কাছে সান্তোস শুধু একজন গবেষক নন, তিনি যেন একটি প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার দিশারি।