সুনদীপ মাথা নোয়াননি। তিনি নিজেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, একটি সাধারণ স্কুটার কি হুইলচেয়ারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় না? একটু শক্তি, একটু গতি দিয়ে কি হুইলচেয়ারের ধারণাই বদলে দেওয়া যায় না?

সুনদীপ তলওয়ার
শেষ আপডেট: 19 November 2025 13:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মূলত কর্পোরেট দুনিয়ার (Corporate World) লোক হলেও তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক উন্নয়ন করার লক্ষ্যে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের পাশে থেকে কাজ করেছেন সুনদীপ তলওয়ার (Sundeep Talwar)। এই যাত্রার মধ্যেই মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলার গল্পগুলি তাঁকে আলাদা করে ভিতর থেকে নেড়ে দিত। কেউ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, কেউ জন্মগত সমস্যায় হারিয়েছিলেন হেঁটে-চলে বেড়ানোর ক্ষমতা। এক মুহূর্তে ভেঙে যাওয়া জীবনের এই নীরব যন্ত্রণা মুছে দিতেই উদ্যোগী হয়েছিলেন সুনদীপ।
ঠিক এমন সময় তাঁর সামনে এল মহেশের গল্প। মুম্বইয়ের এক ফল বিক্রেতার (Fruit Seller) কিশোর ছেলে। বর্ষার এক দুপুরে মায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকা ভেঙে পড়া এক বিশাল গাছ চিরতরে থামিয়ে দিল তার হাঁটা (Unable to Walk)। ভাঙা মেরুদণ্ড, অচল দু’পা - জীবন যেন তার সামনে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি সুনদীপ। নতুন ভাবনায় মহেশের জীবন গড়ার পণ নেন তিনি।
“অনেকে বলেছিল, ওর জন্য একটা হুইলচেয়ারই (Wheelchair) যথেষ্ট,” স্মিত মুখে সেই সময়কার কথা মনে করেন সুনদীপ, তখন তিনি ইমপ্যাক্ট গুরু ফাউন্ডেশনের সিইও (CEO of Impact Guru Foundation)। পরে বুঝতে পারেন, একটা হুইলচেয়ার ওর গল্প শেষ করতে পারে না। শুধু হুইলচেয়ার দিলে চলবে না, চলার শক্তিও তো ফিরিয়ে দিতে হবে।
সেই ভাবনাই তাঁকে নিয়ে গেল আইআইটি মাদ্রাজ-সংলগ্ন (IIT Madras) স্টার্টআপ নিউমোশন অ্যাসিস্টিভ সলিউশনস-এর একদল তরুণ গবেষকের কাছে। প্রথমে তাঁরা বলেই দিয়েছিলেন, এমন কোনও প্রস্তুত প্রযুক্তি নেই। কিন্তু সুনদীপ মাথা নোয়াননি। তিনি নিজেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, একটি সাধারণ স্কুটার (Scooter) কি হুইলচেয়ারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় না? একটু শক্তি, একটু গতি দিয়ে কি হুইলচেয়ারের ধারণাই বদলে দেওয়া যায় না?
সেই প্রশ্নের মধ্যে থেকেই জন্ম নিল নিওবোল্ট (Neobolt) - একটি ছোট, বিচ্ছিন্ন করা যায় এমন মোটরচালিত সামনের অংশ, যা কয়েক সেকেন্ডেই একটি হুইলচেয়ারকে রাস্তায় চলার মতো স্কুটারে বদলে দেয়। এক যুবকের মর্যাদা ফেরানোর প্রচেষ্টা এভাবে রূপ নিল এক দেশের আন্দোলনে - যেখানে চলার অধিকার হয়ে উঠল আত্মসম্মানের আরেক নাম।
তবে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রার শুরুটা এতটা মসৃণ ছিল না। প্রথমেই সুনদীপ বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, এই উদ্যোগ সফল করতে গেলে প্রয়োজন অর্থ (Money) এবং প্রশিক্ষণও (Training)। কারণ ভারতের প্রায় ২.৬৮ কোটি বিশেষভাবে সক্ষম (People with Disabilities) মানুষের বড় অংশ এখনও ঘরবন্দি জীবনের সঙ্গে আপস করে নেন বাধ্য হয়ে। তাদের না আছে শিক্ষার সুযোগ, না কাজের সুযোগ।
এই ভাবনাকে কাজে লাগিয়েই ২০২১ সালে ইমপ্যাক্ট গুরু ফাউন্ডেশনের অধীনে বোনা হল একটি স্বপ্ন - এই ধরনের মানুষদের কাছে নিওবোল্ট (Neobolt) বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়া, যাতে মানুষ শুধু চলতে না-শেখে, নিজের জীবন ফের হাতে নিতে পারে।
/filters:format(webp)/english-betterindia/media/media_files/2025/11/19/featured-img-2025-11-19-08-49-09.png)
দেশজুড়ে ৫০০-র বেশি হাসপাতাল (Hospital), অসংখ্য এনজিও (NGO), স্থানীয় সংস্থা - সব মিলিয়ে এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হল ধীরে ধীরে। সেখান থেকেই বাছাই শুরু। প্রত্যেক আবেদনকারীর সঙ্গে ছোট্ট সাক্ষাৎকার, তিনি কি স্কুটারটি নিরাপদে ব্যবহার করতে পারবেন? তার মাপ-যোক অনুযায়ী কী ধরনের কাস্টমাইজেশন দরকার? সব দাবিদাওয়া অনুযায়ী নিউমোশন বানাল গাড়ি, আর ইমপ্যাক্ট গুরু ফাউন্ডেশন সামলাল প্রশিক্ষণ, অর্থ, দান, সরবরাহ। সম্পূর্ণ নির্ভীক স্বচ্ছতায় প্রতিটি সাহায্যের পথ খুলে দিল তারা।
তিন বছরে এ পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি মানুষ পেয়েছেন এই নতুন স্বাধীনতা। তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, গুজরাত, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার… দেশজোড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই হাসিগুলিই আজ এই প্রকল্পের আসল সাফল্যের সূচক।
কী রয়েছে এই আধুনিক হুইলচেয়ারে
এটি যেন চেয়ার নয়, স্কুটি! ২৫০ ওয়াট মোটর, চার ঘণ্টার চার্জে ২৫ কিমি পথ, ঘণ্টায় ২৫ কিমি গতি দিতে সক্ষম এই যান। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় বিষয়টি স্বাধীনতার ছন্দ। আলো, ড্যাশবোর্ড, রিভার্স সুইচ, সাসপেনশন, অ্যান্টি-টিপ - সব মিলিয়ে এটিকে বানানো হয়েছে নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ আর মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারের জন্য। প্রতিটি গাড়ির দাম এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষের কাছাকাছি। কিন্তু যে জীবনগুলিতে আলো ফিরেছে, তাদের কাছে এই যান অমূল্য।
এটি যারা কেনেন তাদের দেওয়া হয় ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ। কীভাবে এটি চালাতে হবে, বাঁক নিতে হবে, নিত্য রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে - সব শেখানো হয়। পাশাপাশি জোম্যাটো ও সুইগির মতো সংস্থার সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়া হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা দ্রুত নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।
/filters:format(webp)/english-betterindia/media/media_files/2025/11/19/featured-img-2025-11-19-08-42-50.png)
একটি ছোট প্রশ্ন থেকে একটি ছোট উদ্ভাবন - আজ তা সারা দেশের শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুনদীপের কাছে নিওবোল্ট (Neobolt) শুধু একটি যন্ত্র নয়। এটি একটি পথ - যেখানে মানুষ ফের সমাজের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে।