একই শহরে, একে অপরের পিঠোপিঠি কাজ করে চলেছেন তাঁরা। একজন শিল্প গড়ছেন, আর একজন শিল্পের মতো করেই সে গড়া মুছছেন।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 19 June 2025 19:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শরীরে কেউ এঁকে ফেলেছিলেন একে-৪৭, কেউ ফুটিয়ে তুলেছিলেন প্রাক্তনের নাম আবার কেউ লিখেছিলেন কোরানের আয়াত! সেগুলিই এখন অনুশোচনা হয়ে জাঁকিয়ে বসেছে তাঁদের মনে। ফলত তাঁরা নাম লেখাচ্ছেন বশিরের কাছে। বশির অবশ্য পরিচিত ছিলেন ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে। স্লিপ ডিস্কের যন্ত্রণা বা পেশির টান কমানোয় হাতযশ ছিল তাঁর। লোকে বলত, কেবল গায়ের ব্যথা কেন, বুকের জ্বালাও মিটিয়ে দেন বশির।
কিন্তু আজকাল সেই ক্লিনিকেই তাঁর কাছে ভিড় বাড়ে অন্য কারণে। কারণ, সম্প্রতি পেশা বদলেছেন তিনি। লেজার মেশিন চালানো শিখে, তাতেও দড় হয়ে উঠেছেন তিরিশ ছুঁইছুঁই এই যুবক (Tattoo Remover)। তাই তাঁর কাছে এখন গায়ের ব্যথা নয়, শরীরে আঁকা অন্য 'ব্যথা' নির্মূল করতে আসেন সকলে। ট্যাটু মোছায় সিদ্ধহস্ত তিনি। লোকে বলে ‘রিগ্রেট ইরেজার’।

বাসিত বশির
সত্যিই তো, মানুষের জীবনে কতই না রিগ্রেট থাকে। ট্যাটু (Tattoo) তার মধ্যে অন্যতম বই কী! বলিউডের চোখের মণি দীপিকার ঘাড়ের আরকে লেখা ট্যাটুর কথা তো সবাই জানে। রণবীর কাপুরকে মন দিয়ে, এই 'ভুল'টি করে বসেছিলেন নায়িকা। পরে অবশ্য অন্য রণবীরের হাতে ধরা পড়েছেন, কিন্তু তিনি তো আর সেই রণবীর নন! তাই পুরনো ট্যাটুর উপর খোদকারি করতে হয়েছে ফের। অনেকে তা করতে চান না, একেবারে মুছে ফেলতে চান শরীরী নিশানা।
বশির সবচেয়ে অবাক হয়েছিলেন, এক দম্পতি তাঁদের কামদৃশ্য খোদাই করা ট্যাটু মুছতে এসেছিলেন। ভীষণ লজ্জাও পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এমনটাও কেউ আঁকাতে পারেন? সেই '২২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত এমনই প্রায় এক লক্ষেরও বেশি ট্যাটু মুছে দিয়েছেন তিনি। তাঁর ক্লিনিক, ‘ভ্যালি কেয়ার সেন্টার’-এ প্রতিদিন কেউ না কেউ আসেন অতীতের চিহ্ন সাফ করে ফেলতে।
এ তো গেল বশিরের বৃত্তান্ত। তাঁরই ক্লিনিক থেকে মাত্র পাঁচশো মিটার দূরে একটা স্টুডিও খুলে বসেছেন বছর একুশের আহমেদ হাসান (Tattoo Artist)। একটা ছোট্ট গুমটি ঘর। নাম দিয়েছেন ‘আহমি’। সেখানে এখনও তরুণ-তরুণীদের হাত-পা-মাথায় লেখা হয় ভালবাসা, বিক্ষোভ আর স্বপ্নের উপাখ্যান। নাম, পাতার নকশা, ফুল, সাপ, আগ্নেয়াস্ত্রের ছবি— কী নেই!

আহমেদ হাসান
একই শহরে, একে অপরের পিঠোপিঠি কাজ করে চলেছেন তাঁরা। একজন শিল্প গড়ছেন, আর একজন শিল্পের মতো করেই সে গড়া মুছছেন। তাই বশির আর হাসান এক সুতোয় দাঁড়িয়ে আছেন, যার দু'প্রান্ত সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে বাঁধা। এক জন ইতিহাস মুছে ফেলেন এক লহমায়, আর একজন নতুন নতুন গল্প বুনে চলেছেন শরীরী ক্যানভাসে।
উপত্যকায় (Kashmir) এখন প্রশ্নটা শুধু ট্যাটুর নয়। প্রশ্নটা হল, আমরা কীভাবে দেখি আমাদের শরীর, স্বাধীনতা, এবং অতীতকে? সমাজের চোখে যেটা ‘পাপ’, সেটাই তো একটা সময় আমাদের গর্ব ছিল, তাই নয় কি? নাকি সেই গর্বই আজ ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে? ট্যাটু মুছে অল্পবয়সিরা হয়তো মুক্তি খুঁজছেন, কিন্তু সেই মুছিয়ে ফেলায় কি সত্যিই পাপস্খলন রয়েছে, না কি দর্পণের সামনে তা এক আত্মসমর্পণ মাত্র?
এসব নানা প্রশ্ন-চিন্তার মাঝেই জেগে উঠছে কাশ্মীরের বদলে যাওয়া সমাজ। যেখানে শরীর শুধুই শরীর নয়, হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের ক্যানভাস। যেখানে একদিকে আছে প্রতিবাদ, অন্যদিকে আছে অনুশোচনা। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন বশির আর হাসান—যেন কাশ্মীরের অল্পবয়সিদের বলা-না-বলা গল্পের দুই মলাট।